
জোড়াবাগানের সঙ্গে ঠাকুর পরিবারের সম্পর্ক জোড়াসাঁকোর চাইতেও পুরোনো
২৬ নম্বর প্রসন্ন কুমার ঠাকুর স্ট্রিট। পাথুরিয়াঘাটা ছাড়িয়ে জোড়াবাগান অঞ্চল। তার ডানদিকে এই রাস্তা। আর সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে ভাঙাচোরা এক ‘ক্যাসেল’। একদা বিখ্যাত ‘দ্য টেগোর ক্যাসেল’। অবশ্য, আজ তাকে দেখে ক্যাসেল হিসেবে চিনে নেওয়া বেশ কঠিন। ভেতরে কয়েকটা পরিবারের বাস। বলা বাহুল্য, তারা ঠাকুর-পরিবারের কেউ নন। দেওয়ালের গায়ে ফোঁকর খুঁজে পায়রাদের সংসার। ভরদুপুরেও নির্জন হয় না এই জনপদ। ফলে, মাথা-তুলে অবশিষ্ট খাম্বাটির দিকে হাঁ-হয়ে থাকার অবকাশও মেলে না। গাড়িঘোড়া তো আছেই। আর আছে গিজগিজে লোক। অথচ, মুগ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখার মতোই আদল এই ক্যাসেলের। কলকাতা তো বটেই, গোটা দেশেও এমন আদলের প্রাসাদ আর একটিও নেই।
১৮৯৫ সালে ক্যাসেলটি গড়ে তোলেন যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর। ১৮২০ সালে নাপতেহাটায় পেল্লায় এক প্রাসাদ গড়েছিলেন কালী কুমার ঠাকুর। সেই প্রাসাদের নাম ‘টেগোর ম্যানসন’। পরে, নিজের ছোটো ভাই প্রসন্নকুমারকে সেই প্রাসাদের মালিকানা দিয়ে দেন কালী কুমার। এই প্রসন্নকুমার ঠাকুর কিন্তু যে-সে মানুষ নন। হিন্দু কলেজের অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র, ‘রিফর্মার’ পত্রিকার প্রকাশক এবং পরবর্তীতে ‘হিন্দু থিয়েটারের’ প্রতিষ্ঠাতা এই মানুষটি ছিলেন উনিশ শতকের কলকাতার আলোকিত ব্যক্তিত্বদের অন্যতম। তাঁর নামেই এই রাস্তা পরে পরিচিত হবে ‘প্রসন্ন কুমার ঠাকুর স্ট্রিট’ নামে। সেই রাস্তাতেই ১৩, ১৩এ, ১৩বি—ঠিকানা জুড়ে বিশাল অট্টালিকা– টেগোর প্যালেস।
ইতিহাসের পাতা থেকে– টেগোর ক্যাসেল
আর, এই প্যালেসের উল্টোদিকেই ‘ক্যাসেল’। উত্তরাধিকার সূত্রেই ঠাকুর পরিবারের এই সম্পত্তির ভাগ পেয়েছিলেন যতীন্দ্রমোহন। তিনি ঠিক করলেন, ইংল্যান্ডের উইন্ডসর ক্যাসেলের আদলে একটি প্রাসাদ বানাবেন। হঠাৎ বিলিতি ধাঁচার প্রাসাদ বানানোর মতি কেন হল যতীন্দ্রমোহনের, তা আজ বলা খুব মুস্কিল। এমনিতে, উনিশ শতকে একাধিক রাজা-জমিদার-অভিজাত মানুষদের হাতে নির্মিত অসংখ্য বাড়ি-প্রাসাদেই ব্রিটিশ স্থাপত্যের ছাপ স্পষ্ট। কোথাও আবার ব্রিটিশ গড়নের সঙ্গে মিলে গেছে এদেশীয় স্থাপত্যের ধাঁচও। কলকাতার নিজস্ব এক স্থাপত্যের আদলও গড়ে উঠেছে এভাবেই। আবার অনেকক্ষেত্রে, বিলিতি স্থাপত্যের প্রতি মুগ্ধতা প্রায় গোটা বাড়ি বা প্রাসাদের আদলটাকেই প্রভাবিত করেছে। উনিশ শতকের ঔপনিবেশিক কলকাতার অভিজাত-শিক্ষিত মানুষদের মনে ব্রিটিশ শিল্প-সাহিত্য-শিক্ষা-স্থাপত্যের প্রভাব আসলে বড়ো রহস্যজনক ধাঁধাঁর মতো। তাই, যতীন্দ্রমোহনের এই সিদ্ধান্তের আড়ালে ব্রিটিশ স্থাপত্যের প্রতি নিখাদ মুগ্ধতা ছিল, নাকি এর অন্তরালে লুকিয়ে ছিল লালমুখো সাহেবদের প্রতি প্রভুভক্তিও—সেটা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। কিন্তু, দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি নেহাত ফেলনা নয়। নাহলে কী আর এই কেল্লার চুড়োয় ব্রিটিশ পতাকা ইউনিয়ন জ্যাক ওড়াবার অনুমতিও আদায় করে ছাড়েন যতীন্দ্রমোহন!
