
ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের প্রতিনিধিত্ব করেছেন জ়াকির হুসেন
জ়াকির হুসেন যখন চলে যাচ্ছেন বা যেতে যেতেও অবিস্মরণীয় ভাবে রয়ে যাচ্ছেন- আমলকি বনের ছায়ায়, দমকা হাওয়ায়, শৈশবের হাসিতে, চায়ের ভাঁড়ে, রাস্তার কোলাহলে বা নেহাতই এক একাকিনীর মন কেমনের পোড়া দুপুরে- তখন তিনি বিরাট। কেবল একটি মামুলি শব্দের বিস্তৃতিতে ওঁর অনণুকরণীয় তিনতালের ঠেকা আটকানো সম্ভব নয়।
তাঁর ‘ধা’ যেন মৃত্তিকার ভার, ‘তেরেকেটে’ সমুদ্রের ঊর্মি। ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি থেকে শঙ্খনাদ- শাস্ত্রীয় সংগীত-বিমুখকেও তিনি অনায়াসে টেনে আনেন কেবল শব্দের সম্মোহনে।
শুরুর গল্পটা তাই দাদরা তালে- মুম্বইয়ের ছোট্ট ঘরে। ছন্দ, লয়, তালের বোল- ভারতীয় তবলার কিংবদন্তি পুরুষ, উস্তাদ আল্লারাখা, তাঁর গর্ভবতী স্ত্রীর কানে কানে বলে চলেছেন। “আমি জানতাম গর্ভেই জাকির চিনত তবলার বোল!”, হাসতে হাসতে আল্লারাখা এক সাক্ষাৎকারে বলে ফেলেন। পরবর্তীতে কিশোর জ়াকির যখন ভোরবেলা তবলায় আঙুল চালিয়ে নিজেকে কেবলই হারিয়ে ফেলে তখন তাঁর বাবা তাঁকে বোঝান, “তবলা হল হৃদয়ের কথা। তুমি যদি নিজের ভেতর অনুভব না করো, তাহলে সে কথা বোঝাতে পারবে না।” শুধুমাত্র তালিম নয়, জ়াকিরকে আল্লারাখা চিনিয়েছিলেন সংগীতের অবিনশ্বর আত্মা। ৩০ বছরের ১২ ঘণ্টার নিত্যনৈমিত্তিক রেওয়াজ, তবুও ত্রয়োদশবর্ষীয় জ়াকিরের এক সাক্ষাৎকারে আক্ষেপ, “বাবার মতো শব্দকে আরও গাঢ়, মেদবর্ধিত, গোল বানাতে পারলাম কই! বাবা এক আঙুলে যা পারেন, আমার তা তৈরি করতে গোটা হাত লেগে যায়!”
কিন্তু জ়াকির যা পারেন, তা আর কজন পারেন? যে সহজাত প্রতিভা তাঁর শিল্পী-সত্তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী, যে কঠোর তালিম, শিকড়ে শ্রদ্ধা ও একই সঙ্গে অভিনবত্বের খিদে তাঁর তবলা-বাদনে ফুটে ফুটে ওঠে- সেই তবলাই জ়াকিরের কাছে কখনও মেঘের গর্জন, কখনও বা বিরহিনীর নূপুরধ্বনি। তাঁর ‘ধা’ যেন মৃত্তিকার ভার, ‘তেরেকেটে’ সমুদ্রের ঊর্মি। ঘোড়ার ক্ষুরধ্বনি থেকে শঙ্খনাদ- শাস্ত্রীয় সংগীত-বিমুখকেও তিনি অনায়াসে টেনে আনেন কেবল শব্দের সম্মোহনে। প্রতিটি তাল তাঁর হাতে তাই পায় কবিতার অবশ্যম্ভাবী স্বীকৃতি, যেখানে প্রথার কাঠামোর মধ্যে রয়েছে অসীম সৃজনশীলতার অঙ্কুরোদ্গম। তাঁর ‘তিহাই’ কোনো তালগণনার পুনরাবৃত্তি নয়, বরং একটি দার্শনিক চিন্তা, একটি চলচ্চিত্রের ব্যাসকূট যেন—কোথায় শুরু, কোথায় শেষ এবং সেই দুইয়ের মধ্যে থাকা জীবনের অচিন্ত্য রূপ। তবুও প্রতিবার সমাপ্তি এল অনবদ্য কৌশলে। একদম ‘অ্যাব্রাকাড্যাবরা।’ সবচেয়ে মনোমুগ্ধকর তাঁর বাম তবলাটির উপর (বায়াঁ) অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ। বেশিরভাগ তবলা বাজিয়েরা বায়াঁকে মনে করেন কেবল সহায়ক, ডানদিকের তীব্র তবলাটির (ডায়াঁ) জটিলতার পরিপূরক। কিন্তু জ়াকিরের কাছে বায়াঁ ছিল এক সম-ষড়যন্ত্রকারী। তবলাটির ত্বকের সীমাবদ্ধতা অতিক্রান্ত করে তিনি বায়াঁ থেকে এমন এমন সূক্ষ্ম স্বরধ্বনি বের করতেন যা না শুনলে প্রায় অবিশ্বাস্য ঠেকবে। তাঁর মুখড়াগুলোও ছিল প্রপঞ্চময়। যখনই তাঁর ছন্দ বোঝা হয়ে গেছে বলে মনে হয়েছে, তিনি হঠাৎ এক অদ্ভুত বিরতি দিতেন এবং সেই নৈঃশব্দ্যও হয়ে উঠত সুরের মতো মোহময়। জ়াকির হুসেনের মঞ্চ পরিবেশনা তাই এক অদ্ভুত অলৌকিকত্বে নিমজ্জিত, নিবিড় কথোপকথনে মগ্ন। তাঁর আঙুল তবলাকে সততই ছুঁড়ে দেয় একের এক রহস্যময় প্রশ্ন, আর তবলাও নিজের চামড়ায় লুকিয়ে থাকা গোপন কথা তাঁর হাতে ফিসফিসিয়ে সমর্পণ করে দেয়। এ দেয়া-নেয়া চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা দুরূহ। ভারতীয় তবলাকে একটি একক পরিবেশনের অধিকারী, একক উৎকর্ষের পরিচায়ক হিসেবে জ়াকিরের বাবার যেমন অনস্বীকার্য ভূমিকা, জ়াকিরেরও ততধিক। আ-ভারতবর্ষীয় পারকাশন-এর প্রতিভূ হিসেবে তো বটেই, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তবলার অপরিমিত প্রশস্তি কেবল ওঁরই দান। এমন এমন মঞ্চে তাঁর উপস্থাপনা, এমন এমন শ্রোতাদের কাছে, যাঁরা রবিশঙ্কর পরবর্তী সময়ের ভারতবর্ষের সংগীতের প্রতিনিধিত্ব বলতে বোঝে কেবল জ়াকির হুসেনকেই।
তাঁর “Masters of Percussion” প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান শিল্পীদের মঞ্চে নিয়ে এসেছেন। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি একেবারে ব্যতিক্রমী—তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সৃষ্টিশীলতার ডানা মেলতে হয়।
এ ধরনের তারকা যাঁরা, যাঁরা নিজস্ব প্রতিভা ও খ্যাতির আলোয় সমুজ্জ্বল, তাঁদের কাছে সঙ্গত করা বা কেবল আরেকজনের দেখানো পথে হাঁটা হয়ে ওঠে গৌণ। কিন্তু জ়াকির সেরকম নন একেবারেই-বিনয়ে স্বকীয় কৌতুকে লুটিয়ে পড়া স্বভাব তাঁকে আলোর পাশে অন্ধকারেও অসামান্য করে তুলেছে। তাই তাঁর সঙ্গতগুলিও ছিল বিপ্লবাত্মক। যাঁরা ওঁর পণ্ডিত রবিশঙ্করের সঙ্গে রাগ য়ামনের বিখ্যাত সঙ্গত দেখেছেন, তাঁরা জানেন। রবিশঙ্করের প্রতিটি মীড় কুড়িয়ে কুড়িয়ে জ়াকির তাঁকেই ছন্দের অভিজ্ঞানে ফেরত দিচ্ছেন। একবার নয়, বারবার। বা ধরা যাক, উস্তাদ আলি আকবরের জয়জয়ন্তী বাদনের সময়ে, জ়াকির যে সঙ্গতটা করেন, তা দেখানো পথের উপর বিশ্বাস ছাড়া সম্ভব নয়। আলি আকবর অবশ্য নবীন এই উস্তাদকে সবিশ্বাসে ও অত্যুৎসাহে পরিবেশনের রাশ দিয়ে দেন সরোদের তার মেলাবার সময়ে। রতনে যে রতন চেনে। তবে জ়াকিরের শ্রেষ্ঠ সঙ্গত বোধকরি তাঁর প্রাণান্ত প্রিয় বন্ধু পণ্ডিত শিবকুমার শর্মার সঙ্গে। সন্তুরের কম্পমান স্বরের সঙ্গে উপযুক্ত কোন ঘনমানতায় তবলার ঠেকাটি বাজাতে হবে- এ জ়াকিরের স্বয়ংসম্পূর্ণ শিক্ষা। কোভিডের সময়ে বন্ধুর অকালপ্রয়াণে জ়াকির দাঁড়িয়ে থেকে বিদায় জানিয়েছেন তাঁকে। এ-ও তো তাঁর যাপনের মানবতার পাঠ।
