
কলকাতার বিগ বেনই একমাত্র ঘড়ি যাতে বৈদ্যুতিন ধ্বনি শোনা যায়
বয়ে চলাই সময়ের ধর্ম, অথচ কলকাতা শহরের পিছুটান এমনই যেন মনে সময় খানিক থমকে গেলে মন্দ হতো না! হগ মার্কেটের সামনে গেলে মিলবে ঠিক সেরকমই ছবি। সে ঘড়ির সময় আক্ষরিকই থমকে আছে। ১টা ১৫ বেজে দীর্ঘকালের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছে সে ঘড়ি। অন্যদিকে আবার হাওড়া স্টেশনের (Howrah Station) বড়ো ঘড়ির কিন্তু একটাই মন্ত্র। চরৈবতি। প্রতিদিন নিত্যযাত্রীরা সময় মিলিয়ে নেন সে ঘড়িতেই। কলকাতার আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে ইতিহাস-মাখা বেশ কিছু ঘড়ির গল্প। টিক-টিক অথবা ঢং-ঢং শব্দে কিংবা নিঃশব্দেই ইতিহাসটুকু রয়ে চলছে প্রতিনিয়ত।
কলকাতার সব প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ঘড়িগুলির মধ্যে এটাই একমাত্র ঘড়ি যাতে বৈদ্যুতিন ধ্বনি শোনা যায়। ১৭টি লাউডস্পিকারে শোনা যায় সেই শব্দ, দম দিতে হয় সাত দিন অন্তর।
মল্লিকবাজার, আর্মেনিয়ান গির্জা, সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল গির্জা অথবা কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট বা জিপিওর (GPO) ঘড়ির কোনো কোনোটা আজও সচল, কোনোটা বা থমকে গেছে কবেই। কলকাতা যেন ঘড়ির শহর। বৌবাজারে ভীম নাগের বিখ্যাত মিষ্টির দোকান-এর বাংলা হরফে লেখা সেই ব্রিটিশ আমলের ঘড়ি কানে কানে যেন আজও কত ইতিহাস বলে চলে।
ঐতিহ্যের শহরে ঘড়ির গল্প আজকের নয়। ঘড়ি নিয়ে মাতামাতি করা বাঙালির চিরাচরিত অভ্যাস। দম দেওয়া হাত ঘড়ি থেকে শুরু করে স্মার্ট ওয়াচ পর্যন্ত জার্নিটা বেশ আবেগের বলা চলে। তবে শহুরে ঘড়িতে বিদেশি ছোঁয়া কিন্তু কেবল স্মার্ট ওয়াচের ধরণেই নয়, ঘড়ি-মিনারের আড়ালেও মিলবে সেই গল্পের রেশ। ব্রিটেনের (Briten) সংসদ ভবনে রয়েছে বিশ্ববিখ্যাত বিগ বেন ঘড়ি। ৩১৫ ফুট উঁচু এই বিগ বেন ঘড়িই ব্রিটেনের এক ঐতিহ্যের প্রতীক। হবহু সেই ঘড়ির আদলে এ শহরেও তৈরি হয়েছে আরেকটি নতুন ঘড়ি-মিনার। আর খোদ কলকাতা শহরেই এখন হাজির বিগ বেন।
কলকাতা বিমানবন্দর থেকে গাড়ি করে শহরের মধ্যে প্রবেশ করতে করতে ঢুকে পড়তে হবে কাজী নজরুল সরণিতে, যেটি ভিআইপি রোড নামেই সবথেকে বেশি পরিচিত। শহরের কোলাহল-নাগরিক ব্যস্ততার ছবি চোখে সয়ে যেতে যেতেই চমকে দিয়ে সামনেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যাবে আস্ত এক ঘড়ি-মিনার। কলকাতার বিগ বেন। লেকটাউন আর ভিআইপি রোডের এক্কেবারে মাঝখানে কলকাতার বুকেই যেন এক টুকরো বিলেত দাঁড়িয়ে আছে। ঠিক অবিকল লন্ডনের ওয়েস্টমিন্সটারের বিশাল সেই বিগ বেন ঘড়ি।
আসল বিগ বেন (Big ben) ঘড়ি-মিনারের মতোই লেকটাউনেও চারটি গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি বসানো রয়েছে চারটি পৃথক দিকে। এর পোশাকি নাম কলকাতা টাইম জোন। তিলোত্তমা শহরের সৌন্দর্যায়নের অংশ হিসেবে এই ঘড়ি-মিনার নির্মিত হয়েছে দক্ষিণ দমদম পৌরসভার অধীনে। সালটা ২০১৫। কলকাতায় বানানো হল ১৩৫ ফুট উঁচু এই ঘড়ি মিনার। কোনও এক অ্যাংলো-সুইস কোম্পানির হাতে তৈরি হয় এই মিনার। লন্ডনের বিগ বেনের একেকটি ঘড়ির ডায়ালের পরিধি যেমন ছিল কমবেশি ২৩ ফুট, সেখানে কলকাতার লেকটাউনের (Lake Town) বুকে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঘড়ি-মিনারের চারটি ঘড়ির প্রতিটির পরিধি ১২ ফুট। লন্ডনের বিগ বেনের আদলে গড়ে তোলা এই রেপ্লিকাটি বানাতে সেই সময়েই খরচ হয়েছিল প্রায় ১.৩৬ কোটি টাকা। ফাইবার রি-ইনফোর্সড পলিমার দিয়ে তৈরি হয়েছে এই ঘড়ি-মিনারের বাইরের ধাঁচ। মূল বিগ বেনের কাঠামোর কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টায় সাফল্য কতটা এসেছে তা কলকাতাবাসীই ভালো বলতে পারবেন। জনৈক বেঞ্জামিনের নামের অনুকরণে স্থাপিত লন্ডনের বিগ বেন ঘড়িটিতে যেমন একটি প্রায় ১৪ টন ওজনের ঘন্টা রয়েছে, তেমনটা কিন্তু নেই ‘কলকাতার বিগ বেন’ নামে খ্যাত এই লেকটাউনের ঘড়ি-মিনারে। কলকাতার সব প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ঘড়িগুলির মধ্যে এটাই একমাত্র ঘড়ি যাতে বৈদ্যুতিন ধ্বনি শোনা যায়। ১৭টি লাউডস্পিকারে শোনা যায় সেই শব্দ, দম দিতে হয় সাত দিন অন্তর।
কলকাতা (Kolkata) একদিন কল্লোলিনী তিলোত্তমা হবে, এই আশ্বাস তিল তিল করে বুকে বেঁধেছে কলকাতাবাসী। ব্রিটিশরা চলে গেছে বহু যুগ হল, তবু আজও কলকাতার বুকে এই লেকটাউনের ঘড়ি-মিনারে সেই ব্রিটিশ আধিপত্যকেই কি স্মরণ করায় না! কলকাতার উল্লেখযোগ্য ল্যান্ডমার্ক হয়ে উঠতে পারলেও, এই ঘড়ি-মিনার শহরের ইতিহাসের সঙ্গে মিশতে পেরেছে কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।
