
সুস্থ পরিবেশ না থাকলে বাঘেরা ভালো থাকবে কীভাবে?
প্রখ্যাত ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার বলেছেন “Since the start of the Indian civilization, the Tiger was revered and woven into mythology, Tiger connections are endless throughout India in a variety of different indigenous cultures.” অর্থাৎ শুরুর থেকেই বাঘ এবং ভারতীয় সভ্যতা ওতপ্রোতভাবে একে অপরের সাথে জড়িয়ে। ভারতের লোকসংস্কৃতি, বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনি এবং ইতিহাসের পাতায় পাতায় বাঘেদের বিচরণ অবিরাম। বাঘ পূজিত হয় দেশের প্রায় প্রতিটি প্রদেশের লোকগাথায়।
আজও বাঘের কথা বললে গায়ে কাঁটা দেয় না এমন মানুষ দুনিয়ায় খুব কমই আছেন। এখন তো আবার সারাক্ষণই বাঘ আপনার আমার ডেস্কটপ আর ৫ ইঞ্চির স্মার্ট ফোনে থাকে। প্রতি সেকেন্ডে দেশের প্রতিটি কোণা থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড হচ্ছে কয়েক হাজার নিত্য নতুন বাঘের ছবি। কত বাঘ। তার মানে তো বাঘ ভালো আছে! রাজ্য তো বটেই, এমনকী সমগ্র দেশ জুড়ে বাঘ নিয়ে মানুষের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা রয়েছে! কিন্তু আসল পরিস্থিতি কি ঠিক তাই? তাহলে কেন আজ কিছু মানুষ বাঘের সুরক্ষা নিয়ে এত চিন্তিত? কেনই বা ফরেস্ট গার্ডেরা নিজেদের জীবনের তোয়াক্কা না করে শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষা দিন-রাত জঙ্গল বাঁচানোর জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন? সমস্যাটা কোথায় জেনে নিই।
ভ্রমণবিলাসী মানুষ এখন সুযোগ পেলেই জঙ্গলে যান। সুন্দর ছবি তোলেন পশু-পাখিদের। অথচ পশু-পাখির অবাধ বিচরণের পথ যে অচিরেই অবরুদ্ধ করছে আমাদের নাগরিক সভ্যতা সে খবর রাখেন না অনেকেই। আধুনিকতায় পাল্লা দিয়ে মানুষ ক্রমশ বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। মানুষের অপরিমিত চাহিদায় হারিয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল।

‘প্রজেক্ট টাইগার’-এর প্রথম ডিরেক্টর ডঃ কৈলাশ সাংখলা বলেছিলেন, “বাঘ গণনা করবেন না বরং বনভূমি ও তার জলসম্পদ পর্যবেক্ষণ করুন” অর্থাৎ এগুলি সুরক্ষিত থাকলেই বাঘ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণ বাঁচবে। বাঘেদের হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণটা তিনি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছিলেন সেদিনই।
‘ভারতবর্ষের স্টেট অফ ফরেস্ট রিপোর্ট’ ২০২১ বলছে, গত এক দশকে ভারতের ৫২টি ব্যাঘ্র প্রকল্পের পাশাপাশি এশিয়াটিক সিংহের একমাত্র বাসভূমি গুজরাটের গির বনভূমিও সামগ্রিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। এমনকি করবেট টাইগার রিজার্ভ, যেখানে সংখ্যার হিসেবে বাঘের ঘনত্ব সব থেকে বেশি সেখানেও হ্রাস পাচ্ছে বনভূমি। যেকোনো জঙ্গলের সুস্বাস্থ্য নির্ভর করে তার সুরক্ষিত বাস্তুতন্ত্রের ওপর আর বিজ্ঞান বলে, বন্যপ্রাণ ও তার বাস্তুতন্ত্র তখনই সুস্থ থাকবে যখন বন্যপ্রাণের করিডর বা জঙ্গলগুলির মধ্যে সংযোগকারী বন্যপ্রাণ চলাচলের পথ সুরক্ষিত থাকবে। এই করিডরগুলি এখন ছিন্নভিন্ন। হাইওয়ে, রেললাইন, বিলাসবহুল রিসর্ট, মাইনিং, ড্যাম ইত্যাদির অনুগ্রহে। সুতরাং বেঁচে থাকার সুস্থ পরিবেশ না থাকলে বাঘেরা ভালো থাকবে কীভাবে?

