শতবর্ষ আগে বাঙালির তিব্বত অভিযান – পর্ব ১

আজ থেকে ১৪০ বছর আগে মোট দুইবার তিব্বত অভিযান করেছিলেন এই বাঙালি

ঘুরতে ঘুরতে দার্জিলিং। দার্জিলিং স্টেশনের কাছে একটা বাড়ি আছে। নাম, ‘লাসা ভিলা’। অবক্ষয়ের দিন গুনছে। খোঁজ খবর নিয়ে বেশ অবাক হলাম। একসময় এই বাড়িতে থাকতেন এক বিখ্যাত বাঙালি। নাম শরৎচন্দ্র দাস।  যিনি শতবর্ষ আগে দু-দুবার তিব্বত অভিযান করেছিলেন। ব্রিটিশদের কাঞ্চনজঙ্ঘায় পা রাখার ৭৬ বছর আগে কাঞ্চনজঙ্ঘা পেরিয়ে তিব্বত যান। যেসময় তিব্বত যাওয়ার কথা বাঙালি ভাবতেই পারত না। আজও হয়তো ভাবতে গেলে একটু হোঁচট খেতে হয়। যাই হোক, যে শরৎচন্দ্রকে বাঙালিরা ভুলে গেলেও, ভোলেননি দার্জিলিংয়ের স্থানীয় তিব্বতিরা। তাঁরা কম বেশি সবাই শ্রদ্ধা করেন শরৎচন্দ্রকে। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের কথা আমরা সবাই জানি কম বেশি, কিন্তু শরৎচন্দ্র দাস! যার সম্বন্ধে খুব বেশি তথ্য আজও আমাদের হাতে নেই।

কে এই বাঙালি শরৎচন্দ্র? আসলে বাংলা সাহিত্যে দুইজন শরৎচন্দ্র রয়েছেন। দুজনই বিখ্যাত। একজন শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় আর একজনন শরৎচন্দ্র পণ্ডিত ওরফে ‘দাদাঠাকুর’। অতএব বাঙালি তৃতীয় শরৎচন্দ্রকে নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাননি। আসুন একটু জেনে নেওয়া যাক এই শরৎচন্দ্র দাস সম্বন্ধে। ১৯৫৫ সালে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় প্রথম পা রেখেছিলেন দুই ব্রিটিশ অভিযাত্রী- জো ব্রাউন আর জর্জ ব্যাণ্ড। তবে ইতিহাস অনুসন্ধান করে জানা যায়, ব্রিটিশদের কাঞ্চনজঙ্ঘায় পা রাখার ৭৬ বছর আগে অর্থাৎ ১৮৭৯ সালে এক বাঙালি কাঞ্চনজঙ্ঘা পেরিয়ে তিব্বত যান। সেই বাঙালি ছিলেন শরৎচন্দ্র দাস। তাঁর আসল পরিচয় আজও ধোঁয়াশায় ঘেরা। কেউ বলেন বাঙালি গুপ্তচর, আবার কেউ বলেন নিছক রোমাঞ্চের সন্ধানে তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন তিব্বত। শরৎচন্দ্র বৌদ্ধধর্মের ওপর বিস্তর পড়াশুনা করেছিলেন। রপ্ত করেছিলেন চোস্ত তিব্বতি ভাষা। ফলে সমসাময়িক অন্যান্য পর্যটকদের চেয়ে তিনি ছিলেন অনেক এগিয়ে।  তিনি দু’বার তিব্বত সফর করেন। প্রথমবার গিয়েছিলেন ১৮৭৯ সালে। চার মাসের জন্য। ১৮৮১ সালে ফের যান সেখানে। সেবার রয়েছিলেন ১৪ মাস। দ্বিতীয় সফরে গিয়ে তিনি তিব্বতের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি নিয়ে অসংখ্য নোট রেখেছিলেন যা ‘Journey to Lhasa and Central Tibet’ নামে বই আকারে পরে প্রকাশিত হয়।  বইটি ১৮৮৫ সালে মুদ্রিত হলেও বৃটিশ সরকার বইটির প্রকাশ কয়েক বছর বন্ধ রেখেছিল।

