গোটা রোম তখন কার্নিভালের চেহারা নিয়েছে

মারাদোনাকে স্বচক্ষে দেখার কথা ভেবে আমাদের ঘুম উড়ে যাওয়ার অবস্থা

প্লেন ছাড়ল কলকাতা বিমানবন্দর থেকে। দিল্লি হয়ে রোম পৌঁছব। আমি আর আমার স্ত্রী বাদে বাকি সবারই এই প্রথম বিদেশযাত্রা। শুধু তাই নয়, প্রথম প্লেনে চড়াও বটে। কিন্তু আটঘণ্টা আকাশে ওড়ার প্রাথমিক ভীতি কাটিয়ে ওরা বিশ্বকাপ কভার করতে যাওয়ার উত্তেজনাতেই ফুটছিল বেশি। প্লেনে যতটা সম্ভব পাশাপাশি বসার সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা। কী করে ভালো কভারেজ দেশে পাঠানো যায়-– তা নিয়ে আলোচনা করেই সারাটা পথ কেটে গেল প্রায়। মাঝেমধ্যে বিমানসেবিকারা এসে নিয়মমাফিক খাবার ইত্যাদি দিয়ে যাচ্ছিল। আমাদের এয়ার ইন্ডিয়া ফ্লাইটে আরও কিছু লোক দিল্লি থেকে উঠল, যারা রোমেই চলেছে আমাদের সঙ্গে। কথাবার্তায় মনে হল, কাগজের সাংবাদিক রয়েছেন কয়েকজন। পরে অবশ্য এঁদের সঙ্গে আলাপ জমেছিল রোমের মিডিয়া সেন্টারে।

রোমে পৌঁছলাম দুপুর দুটোয়। ক্যামেরা, এডিট মেশিন-সহ সেই বিশাল লটবহর কাস্টমস এবং ইমিগ্রেশন থেকে ছাড়াতে সময় প্রায় লাগলই না। বুঝলাম, ইটালিয়া ’৯০ উপলক্ষে ফিফা এবং ইতালির সরকার সারা পৃথিবী থেকে আসা প্রচারমাধ্যমের সুবিধে-অসুবিধের খেয়াল এয়ারপোর্ট থেকেই রাখতে শুরু করেছিল। তিনটে বড় মাপের ট্যাক্সি নিয়ে পৌঁছোলাম রোমের ঠিক মাঝখানে অবস্থিত ক্যাপিটাল হোটেলে, যা আগামী একমাস আমাদের থাকার এবং কাজের ঠিকানা। তিনটে ঘর বরাদ্দ হয়েছিল আমাদের জন্য, যার মধ্যে একটা ঘরে দেবকান্ত আর মোহান্তি তাদের নিজেদের এডিট সেটআপ গোছাবে ঠিক করল। রণদীপ মোটামুটিভাবে রুটিন ঠিক করে রেখেছিল। সেইমতো বেলা সাড়ে চারটেয় হোটেল থেকে বেরিয়ে মিডিয়া সেন্টারের দিকে রওয়ানা হলাম। প্রত্যেকের গলায় ঝোলাবার অ্যাক্রিডিটেশন কার্ড। আর আনুষাঙ্গিক যা যা করণীয়, রণদীপ আগে থেকেই ব্যবস্থা করে রেখেছিল। মিডিয়া সেন্টারে রণদীপের সঙ্গে আবার মিঃ বোত্তার দেখা হল। উনি প্রথমেই একগাল হেসে রণদীপকে বললেন – “আই হোপ ইউ উইল প্রোনাউন্স মাই নেম কারেক্টলি দিস টাইম।” রণদীপ মিঃ বোত্তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে একগাল হেসে ওঁর সঙ্গে আমাদের আলাপ করিয়ে দিল।

রোমে এসে প্রথমেই চোখে পড়েছিল, ’৯০-এর বিশ্বকাপে অংশগ্রহণকারী দেশগুলি থেকে আসা সমর্থকদের উৎসাহ এবং উদ্দীপনা। রোম শহরটা প্রায় একটা কার্নিভালের চেহারা নিয়েছিল। সারা পৃথিবীর এত রং একসঙ্গে একটা শহরে দেখার ঘোর বাংলা থেকে যাওয়া আমাদের ছ-সাতজনের টিমকে মন্ত্রমুগ্ধ করে দিয়েছিল। সবচেয়ে চোখে পড়েছিল ব্রাজিল আর আয়ারল্যান্ডের সমর্থকদের উৎসব। রোমের রাস্তায়-রাস্তায় সাম্বা নাচ, পাশাপাশি আইরিশ ব্যান্ডের পাগলপারা উন্মাদনা।

