
তাঁর নামেই কলকাতার ‘শিব নন্দী লেন’
‘টরেটক্কা’ আর কিছুই নয়, টেলিগ্রাফ। সেকালের টেলিগ্রাফ যন্ত্র থেকে যে ‘টক টক’ আওয়াজ হত, তা থেকে বাঙালি এই যন্ত্রের নাম রেখেছিল ‘টরেটক্কা’ কল। সেসময় সারা দেশ জুড়ে ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ লাইন পাতার কাজ চলছে জোর কদমে—ইস্ট ব্যারাকপুর থেকে এলাহাবাদ, বেনারস থেকে মীর্জাপুর, মীর্জাপুর থেকে শিওনি, কলকাতা থেকে ঢাকা অবধি। আর এই কাজ সম্পন্ন করতেই প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে ভারতের ‘টেলিগ্রাফ ম্যান’ হয়ে উঠেছিলেন এক দুঃসাহসী-বুদ্ধিদীপ্ত বাঙালি—শিবচন্দ্র নন্দী।
শিবচন্দ্রের কথা বলার আগে যাঁর কথা না বললেই নয়, তিনি হলেন ভারতে ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফের জনক উইলিয়াম ব্রুক ও’শনেসি। ও’শনেসি ১৮৩৫-এ কলকাতা মেডিকেল কলেজে নিযুক্ত হন রসায়ন ও মেটিরিয়া মেডিকার প্রথম অধ্যাপক হিসেবে। এ ছাড়া মিন্ট মাস্টার, কেমিক্যাল এগজামিনার অব মিন্ট এবং এশিয়াটিক সোসাইটির জয়েন্ট সেক্রেটারি হিসেবেও কাজ করেছেন। ‘জার্নাল অফ এশিয়াটিক সোসাইটি’র বিভিন্ন সংখ্যায় প্রকাশিত তাঁকে নিয়ে লেখা বহু প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, বিশেষ করে গ্যালভানিক ব্যাটারি তৈরির ব্যাপারে তাঁর নানা ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা-কৃতিত্বের উপাখ্যান। এক্ষেত্রে দু-একটা উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে, ‘ইকুইটেবল’ নামে একটি জাহাজ ১৮৩৯-এ ‘ফলতা স্যান্ডস’-এর কাছে ডুবে যাওয়ার পর নৌ-চলাচলে দারুণ অসুবিধা দেখা দেয়। এই ডুবন্ত জাহাজের মধ্যে বারুদ রেখে বৈদ্যুতিক উপায়ে সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেন ও’শনেসি। প্রবল বিস্ফোরণ জাহাজটিকে চুরমার করে দেয়। আর একটি ঘটনা, সেটিও ১৮৩৯-এর।
বোটানিকাল গার্ডেনে ২১ মাইল লম্বা তার খাটিয়ে (একটি সীমাবদ্ধ জায়গার মধ্যে তারটিকে চারটি খুঁটির গায়ে বারবার জড়ানো হয়েছিল), ও’শনেসি সেটির দু’প্রান্তের মধ্যে সঙ্কেত বিনিময়ে সফল হন। কিন্তু সফলতার পরেও তাঁকে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হয়েছিল দশ বছরের উপর কারণ, কলকাতা থেকে ডায়মন্ড হারবার পর্যন্ত লাইন বসাবার টাকা মঞ্জুর করছিল না ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। অনুমতি পাওয়ার দশ মাসের মধ্যেই ১৮৫১ খীস্টাব্দে, ও’শনেসির নেতৃত্বে, ভারতের প্রথম বৈদ্যুতিক লাইনের প্রথম অংশের কাজ শেষ হয়। সেই টেলিগ্রাফ লাইনের দুটি টুকরো এখনও রয়েছে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল এবং বিড়লা শিল্প ও কারিগরি সংগ্রহালয়ে। সেকালের কলকাতার গর্ব ছিলেন ও’শনেসি। ও’শনেসিই আবিষ্কার করেছিলেন শিবচন্দ্র নন্দীকে।
প্রথম টেলিগ্রাফ লাইন পাতার শুরু থেকেই এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন নন্দীবাবু। শোনা যায়, তারও আগে ১৮৪৬-এ বাইশ বছরের যুবক শিবচন্দ্র কলকাতার টাঁকশালের রিফাইনারি ডিপার্টমেন্টে যোগ দেন। তাঁর কারিগরি দক্ষতা তখনই ও’শনেসির নজরে পড়ে এবং শিবচন্দ্র হয়ে ওঠেন তাঁর ‘ডান হাত’। ‘কলের শহর কলকাতা’ বইতে সিদ্ধার্থ ঘোষ বলেছেন, ইলেকট্রিক টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা প্রবর্তনের পরেই ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক যন্ত্রের ব্যবহার শুরু এবং ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিয়ারিং বৃত্তিরও জন্ম হয় তখনই। শিবচন্দ্র নন্দীকে সঙ্গত কারণেই 'প্রথম' ভারতীয় ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বলে অভিহিত করা যায়, ডিগ্রির দৌলতে নয়, কৃতিত্বের জন্য ও পেশাগত কারণে।
কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৯০০ মাইল টেলিগ্রাফ লাইন পাতার কাজ তদারকির ভার পড়ে শিবচন্দ্রের উপর। কলকাতা থেকে ঢাকা অবধি লাইন স্থাপনের কাজের সবচেয়ে ‘অ্যাডভেঞ্চারাস’ পর্বটি ছিল ভয়াবহ পদ্মার সঙ্গে পাঞ্জা কষা। মাটির উপর দিয়ে টানা তার নয়, পদ্মার জলের তলা দিয়ে ‘সাবমেরিন কেবল’ পাততে হবে। কোনো স্টিমার কোম্পানিই দশ হাজার টাকার কমে কাজে হাত দিতে রাজি হচ্ছিল না। তখনই মাঠে নামেন নন্দীবাবু। নিজের জীবন বিপন্ন করে, জেলে ডিঙি ভাড়া করে ব্যক্তিগত তত্ত্বাবধানে দুর্বার গতিতে পদ্মার বুকে সাত মাইল ব্যাপী 'সাবমেরিন কেবল' পাতার কাজ নিতান্ত ‘অল্প ব্যয়ে’ সমাধা করেন।
হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষ শিবচন্দ্রের দুঃসাহসীকতা ও বুদ্ধির তারিফ করে লিখেছিলেন, “বহু লোকের কীর্তিনাশ করিয়া যে পদ্মা কীর্তিনাশা নাম লাভ করিয়াছিল, সেই পদ্মায় ৭ মাইল ‘কেবল’ স্থাপনের কার্য শিবচন্দ্র যেরূপ অল্প ব্যয়ে সুসম্পন্ন করিয়াছিলেন, তাহা বিস্ময়কর।”
একবার তার খাটানোর জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজতে গিয়ে একমনে জায়গা দেখতে দেখতে শিবচন্দ্র চোরাবালিতে পা ঢুকিয়ে দেন। সেবার তাঁর সঙ্গীদের জন্য কোনোমতে প্রাণে বেঁচেছিলেন তিনি। একবার তিনি অজগরের মুখের সামনেও গিয়ে পড়েছিলেন। কিছু দুষ্টু বুদ্ধির উদ্ধত ইংরেজ সৈনিক ষড়যন্ত্র করে তাঁকে খুন করার চক্রান্ত করেছিল, কিন্তু শিবচন্দ্র বুদ্ধির জোরে তাদের সেই চক্রান্তের মুখে জল ঢেলে দিয়েছিলেন।শুধু দুঃসাহস আর দক্ষতা নয়, তিনি সৃজনশীল ভাবেও তাঁর জ্ঞানকে যথাযথ প্রয়োগ করতে পেরেছিলেন এবং ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে সেখানেই সেখানেই তাঁর আসল সার্থকতা। টেলিগ্রাফের তার বসাতে তালগাছের গুঁড়ি ব্যবহার করাও শিবচন্দ্রের অভাবনীয় উদ্ভাবনী শক্তির নিদর্শন। ইলেকট্রিকের তার খাটানোর জন্য তখন লোহার খুঁটি আনানো হত ইংল্যান্ড থেকে। শিবচন্দ্র তালগাছের গুঁড়িকে লোহার খুঁটির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। কিভাবে ইনসুলেটর বসানো ও তার সংযুক্ত করা হবে সে-বিষয়ে অপূর্ব কিছু ড্রইং দিল্লির ন্যাশানাল আর্কাইভের হেফাজতে রয়েছে। এই প্রসঙ্গে ১৮৫৫-এ শিবচন্দ্র ও’শনেসিকে একটি চিঠিতে লেখেন:
…I have to this day forwarded to your address at Agra drawings of the Toddy palm-posts with their various insulators in the various methods in which I have used them for your lines, together with that of an obelisk lately erected at Dehree, as well as those proposed for the flying line across the Soane River and one for Baroon.
১৮৫৭-র আগেই বিভাগীয় ওপরওয়ালা ও’শনেসি ব্রুক বিলেত চলে যাওয়ায় আর তার জায়গায় আনা কর্নেল স্টুয়ার্টও সামরিক কারণে অনুপস্থিত থাকায় টেলিগ্রাফ বিভাগের প্রধান দায় কিন্তু সামলাতে হয়েছিল শিবচন্দ্রকেই। কোম্পানি অবশ্য পরে শিবচন্দ্রের এই অবদান স্মরণ করেই তাকে ‘রায়বাহাদুর’ খেতাব দিয়েছিল। কলকাতায় নিজের বাড়িতে ১৯০৩-এর ৯ এপ্রিল বিউবনিক প্লেগে শিবচন্দ্রের মৃত্যু হয়। টরেটক্কা কলের মতো বাঙালির কাছে বিস্মৃত ইতিহাস হয়ে গিয়েছেন শিবচন্দ্র। তাঁর প্রতি কলকাতার একমাত্র শ্রদ্ধার্ঘ্য—বড়বাজারের কাছে ছোট্ট একটি গলি যার নাম ‘শিব নন্দীর লেন’।
তথ্যসূত্র:
কলের শহর কলকাতা, সিদ্ধার্থ ঘোষ।
ছবি সূত্র:
(১)- সিদ্ধার্থ ঘোষের ‘কলের শহর কলকাতা’র একটি অলংকরণ
(২)- sohamchandra.blogspot.com