ভ্রমণবিলাসী মানুষ এখন সুযোগ পেলেই জঙ্গলে যান। সুন্দর ছবি তোলেন পশু-পাখিদের। অথচ পশু-পাখির অবাধ বিচরণের পথ যে অচিরেই অবরুদ্ধ করছে আমাদের নাগরিক সভ্যতা সে খবর রাখেন না অনেকেই। আধুনিকতায় পাল্লা দিয়ে মানুষ ক্রমশ বিলাসবহুল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছে। মানুষের অপরিমিত চাহিদায় হারিয়ে যাচ্ছে বনাঞ্চল। শুধু জঙ্গল কেন, দিকেদিকে সবুজের নিধন হয়ে তৈরি হচ্ছে হাইরাইজ অথবা কারখানা। এভাবেই জায়গা কমছে বাঘেদের, অন্যান্য বন্যপ্রাণের। বর্তমানে পর্যটকদের বাঘ দেখার একমাত্র ভরসা দ্বীপসম এক একটি জাতীয় উদ্যান, যেগুলি ন্যাচারাল করিডর হারিয়ে ইতিমধ্যেই সঙ্কটে। তাই বাঘের অস্তিত্বও সঙ্কটে।
বাঘেদের টিকে থাকার লড়াইয়ে প্রয়োজন মানুষকে। মানুষের সমর্থন। মানুষের সদিচ্ছা। আমাদের কিছু পদক্ষেপই বদলে দিতে পারে ওদের জীবন। এই লক্ষ্য নিয়েই কাজ করে আমাদের সংস্থা SHER (সোসাইটি ফর হেরিটেজ অ্যান্ড ইকোলজিক্যাল রিসার্চেস) । SHER বিশ্বাস করে যে, প্রকৃতি এবং বন্যপ্রাণ মানবজাতির প্রকৃত ঐতিহ্য। অথচ মানুষেরই কারণে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণ তার বাস্তুতন্ত্র এবং অবশ্যই দেশের জাতীয় প্রাণী বাঘ প্রতিদিন বিপদগ্রস্ত হচ্ছে আর এই বিষয়গুলি নিয়েই মানুষকে সচেতন করা এবং বন্যপ্রাণ ও মানুষের সংঘাত প্রশমন করার জন্য জনমত গড়ার চেষ্টা করে আমাদের সংস্থা।

আজকাল ঘটা করে বাঘ দিবস পালিত হয় সর্বত্র। কিন্তু SHER বিশ্বাস করে, বছরের সবকটা দিনই বাঘেদের। প্রতিটা দিনই তাদের জঙ্গলের, নদীর জলের, নোনা সমুদ্রের অথবা আকাশচুম্বী পাহাড়ে বিচরণের। বাঘের বাসস্থান, তার বনভূমি আমাদের ইকোলজিকাল সিকিউরিটি। আমাদেরই তো দায় তাদের হারানো জায়গাটা ফিরিয়ে দেওয়া। সুরক্ষিত রাখা তাদের বেঁচে থাকার জন্য অবশিষ্ট জঙ্গলটিকে। তাই ‘টাইগার জিন্দা হ্যায়’ নিয়ে উত্তেজনা না দেখিয়ে ‘শেরনী” ছবিটিকে দেখুন, বাস্তবের মাটিতে বাঘেদের বাঁচিয়ে রাখার কঠিন যুদ্ধের গল্প সেখানেই দেখতে পাবেন।
___________________
প্রথম ছবি: সংগৃহীত। অন্যান্য ছবি: জয়দীপ সুচন্দ্রা কুণ্ডু।
