তেনজিং-এর সঙ্গে যেভাবে জড়িয়ে আছে এই বাংলার নামও
“১৯৫৩ সালের ২৯ মে-র সেই সকাল থেকেই, যখন তেনজিং নোরগে এবং আমি প্রথমবারের মত পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ আরোহণ করতে সক্ষম হলাম, আমাকে এক মহান অভিযাত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হতে থাকে। কিন্তু আমি আসলে স্রেফ এক পোড় খাওয়া কিউয়ি, যে জীবনের বহু প্রতিকূলতাকে উপভোগ করেছে মনে-প্রাণে।"- ন্যাশনল জিওগ্রাফিক পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এটাই ছিল এভারেস্ট বিজয়ী এডমন্ড হিলারির প্রতিক্রিয়া।

এভারেস্ট শিখর থেকে নামার পথে অনেকটা সময় পরে প্রথম যে মানুষটির সঙ্গে হিলারি ও তেনজিং-এর দেখা হল, তিনি ছিলেন সেই ঐতিহাসিক অভিযানের আরেকজন কিউয়ি, এডমন্ড হিলারির ঘনিষ্ঠ বন্ধু জর্জ লোয়ে। যিনি হিলারি এবং তেনজিং-এর জন্য গরম স্যুপের পাত্র নিয়ে বেশ খানিকটা উপরের দিকে এগিয়ে আসছিলেন। বন্ধুকে দেখতে পেয়ে হিলারি বললেন তাঁর সেই অমর বাক্য- ‘Well, George, we knocked the bastard off.’
এভারেস্ট থেকে নেমে আসার পরই একাধিক প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন দক্ষ পর্বতারোহী এডমন্ড হিলারি এবং শেরপা তেনজিং। প্রথম এভারেস্ট শিখরে কে উঠেছিলেন – হিলারি না তেনজিং? এই প্রশ্ন জন্ম দিল এক ঐতিহাসিক বিতর্কের। মাউন্ট এভারেস্টের নামকরণ থেকে প্রথম পরিমাপকর্তা নিয়ে যেমন বিতর্কের অবসান নেই, ঠিক তেমনই এভারেস্ট শীর্ষে প্রথম আরোহণের কৃতিত্ব কার – তা নিয়েও বিতর্ক তুঙ্গে।
হিলারির হিমালয়কেন্দ্রিক আত্মজীবনী ‘High Adevntures’ এবং ‘View from the Summit’ – এই দুটি গ্রন্থেই হিলারি লিখছেন – ‘আমরা একসঙ্গে শীর্ষে পৌঁছালাম।’ ‘A few more whacks of the ice axe in the firm snow, and we stood on top.’
বিতর্ক বাঁধল এবার একটি ছবিকে কেন্দ্র করে। এভারেস্ট শীর্ষে মানুষের প্রথম আরোহণের ছবিটি আজও পৃথিবীর সেরা আলোকচিত্রগুলির মধ্যে একটি। ছবিটি জনসমক্ষে প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে জোর শোরগোল পড়ে যায়। সেই চিত্রটিতে দেখা যায়, এভারেস্টের বরফসাদা শৃঙ্গে পতাকা নিয়ে দাঁড়িয়ে আর কেউ না, শেরপা তেনজিং। আর সেই ছবিটি তুলেছেন এডমন্ড হিলারি। ছবি তোলা অবধি না হয় ঠিকই ছিল, কিন্তু এভারেস্টে হিলারির কোনো ছবি নেই কেন? অনেক প্রশ্নের পর হিলারি স্বয়ং এর কারণ জানান। এভারেস্টে আরোহণের পর হিলারি জানতে পারেন, তেনজিং ক্যামেরা ব্যবহার করতে জানেন না। অতএব তাঁকে দিয়ে ছবি তোলানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এভারেস্টের স্মৃতি হিসেবে তাই হিলারি তেনজিং-এর ছবি তুলে দেন, যা ইতিহাস রচনা করে। সেযুগে সেলফি থাকলে হয়ত এই বিতর্ক উঠতই না।