তখনও নিজেদের ঘড়িতে ভারতীয় সময় আটকে। মিডিয়া সেন্টারে কাজ হয়ে যাওয়ার পর, ওখানকার স্থানীয় সময় দেখলাম সন্ধে প্রায় সাতটা। কিন্তু দিনের বেলার মতোই চারদিকে আলো। প্রত্যেকেরই বেজায় খিদে পেয়েছিল। বিদেশ-বিভূঁইতে এসে, হোটেলে ফেরত না গিয়ে রাস্তাঘাটে কোথাও খাওয়া যায় কিনা – খোঁজখবর নিয়ে আমরা রোম স্টেশনের দিকে পাড়ি দিলাম। শুনেছিলাম, সস্তায় খাবার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে ওখানে। স্টেশন চত্বরে পৌঁছে, রাস্তার পাশের বেঞ্চে  বসে কিছুক্ষণ আড্ডা মারলাম। ইতালিয়ানদের সঙ্গে বাঙালিদের একটা বড় মিল – আমরা দুই জাতিই আড্ডাপ্রিয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ইতালিয়ান ধাপিতে বসে লোকজনের আড্ডা দেখে চট করে একবার কলকাতার কথা মনে পড়ে গেল। উত্তর কলকাতার আলো-আঁধারি গলি এভাবে যে স্মৃতিতে হানা দেবে, তাও এমন জায়গায় – ভাবিনি। হঠাৎ দেবকান্ত আমাদের প্রত্যেককে রাস্তার উল্টোদিকে একটা জটলার দিকে দেখতে বলল। বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে উবু হয়ে নিচে কী একটা দেখছে। বাঙালির ঔৎসুক্য আর আটকাবে কে! ‘ব্যাপারটা কী রে’ ভাব নিয়ে আস্তে আস্তে সেই জটলার দিকে এগিয়ে গেলাম। মুখটা একটু ভেতরে ঢোকাতেই মনে হল, টাইম ট্র্যাভেলে সোজা এ-বাংলায় ফিরে এসেছি। ভাত-পোস্ত আর মুরগির ঝোল বিক্রি করছে বাংলাদেশের দুটো ছেলে। সেই সময় বাংলাদেশ থেকে বহু যুবক ইতালিতে কাজের খোঁজে যেত এবং বেশ কিছু মাস বা বছর কাটাত। এটা তেমনই দুজনের উপরি উপার্জনের একটা বন্দোবস্ত। আর আমাদের পায় কে! বাংলাভাষায় খাবার অর্ডার দেওয়া, প্রায় কবজি ডুবিয়ে খাওয়ার মতো একটা পরিস্থিতি, এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া – মাঝেমাঝেই এই রোম স্টেশনে আমরা চলে আসব।

আগামী ৬ জুন বিশ্বকাপ ইতালি ৯০-এর প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা খেলবে ক্যামেরুনের সঙ্গে, মিলানের স্যান সিরো স্টেডিয়ামে। ডিয়েগো মারাদোনাকে মাঠে দেখা যাবে। মাঝখানে দুটো দিন বাকি। ঠিক হল, পরেরদিন সকালে আর্জেন্টিনার ট্রেনিং সেশনের টাইম দেখে, রোম শহর থেকে ২৫ কিমি দূরে ট্রিগোনিয়াতে আর্জেন্টিনা দলের ট্রেনিং দেখতে যাব। মারাদোনাকে স্বচক্ষে দেখার অভিজ্ঞতার কথা ভেবে আমাদের ঘুম প্রায় উড়ে যাওয়ার অবস্থা। ভারত থেকে একমাত্র টেলিভিশন কোম্পানি হিসেবে আমাদের বিশ্বকাপের প্রতিটি দেশের ট্রেনিং ক্যাম্পে ঢোকার অনুমতি দেওয়ায় ফিফাকে মনে-মনে ধন্যবাদ জানালাম।

রাত পেরোলে মারাদোনার জাদু। ফিরে এলাম হোটেলে। দেবকান্ত ও মোহান্তি তাদের এডিট সেটআপ করায় মন দিল। বাকিরা জেটল্যাগ ইত্যাদির অজুহাতে শুতে চলে গেল। অপেক্ষায় থাকলাম পরেরদিন সকাল ন’টায় মিডিয়া বাসে চড়ে রোম থেকে ২৫ কিমি দূরে ট্রিগোনিয়াতে মারাদোনাকে খেলার মাঠের বাইরে ক্যামেরাবন্দি করার।

স্বচক্ষে ফুটবলের রাজপুত্রকে দেখব, ভাবা যায়!

Post Tags
Developed by DXDasia