১৮৪৯ সালে চট্টগ্রামের আলমপুরে জন্ম শরৎচন্দ্রের। ছাত্র হিসাবে তিনি ছিলেন বেশ মেধাবী। একাধিক বিষয়েই তাঁর আগ্রহ ছিল প্রবল। স্কুল শেষে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হলেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। সেখানে তখন ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হত। কিন্তু বাধ সাধল ম্যালেরিয়া। ফাইনাল পরীক্ষার সময় অসুস্থ হয়ে পড়লেন তিনি। সারাক্ষণই কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে তাঁর। শরৎকে সে যাত্রা বাঁচিয়ে দিলেন উদ্ভিদবিজ্ঞানের অধ্যাপক সিবি ক্লার্ক। অধ্যাপক ছাত্রকে বললেন, “দার্জিলিংয়ের ডেপুটি কমিশনার স্যার জন এড্‌গার সেখানকার শিশুদের লেখাপড়ার জন্য একটি ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুল তৈরি করেছেন। শরৎ তুমি সেখানকার প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নাও।” প্রথমদিকে একটু কিন্তু কিন্তু করলেও শরৎচন্দ্র মেনে নিলেন স্যারের প্রস্তাব। সাহেবগঞ্জ অবধি ট্রেন। তারপর স্টিমারে কারগোলা ঘাট পেরিয়ে বলদ-টানা গাড়িতে পূর্ণিয়া হয়ে শিলিগুড়ি। সেখান থেকে হাঁটতে হাঁটতে কার্শিয়াং। তারপর জীবনে প্রথমবার ঘোড়ার পিঠে চাপলেন শরৎ। আর ঘোড়ায় চড়ে কার্শিয়াং থেকে দার্জিলিং পৌঁছলেন শরৎচন্দ্র। বয়স তাঁর তখন ২৫।

এদিকে দার্জিলিংয়ের স্কুল ছাত্ররা না বোঝে বাংলা আর না বোঝে ইংরেজি। নতুন হেডমাস্টারমশাইও তাদের ভাষা বোঝেন না। আগ্রহী হেডমাস্টার শরৎ বুঝলেন এভাবে বেশিদিন চলতে পারে না। তিনি ধীরে ধীরে রপ্ত করে ফেললেন তাঁদের ভাষা। সিকিমের রাজা, মন্ত্রী, অমাত্যরাও ইংরেজি শেখাতে তাঁদের ছেলেদের একে একে পাঠাতে লাগলেন ভুটিয়া বোর্ডিং স্কুলে। দু’বছর পর হেডমাস্টারমশাই ঠিক করলেন ছুটিতে ছাত্রদের এক্সকারশনে নিয়ে যাবেন। ছাত্রদের নিয়ে গেলেন পাশের দেশ সিকিম। সেখানেই বিখ্যাত পেমিয়াংচি মঠ। বৌদ্ধদের নানান আচার-অনুষ্ঠান, লামাদের ভাবগম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণ শরতের মনে জাগিয়ে তুলল আগ্রহ। তিব্বত সম্বন্ধে আগ্রহ জাগল শরতের। সিকিম রাজার জ্যৈষ্ঠপুত্র ছিল তাঁর ছাত্রদের একজন, যিনি পরে সিকিমের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন। এই সম্পর্কের সূত্র ধরেই শরৎচন্দ্র দার্জিলিং থেকে সিকিম ভ্রমণ করেন এবং রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠতা অর্জন করেন। সেখানেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় ঘটে কয়েকজন তিব্বতি লামার। একজন তিব্বতি লামাকে তিনি নিজের সহকারী হিসেবে স্কুলে চাকরিও দেন। তিব্বতের লাসা তখনও ‘নিষিদ্ধ নগরী’। বাইরের কোনো দেশের নাগরিকের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ইউরোপিয়ানরা বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করার চেষ্টা করে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ফিরে আসে। প্রাকৃতিকভাবেও তিব্বত খুবই দুর্গম অঞ্চলে অবস্থিত। তবে হিমালয় পর্বত পেরিয়ে তিব্বত গমনের যে কঠিন যাত্রাপথ তার চেয়েও বেশি কঠিন তিব্বতের নিষেধাজ্ঞার বেড়াজাল। কিন্তু শরৎ যাবেন তিব্বত। সুযোগ এসে গেল। সিকিমের পেমিয়াংচি মঠের লামা উগ্যেনগিয়াতসোর সঙ্গে তখন শরতের বেশ ভালো আলাপ। পাঞ্চেন লামার প্রধান সহকারী, তাশি লামা হিন্দি ও ইংরেজি শিখতে চান, আর সেই সূত্রে উগ্যেনগিয়াতসোর সঙ্গে শরৎ পৌঁছলেন তাশিলুনপো মঠে।
(চলবে…)

তথ্য ঋণঃ
Three Years in Tibet-  Ekai Kawaguchi
The Indian Spy Who Fell for Tibet. New York Times 20 March 2016
Autobigraphy Incident of my early life- Sarat Chandra Das
Journey to Lhasa and Central Tibet- Sarat Chandra Das
 Bengali Pundits in Himalaya- Sarat Chandra Das
Journal of Asiatic Society
 

Developed by DXDasia