জরাজীর্ণ প্রবেশপথ
বাঙালির জিন-জালিকায় ঔপনিবেশিকতার নানা রং এমনভাবেই নিহিত যে তাকে পাশে সরিয়ে রেখে উনিশ শতকের যে কোনোকিছু বিচার করতে গেলেই বিপত্তি ঘটবে। সেখানে, ব্রিটিশ-মুগ্ধতার সঙ্গেই দিব্যি জড়িয়ে থাকতে পারে দেশপ্রেম। বাংলা ভাষা-সংস্কৃতিকে নতুন আলোয় আবিষ্কারের আকাঙ্ক্ষার মধেই জড়িয়ে যেতে পারে ব্রিটিশ সাহিত্য-শিল্প-স্থাপত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ। মোদ্দায়, ব্যাপারটি সহজ নয়। আর, যা জটিল তাকে একরৈখিক কোনো সত্যের আলোতে দেখে ফেলার প্রবণতাও না রাখাই ভালো।
তাই, যতীন্দ্রমোহনের এহেন ইচ্ছের অন্তরালে যাই থাকুক না কেন, তার ফলাফলটি কিন্তু আমাদেরই ঐতিহ্যের কেন্দ্র। ফলাফল বলতে এই ক্যাসেল। ম্যাকিনটোশ বার্নের সাহায্যে এই ক্যাসেল নির্মিত হল। প্রাসাদের ভিতরে ১০০ ফুট উচ্চতার একটি টাওয়ার, সঙ্গে বিগবেনের আদলে ঘড়ি। কেল্লাটির আদল সত্যিই বিস্ময়ের উদ্রেক করে। ইউরোপে মধ্যযুগীয় প্রাসাদের মতো গম্বুজের গড়ন। সেগুলির মাথায় তিনকোণা টুপির মতো ছাউনি। প্রাসাদের ভিতরে বেশ কয়েকখানা বড়ো ঘর। তিনতলার ‘নাচঘর’ তো বিখ্যাত। সেখানে নাটকও অভিনীত হত একসময়।
টেগোর ম্যানসন– এখন
অথচ, এখন এই ক্যাসেলটিকে দেখলে তার যৌবনের সৌন্দর্য বোঝাই সম্ভব না। থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে গেছে এই প্রাসাদ। প্রবেশপথের গেট জরাজীর্ণ। তার চাইতেও খারাপ অবস্থা তার প্রথম নির্মাতা থুড়ি প্রথম মালিক যতীন্দ্রমোহনের। আত্মবিস্মৃত বাঙালি তাঁকে মনে রাখার প্রয়োজনই বোধ করেনি।
হিন্দু কলেজের ছাত্র, ইংরেজি ও সংস্কৃতে সুপণ্ডিত যতীন্দ্রমোহন ছিলেন ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি, পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট। মহারাজা-বাহাদুর খেতাব আদায় করেছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটি, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, মায়ো হাসপাতাল, ফোটোগ্রাফিক সোসাইটি, জাদুঘর এই সমস্ত কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যতীন্দ্রমোহনের নাম। সঙ্গীতে তাঁর বিপুলআগ্রহ ছিল। প্রথম, ‘সুরবাহার’ অনুষ্ঠিত হয় যতীন্দ্রমোহনেরই পৃষ্ঠপোষণায়। আর পাথুরিয়াঘাটায় তিনি শুরু করেন, বঙ্গনাট্যালয়। ছিলেন মধুসূদন দত্তর ঘনিষ্ট বন্ধু। তাঁকে ‘তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য’ লিখতে উৎসাহিত করা থেকে শুরু করে তার ছাপার খরচ পর্যন্ত দেন যতীন্দ্রমোহন। বঙ্কিমচন্দ্র, ঈশ্বর গুপ্ত প্রমুখের সঙ্গে নিত্য ওঠাবসা ছিল এই মানুষটির। মোদ্দায় বলা যেতে পারে, যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর বিশ শতকের কলকাতার সাহিত্য-সংস্কৃতির জগতে একটি অন্যতম নক্ষত্র।
রাস্তার ওপারের বিশাল অট্টালিকাটির ইতিহাসও কিন্তু কম রঙিন নয়। বিলিতি আদবকায়দায় অভ্যস্ত প্রসন্নকুমার খ্রিশ্চান হওয়ার অপরাধে ত্যজ্যপুত্র করেছিলেন জ্ঞানেন্দ্রমোহন ঠাকুরকে। এই জ্ঞানেন্দ্রমোহনই ছিলেন প্রথম ব্যারিস্টার যিনি লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে হিন্দু আইন পড়াতেন। ইতিহাসের পরিহাস, অনেক আইনি লড়াইয়ের পরেই পূর্বপুরুষদের এই সম্পত্তিটি বেদখলদারদের থেকে উদ্ধার করেছেন সৃজিত ঠাকুর।
