তেনজিং নোরগে – মাউন্ট এভারেস্টকে বিখ্যাত করেছিলেন যিনি

তেনজিং নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এভারেস্ট বিজয়ের দিনটিই তাঁর জন্মদিন হিসেবে বিবেচ্য হবে

১৯৫৩ সালের ২৯ মে, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষ ছুঁয়েছিলেন দু’জন কালজয়ী পর্বতারোহী। একজন নিউজিল্যান্ডের স্যার এডমন্ড হিলারি, অন্যজন শেরপা তেনজিং নোরগে। এবং আনুষ্ঠানিকভাবে, এই দিনটি তেনজিং-এর জন্মদিনও। আর এই দুই ঘটনা উপলক্ষেই সারা বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয় আজকের দিনটি।  

১৯১৪ সালে মে মাসের শেষের দিকে জন্মেছিলেন তেনজিং, এ ছাড়া তাঁর জন্ম তারিখের সত্যিকারের কোনও রেকর্ড নেই, তাই তেনজিং নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এভারেস্ট বিজয়ের দিনটিই তাঁর জন্মদিন হিসেবে বিবেচ্য হবে। “২৯ মে, যখন তিনি পর্বতশীর্ষে পৌঁছেছিলেন, তখন তেনজিং নিজেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন এই দিনটিই হবে তাঁর জন্মদিন”, বলছিলেন ২০১০ সালের প্রথম এভারেস্ট জয়ী বাঙালি দেবাশিস বিশ্বাস।  

সে অর্থে, নিজের জন্মদিন নির্বাচনকে ন্যায়সঙ্গত বলেই প্রমাণ করেছিলেন তেনজিং। এই দিনটি শুধু তাঁকে নতুন জীবন দিয়েছিল এরকম নয়, সমগ্র শেরপা সম্প্রদায়ের ইতিহাসেই এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল এই দিনটি। সহস্রাব্দ ধরে ভারত-নেপাল হিমালয় অঞ্চলের বাসিন্দা হিসেবে, হিমালয়ের প্রতি জ্ঞান, সেই সঙ্গে পর্বতারোহণে সুদক্ষ, অবিশ্বাস্যরকম দৃঢ়, নিবেদিত ও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ পাহাড়ী মানুষদের এই গোষ্ঠীটি অতুলনীয়। তবুও, তেনজিং যদি সেই দিন সমস্ত প্রতিকূলতা সরিয়ে মাউন্ট এভারেস্টের শীর্ষে পা না রাখতেন, তাহলে হয়তো শেরপারা বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি অর্জন করতে পারত না।.এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা, লৌৎসে, মাকালু, মনস্লু, অন্নপূর্ণা, ধৌলগিরি – সাতটি আটহাজার মি-প্লাস হিমালয় পর্বতের শীর্ষে পৌঁছানো একমাত্র ভারতীয় পর্বতারোহী হিসেবে দেবাশিস বিশ্বাস নিশ্চয়ই জানেন সে কথা। তাঁর কথায়, “শেরপা ছাড়া আমার কোনও অভিযানই সম্ভব হত না।“ দেবাশিস বাবু আরও বলেন, “এমনকি হিমালয়ের প্রত্যেক পর্বতারোহীর ক্ষেত্রেই কথাটা খাটে। এবং এটা তেনজিং-এর সত্যিকারের কৃতিত্ব, তিনি গোটা বিশ্বকে বুঝিয়ে ছেড়েছিলেন শেরপাদের ভূমিকাটা এক্ষেত্রে ঠিক কীরকম।"

এরপরও থেমে থাকেননি তিনি। নিজের আন্তর্জাতিক খ্যাতিকে কীভাবে শেরপাদের দুর্দশার উন্নতিতে কাজে লাগাবেন, সে উপায়ও খুঁজে বের করেছিলেন তেনজিং। যেকোনও কাউকেই অল্প টাকার বিনিময়ে তাঁর সঙ্গে ছবি তোলার জন্য অনুরোধ করতেন তিনি এবং প্রত্যেককেই জানিয়ে দিতেন, সেই টাকার পুরোটাই চলে যাবে দরিদ্র শেরপা জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক উন্নতির জন্য গড়ে তোলা তহবিলে। সম্ভবত একজন কুলি হিসেবে জীবিকা শুরু করার সুবাদেই তেনজিং দৃঢ়সংকল্পবদ্ধ ছিলেন যে, সারা বিশ্ব শেরপাদের চিনবে, শুধুই ভারী বোঝা বহনকারী হিসেবে নয়, পর্বত-দিশারী হিসেবে।

“কোনও বিতর্কে না গিয়েই বলবো, শীর্ষে পৌঁছনোর ব্যাপারে এডমণ্ড হিলারির সমতুল্য কেউ হতেও পারেন নাও হতে পারেন, তবে শেরপা তেনজিং নোরগে অতুলনীয় ছিলেন।“ দৃঢ়স্বরে বলেন দেবাশিসবাবু। তাঁর কথায় “হিলারি খুম্বু হিমবাহের (তখন সেই রুটটি চালু হওয়ার কাজ চলছিল) খাদে পড়ে গেছিলেন। তেনজিং ঠিক তাঁর পিছনে ছিলেন এবং আক্ষরিকঅর্থে তাঁর জীবন বাঁচিয়েছিলেন। "

দেবাশিস বাবুর কথায়, “তেনজিং শেরপাদের ঈশ্বর।“ বেশিরভাগ লোকই তাঁকে সবসময় এভারেস্ট বিজয়ী হিসেবে মনে রাখতে গিয়ে ভুলে যান যে, তেনজিং ১৯৩০-এর দশক থেকেই হিমালয়ে আরোহণ শুরু করেছিলেন এবং অনেক আগেই তিনি এভারেস্ট শীর্ষ ছুঁয়ে ফেলেছিলেন।“ সেটা ১৯৪৭ সাল হবে, তেনজিং তখন কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত আর্ল ডেনম্যান এবং আং দাওয়া শেরপাকে নিয়ে একটি ব্যর্থ অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন। ৬৭০০ মিটার (২২০০০ ফুট) উঁচুতে উঠে প্রবল ঝড়ের প্রকোপে পড়ে সেই অভিযানে ইতি টানতে হয়েছিল তাঁদের।

শেরপাদের আদি নিবাস, তিব্বতে জন্মগ্রহণ করা তেনজিং অবশেষে দার্জিলিং-এই থেকে গিয়েছিলেন। সেখানে আজ শেরপা জনগোষ্ঠীর একটি বিশাল জনবসতি গড়ে উঠেছে। দেবাশিস বাবুর কথায়, “তাঁর ইচ্ছে ছিল এমন জায়গায় থাকবেন, যেখানে জানলা খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যাবে।“ একটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কাছে কাঞ্চনজঙ্ঘা পবিত্র স্থান হওয়ায় তেনজিং কখনো তার শৃঙ্গ ছোঁয়ার চেষ্টা করেননি, তবে ১৯৮৬ সালে তাঁর মৃত্যুর আগে পর্যন্ত আজীবন মনের মনিকোঠায় রেখেছিলেন কাঞ্চনজঙ্ঘাকে।

 

 

Developed by DXDasia