এদিকে, এভারেস্ট জয়ের পর তেনজিংকে নিয়ে শুরু হয়ে গেছে এক অদ্ভুত আন্তর্জাতিক লড়াই। তেনজিং ভারতের, না নেপালের? তবে তেনজিংকে নেপালি নাগরিকের চেয়ে ভারতীয় প্রমাণ করতে ব্যগ্র হল একটি বিশেষ রাজনৈতিক মহল। সমস্ত জল্পনার অবসান ঘটিয়ে তেনজিংকে ভারতে রাখার ব্যবস্থা করলেন ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। দার্জিলিং-এ হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট স্থাপন করে তেনজিংকে সেখানকার প্রথম ডিরেক্টর করে দিলেন তিনি।
কিন্তু 'এভারেস্ট শিখরে প্রথম কে উঠেছে' – এই বিতর্কের অবসান হল না। সারা বিশ্বের সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে হিলারি ও তেনজিং ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।
সাংবাদিকদের সমস্ত জল্পনা-কল্পনায় জল ঢেলে তেনজিং তাঁর আত্মজীবনী – 'Man of Everest’-এ স্পষ্টভাবে জানালেন, হিলারিই প্রথম শিখর জয় করেছিলেন এবং সেই চল্লিশ ফুট উঁচু আপাত-অসম্ভব পাথুরে দেওয়ালটি, যার নামকরণ পরবর্তীতে করা হয় 'হিলারি স্টেপ', অতিক্রমের উপায় হিলারিই খুঁজে বের করেন, এবং তেনজিং তাঁকে কেবল অনুসরণ করে শিখরে পৌঁছেছিলেন।
কিন্তু তাতেও যখন মানুষের জল্পনা থামল না তখন তেনজিং মানুষের কৌতূহলে বিরক্ত হয়ে বলতে বাধ্য হলেন- "যদি এভারেস্টে হিলারির এক কদম পিছনে থেকে দ্বিতীয় মানুষ হিসেবে আরোহণ কোনো লজ্জাজনক বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে এই লজ্জা নিয়েই আমাকে বাকি জীবন অতিবাহিত করতে হবে।"

এদিকে কিছু সাংবাদিক এভারেস্টের সেই ছবি নিয়ে তেনজিংকে প্রশ্ন করলে তেনজিং বলেন একেবারে এক অন্য কথা। তেনজিং বলেন, তিনি হিলারির ছবি তুলে দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু অজ্ঞাত কারণে হিলারি নিষেধ করেন এবং বলেন, ‘শিখরে কে আগে উঠেছে’ – সেটা কাউকে না বলতে।
অন্যদিকে, এভারেস্ট জয়ের সংবাদে আপ্লুত ইংল্যান্ডের রানি এলিজাবেথ 'নাইটহুড' উপাধিতে ভূষিত করেন হিলারি এবং অভিযানের মূল নেতা জন হান্টকে। তেনজিং নোরগে ব্রিটিশ উপনিবেশের নাগরিক না হওয়ায়, বিদেশির জন্য সর্বোচ্চ সম্মান ব্রিটিশ এম্পায়ার মেডেল বা জর্জ মেডেল লাভ করেন। ব্রিটিশ সংবাদসংস্থার এক সূত্র থেকে জানা যায়, তেনজিংকেও নাকি নাইটহুড দেবার প্রস্তাব উঠেছিল সেসময়, কিন্তু রাজনৈতিক কারণে প্রধানমন্ত্রী নেহেরুর তাতে আপত্তি ছিল। যদিও নেপালের রাজা হিলারি ও তেনজিং উভয়কেই সম্মানিত করেন।
এডমন্ডের পেশা ছিল মৌমাছি পালন আর শখ ছিল অবসর মৌসুমে নিউজিল্যান্ডের নানা পর্বত আরোহণ। মৌমাছিপালকটি 'স্যার' উপাধি পাওয়ার পর বিনয়ের সাথে বলেছিলেন- "আমি সেই ধরনের মানুষ নই, যার উপাধির প্রয়োজন আছে।" আর শেরপা তেনজিংও হিলারির কৃতিত্বকে বরাবর সম্মান জানিয়ে এসেছেন। বিতর্ক যাই থাক, হিলারি ও তেনজিং ছিলেন একে অপরের প্রিয়জন।

এডমন্ড ছিলেন চিরকালের এক প্রচারবিমুখ মানুষ। ভাবলেও অবাক হতে হয়, তিনিই প্রথম অভিযাত্রী যিনি তিন-তিনটি মেরু – উত্তর মেরু, দক্ষিণ মেরু এবং 'এভারেস্ট' যাকে বলা হয় 'থার্ড পোল' বা তৃতীয় মেরু – জয় করেন। তিনমেরু জয়ী হিসেবে খুব কম মানুষই তাঁর নাম জানে। আরও একটা অজানা কথা, উত্তর মেরুজয়ে তাঁর সফরসঙ্গীর ছিলেন চাঁদে পা দেওয়া প্রথম মানুষ নীল আর্মস্ট্রং!
বিতর্ক যাই থাক, এভারেস্টজয়ী এই দুই মহারথীর অটুট বন্ধুত্বের নিশান।
ঋণ :'Man of Everest – Tenzing Norgay
High Adevntures -Sir Edmund Hillary
View from the Summit -Sir Edmund Hillary
Life and death on Everest- National Geographic Magazine. May 2003