এমনিতে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে জোড়াবাগানের সম্পর্ক জোড়াসাঁকোর চাইতেও পুরোনো। সপ্তদশ শতাব্দীর শেষে চার্নক সাহেব যখন কলকাতা নগর পত্তন করলেন, এই অঞ্চলের জনসংখ্যা তখন বেশ কম। বড়বাজার অঞ্চলে কিছু মানুষ থাকেন ব্যবসার সূত্রে। আর, জোড়াবাগান অঞ্চলে নাকি ছিল শেঠদের বাগান বাড়ি। পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই মূলত উত্তর কলকাতা জমজমাট হতে থাকে। শোভাবাজার, পাথুরিয়াঘাটার সুনাম ছড়াতে থাকে। ঠাকুরেরা অনেকদিন আগেই কলকাতায় এসেছিলেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলেন কলকাতার নানা জায়গায়। তবে, শেষে তাদের ঠিকানা হয় পাথুরিয়াঘাটা। কলকাতায় ঠাকুর পরিবারের ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপন করেন শ্রীপঞ্চানন ঠাকুর। বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ এই ব্যক্তি বেছে নিয়েছিলেন ‘ক্যাপ্টেন-পাকড়াও’এর কাজ। অর্থাৎ জাহাজের ক্যাপ্টেন ও খালাসিদের মালপত্র সরবরাহ করতেন। তাতে ছিল দেদার রোজগার। টাকা-পয়সাও বেশ ভালোই জমিয়েছিলেন।
টেগোর ম্যানসনের বর্তমান মালিকানা
পুত্র জয়রাম অবশ্য সেই পথে হাঁটেননি। কলকাতার জমিদারির কাছারিতে ছিল তার কাজ। যদিও পর্যাপ্ত অর্থ করেছিলেন তিনিও। তাঁর ছিল দুই স্ত্রী ও তিন পুত্র– দর্পনারায়ণ, নীলমণি ও গোবিন্দরাম। দর্পনারায়ণের দর্পের কথা সুবিদিত। ইংরেজরা তাকে বলত, ‘merchant of calcutta’। কলকাতায় থেকে তিনি ব্যবসা করতেন আর নীলমণি থাকতেন তখন উড়িষ্যায়। মূলত, এই দুই ভাই মিলেই পাথুরিয়াঘাটায় ভদ্রাসন নির্মাণ করেন। হয়তো দুজন একসঙ্গেই থাকতেন। কিন্তু, ছোটো ভাই গোবিন্দরামের মৃত্যুর পরে তাঁর বিধবা পত্নীর সঙ্গে সম্পত্তির বিবাদ শুরু হয়। সেই বিবাদ গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। বিবাদের জেরে নীলমণি চলে যান জোড়াসাঁকোয়। জোড়াসাঁকো অবশ্য তখন পরিচিত মেছুয়াবাজার হিসেবেই। আর পাথুরিয়াঘাটায় থেকে যায় দর্পনারায়ণেরা। দর্পনারায়ণের বিখ্যাত বংশধরেরাই হলেন শ্রীপ্রসন্নকুমার ঠাকুর, পুত্র জ্ঞানেন্দ্রমোহন, ভ্রাতুষ্পুত্র যতীন্দ্রমোহন ঠাকুরেরা।
পরিবারবর্গের সঙ্গে যতীন্দ্রমোহন
সেদিক থেকে দেখলে, দ্বারকানাথই প্রথম জোড়াসাঁকোকে পরিচিতি দিচ্ছেন। তারপরে দেবেন্দ্রনাথ। আর, এরপর থেকে ঠাকুরবাড়ির সূত্রেই জোড়াবাগান ও জোড়াসাঁকো– এই দুই ‘জোড়াই’ হয়ে উঠছে কলকাতার শিল্প-শিক্ষা-সঙ্গীত-সংস্কৃতির অন্যতম দুই পীঠস্থান।
টেগোর ক্যাসেলের গায়ের একটা ফলকেও অবশ্য এই ইতিহাসের কিচ্ছুটি লেখা নেই। ব্যস্ত গলি, অসংখ্য মানুষ, ভাড়াটে, জবরদখল করে বাস করা পরিবার, আইনি-লড়াই, ঝুলে পড়া ইলেকট্রিকের তার, ভাঙাচোরা গেট, থামের ভিতর দিয়ে মুখ বের করা অশত্থের চারা পরিবেষ্টিত হয়ে এই প্রাসাদ যেন অপেক্ষা করে আছে ভেঙে পড়বে বলে। আশেপাশেই হয়তো ওঁত পেতে আছে প্রোমোটারদের দল।
এসব দেখে শুনে একটা কথাই মনে হয়। যে জাতি ইতিহাস বাঁচিয়ে রাখতে পারে না, নিজেদের বাঁচিয়ে রাখতে তারা শিখেছে তো!
