ব্ল্যাক হোল নামের ইতিহাসে কলকাতার যোগ কোথায়?

চুপসে যাওয়া অন্ধকার নক্ষত্রকে বলা হয় ব্ল্যাক হোল

মহাবিশ্বের সবথেকে রহস্যময় যে ক’টি বিষয় নিয়ে বিজ্ঞানীরা মাথা ঘামিয়ে থাকেন, সেগুলোর মধ্যে ব্ল্যাক হোল বা কৃষ্ণগহ্বরের নাম একেবারে প্রথমের দিকেই থাকে। ব্ল্যাকহোল এত বেশি ঘন সন্নিবিষ্ট থাকে, অর্থাৎ এর আয়তনের তুলনায় ভর এত বেশি এর মহাকর্ষ শক্তি প্রচণ্ড বেড়ে যায়। এই মহাকর্ষ কোনো কিছুকেই ব্ল্যাক হোলের থেকে বেরোতে দেয় না। এমনকি, তাকে ভেদ করে বেরোতে পারে না আলোর মতো তড়িৎ চুম্বকীয় তরঙ্গও। যার ফলে, ব্ল্যাকহোলগুলি মহাকাশে অভিশপ্ত অন্ধকার ক্ষতের মতো বিরাজ করে।

ব্রিটিশ ধর্মযাজক এবং বিজ্ঞানী জন মিচেল প্রথম বলেছিলেন বিপুল পরিমাণ ভর বিশিষ্ট এক ধরনের মহাজাগতিক বস্তুর কথা। ১৭৮৩ সালে তিনি রয়েল সোসাইটির সদস্য এবং বিজ্ঞানী হেনরি ক্যাভেন্ডিসকে এক চিঠি লিখে এই ব্যাপারে জানিয়েছিলেন। এমন বস্তু, যার থেকে আলো বেরিয়ে আসতে পারে না, তার কথা বলা ছিল সেই চিঠিতে। সেই বস্তুকে ‘অন্ধকার তারা’ (Dark Star) বলে উল্লেখ করেছিলেন মিচেল। গণিতবিদ পিয়েরে সিমন ল্যাপলেস ১৭৯৬ সালে একই রকম মহাজাগতিক বস্তুর কথা বলেন। তবে ব্ল্যাক হোলের প্রতি বিজ্ঞানীরা তখন খুব বেশি আকৃষ্ট হননি।

এইভাবে কেটে যায় অনেক বছর। আলোকে কীভাবে মধ্যাকর্ষণ শক্তি প্রভাবিত করতে পারে, ১৯১৫ সালে বিজ্ঞানী অ্যালবার্ট আইনস্টাইন সাধারণ আপেক্ষিকতার সূত্র আবিষ্কার করলে তা ব্যাখ্যা করা সম্ভব হল। এর ফলে, ব্ল্যাক হোল নিয়ে গবেষণা নতুন গতি পায়। কার্ল শোয়ার্জসচাইল্ড, জোহানেস ড্রোস্টের মতো বিজ্ঞানীরা জানাতে থাকেন, ব্ল্যাকহোলের মহাকর্ষীয় ধর্ম কত বিচিত্র। বিশ শতকের শুরুর দিকে গবেষকরা ব্ল্যাক হোলকে ‘মহাকর্ষীয় বিনষ্ট বস্তু’ (gravitationally collapsed object) নামে ডাকতেন। ‘ব্ল্যাক হোল’ নামটা এসেছে অনেক পরে।

কিন্তু এই মহাজাগতিক বস্তুর নাম ‘ব্ল্যাক হোল’ কীভাবে হল? ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির অধ্যাপক এবং বিজ্ঞান সংক্রান্ত নানা বইয়ের রচয়িতা মার্সিয়া বার্টুসিয়াক লিখেছেন, ১৯৬০-র দশকের শুরুতে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক রবার্ট ডিক এইসব অন্ধকার চুপসে যাওয়া নক্ষত্রগুলোর সঙ্গে কলকাতার অন্ধকূপ হত্যা (Black Hole of Calcutta)-র তুলনা করতেন। তিনি বলতেন, ওই মহাজাগতিক বস্তুগুলি আসলে কলকাতার অন্ধকূপের মতোই এক ধরনের ভয়ংকর কারাগার, যার থেকে কেউ বাইরে বেরোতে পারে না। রবার্ট ডিকের সন্তানরাও জানিয়েছেন, তাঁদের বাবা কথাপ্রসঙ্গে বলতেন কলকাতার অন্ধকূপ হত্যার কথা (“Ah, it must have been sucked into the black hole of Calcutta”)। বার্টুসিয়াকের মতে, মহাকাশের চুপসে যাওয়া তারার ‘ব্ল্যাকহোল’ নামটি এভাবেই এসেছে।

ছাপার অক্ষরে ‘ব্ল্যাক হোল’ কথাটি প্রথম ব্যবহার করা হয়েছিল ১৯৬৩ সালে, ‘লাইফ’ এবং ‘সায়েন্স নিউজ’ পত্রিকায়। পরবর্তীকালে বিজ্ঞানী জন হুইলার এই নামটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন। হুইলার ছিলেন প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে ডিকের সহকর্মী।

এই অন্ধকূপ হত্যার ব্যাপারটা আসলে কী? বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ১৭৫৬ সালে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্গ ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে নেন। ইংরেজ সেনাপতি জে জেড হলওয়েল জানিয়েছিলেন, সিরাজ ১৪৬ জন ইংরেজ সেনাকে বন্দি করেছিলেন। এইসব বন্দি সেনাকে নাকি ১৭৫৬ সালের ২০ জুন তারিখে ১৮ ফুট দীর্ঘ এবং ১৪ ফুট প্রস্থের এক ঘরে আটকে রাখা হয়েছিল। জুনের প্রচণ্ড গরমে এইভাবে ঠাসাঠাসি করে থাকতে গিয়ে ১২৩ জনের সেখানে মৃত্যু ঘটে। ইতিহাসে এই ঘটনাই অন্ধকূপ হত্যাকাণ্ড নামে পরিচিত হয়।

এই হত্যাকাণ্ড আদৌ ঘটেছিল কিনা, তা নিয়ে পণ্ডিতরা যথেষ্ট সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। বিজ্ঞানী ভোলানাথ চন্দ্র গণিতের মাধ্যমে প্রমাণ করেছিলেন, ওই রকম ছোটো জায়গায় এতজন দীর্ঘকায় মানুষে রাখা অসম্ভব। তিনি হাতেকলমে পরীক্ষা করেও হলওয়েলের দাবির অসত্যতা প্রমাণ করেছিলেন। ইতিহাসবিদ পার্সিভ্যাল স্পিয়ারও প্রশ্ন তুলেছিলেন মৃতদের প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে। অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় গবেষণা করে জানিয়েছেন, অন্ধকূপ হত্যার কাহিনি অবাস্তব এবং অসত্য। বর্তমান ইতিহাসের গবেষকরা অন্ধকূপ হত্যাকাহিনির অসত্যতা মেনে নিয়েছেন।

তথ্যসূত্র –
Black Hole: How an Idea Abandoned by Newtonians, Hated by Einstein, and Gambled on by Hawking Became Loved, by Marcia Bartusiak
Jane Austen and the Black Hole of British History: Colonial Rapacity, Holocaust Denial and the Crisis in Biological Sustainablilty by Gideon Maxwell Polya
 

Post Tags
Developed by DXDasia