এই শাস্ত্রীয় সংগীতের জ়াকিরই আবার সবরকম পরীক্ষা-নিরীক্ষায় স্বচ্ছন্দ, স্বকীয় ভাবনায় ভাস্বর। শাস্ত্রীয় পরম্পরার অভ্যন্তরীণ আর্দশেই থেমে না থেকে ১৯৭০-এর দশকে জন ম্যাকলাফলিন, এল শঙ্কর এবং ভিকু বিনায়কের সঙ্গে “শক্তি” গঠনের সময় তিনি বিশ্বের সামনে ভারতীয় সংগীতের বহুমাত্রিকতার উন্মোচন ঘটালেন অনায়াসে। “শক্তি”-র সুর যেন দুই সংস্কৃতির অন্তরঙ্গ আলাপন—ভারতীয় রাগের ধ্রুপদী গভীরতা আর পাশ্চাত্য জ্যাজের মুক্তির আনন্দ একসঙ্গে মিলে এক বৈদ্যুতিক অস্থিরতার জ্ঞাপন। তাঁর তবলায় ছন্দের মাঝে যে সৃজনশীলতা সঞ্চারিত হয়েছে, তা সংগীতকে শুধু শ্রবণযোগ্য নয়, আমাদের আনুভবিক স্তরে এসেছে নব নব পরিচয়ে। এই নতুন ভাবনা পুনরায় ভাষা পেল মিকি হার্টের সঙ্গে তাঁর “প্যানেট ড্রাম” প্রকল্পে। আফ্রিকান ড্রাম, ল্যাটিন পারকাশন, আর ভারতীয় তবলায় একত্রে গড়ে উঠেছিল ছন্দের এক সার্বজনীন দিগন্ত। সংগীত এখানে আর কোনো বিশেষ অঞ্চলের পরিচয় বহন করে না; এটি হয়ে ওঠে মানবিক অনুভূতির স্বকীয় প্রকাশ। এই প্রকল্প কেবলমাত্র একটি গ্র্যামি পুরস্কার জয় করেই থেমে যায়নি; প্রমাণ করেছিল যে সংগীত সত্যিই সীমান্ত-শূন্য। এর সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্রে সংগীত-পরিচালক জ়াকিরের মুন্সিয়ানা চোখে পড়বেই মালায়াম ছবি, ‘বানপ্রস্থম্’-এ। Ismail Merchant-এর ‘In Custody’, ‘The Mystic Masseur’, Francis Ford Coppola-র ‘Little Buddha’ বা অপর্ণা সেনের ‘Mr. and Mrs. Iyer’ – সবেতেই জ়াকির রেখে গেছেন তাঁর তবলার অখণ্ডনীয় ছাপ।
এ হেন জ়াকির যে শিক্ষাদানেও ভবিষ্যতের দিশারি হবেন তা বলাই বাহুল্য। তাঁর “Masters of Percussion” প্রকল্পের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের প্রতিভাবান শিল্পীদের মঞ্চে নিয়ে এসেছেন। তাঁর শিক্ষাদানের পদ্ধতি একেবারে ব্যতিক্রমী—তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে সৃষ্টিশীলতার ডানা মেলতে হয়। তরুণ প্রজন্ম তাঁর মধ্যে দেখতে পায় সংগীতের এক জীবন্ত উদাহরণ, যে উত্তরাধিকার শেখায় মানবিকতা, মেধা এবং সৃজনী শক্তির অব্যক্ত মহাকাব্য। Princeton University-র Dominion Fellow-ই হোক বা Stanford-এ অতিথি অধ্যাপক- জ়াকিরের আন্তর্জাতিক ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা অগণ্য।
শুধু শৈল্পিক উৎকর্ষ নয়, জ়াকির সবসময় দাবি করেছেন যে সংগীত জাত, শ্রেণি, ধর্ম, ভাষার পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এটি এক অভিন্ন মানবিক অভিব্যক্তি। এই অভয়দায়ী বিশ্বাসই তাঁর সংগীতের বৈশিষ্ট্য, তাঁর ইউএসপি। সায়াই গন্ধর্বের এক অনুষ্ঠানে তাই একমাত্র জ়াকিরই পারেন এক শ্রোতাকে মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে বোঝাতে যে এখানে তাঁরা সরস্বতীর আরাধনা করছেন, ছবি তোলাতে তাঁদের আরাধনার ব্যাঘাত ঘটবে। যে মানুষটিকে বলেন তাঁর শ্রেষ্ঠ যাত্রা নেপথ্য থেকে মঞ্চের যাত্রাটুকু, তাঁর কাছে তো সংগীতের পবিত্রতা রক্ষা অপরিহার্য। তাই জ়াকিরের পরে আর কে- এ প্রশ্ন অর্বাচিনের। বরং এরপর কী কী শেখা যায়, কী বলা যায় এই অস্থির সময়ের দিকনির্ণয়ে, সেটিই বিবেচ্য। ততক্ষণ থাকুক সম্রাটের আসন অক্ষুণ্ন। ঝাঁপতাল, ধামার অব্যাহত, আলো লাগুক পায়রাদের উড়ানে আর সোম ফিরে ফিরে আসুক চামেলি সৌগন্ধে।
______
জ়াকির হুসেন অবিচুয়ারি | Zakir Hussain Obituary
