বড়িশার সাবর্ণদের সংগ্রহশালায় আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব

১৮তম আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবে ভারত আর ইতালির মেলবন্ধন

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদের সম্পাদক দেবর্ষি রায়চৌধুরী ও ইতালির কনসুলেট জেনারেল রিকারো ডালা কোস্টা

সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার পরিষদ (Sabarna Roy Choudhury Paribar Parishad) প্রতি বছরই ফেব্রুয়ারিতে আয়োজন করে আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসব, যা এ বছর আঠারোতে পড়ল। শহরের বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের অমূল্য সংগ্রহ উৎসবে সেজে উঠেছিল দশটি ‘থিম’-এ বাঁধা প্রদর্শনীতে। নিউ আলিপুর কলেজের (New Alipore College) সহযোগিতায় সাবর্ণ সংগ্রহশালায় (বড়োবাড়ি, বড়িশা) আয়োজিত এই ইতিহাস উৎসবের এ বারের ‘থিম কান্ট্রি’ হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল ইতালিকে (Italy)। ইতিহাসের টানে অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছিলেন বিশিষ্ট নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী, নিউ আলিপুর কলেজের অধ্যক্ষ জয়দীপ ষড়ঙ্গী, সংগীতশিল্পী সোমলতা আচার্য চৌধুরী, অভিনেতা নীলাদ্রি লাহিড়ী, রাজা সেন, ইতালির কনসুলেট জেনারেল রিকারো ডালা কোস্টা (Riccardo Dalla Costa)-সহ আরও অনেকেই।

নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী ও রিকারো ডালা কোস্টা

ইতালির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক অনেকটা গভীর, ইতিহাস উৎসবের সূচনাকালে মনে করিয়ে দেন নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী। ইতালির নাট্যকার লিউইজি পিরানদেল্লোর ‘সিক্স ক্যারেক্টার্স ইন সার্চ অফ অ্যান অথর’ থেকে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত অনুবাদ করে লেখেন ‘নাট্যকারের সন্ধানে ছ’টি চরিত্র’। পরিচালনা করেন অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়। পরবর্তীকালে ইতালির নোবেলজয়ী নাট্যকার দারিও ফো-র নাটক নিয়ে চর্চা হয় এবং তাঁর নাটক ‘মৃত্যু না হত্যা’, ‘হচ্ছেটা কী’ নাটকগুলি মঞ্চস্থ হয় এই বাংলায়।

আন্তর্জাতিক ইতিহাস উৎসবের সূচনা লগ্নে রিকারো ডালা কোস্টা, নাট্যব্যক্তিত্ব বিভাস চক্রবর্তী, সংগীতশিল্পী সোমলতা আচার্য চৌধুরী, অভিনেতা নীলাদ্রি লাহিড়ী, নিউ আলিপুর কলেজের অধ্যক্ষ জয়দীপ সারেঙ্গী, রাজা সেন প্রমুখ

১৮ তম ইতিহাস উৎসবে ঠাঁই পেয়েছে প্রায় তিন হাজার বছর আগের মৃৎপাত্র থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আগে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রামের টিকিট ও দুষ্প্রাপ্য ছবি। দেখা গেছে আদিম মানুষের ব্যবহৃত পাথর ও ধাতুর বিভিন্ন পাত্রও।

বিশ্বের ২৮টি দেশ থেকে সংগৃহীত রাম ও রামায়ণ সংক্রান্ত ডাকটিকিট স্থান পেয়েছে প্রদর্শনীতে। এ ছাড়াও রয়েছে চলচ্চিত্র পরিচালক তপন সিংহের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষ্যে তাঁর চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত সামগ্রী থেকে শুরু করে ছবি সম্পর্কিত দুষ্প্রাপ্য পোস্টার ও তথ্য। ইতিহাস উৎসবের শুরুর দিন প্রকাশিত হয়েছে সাবর্ণ পরিবারের ঐতিহ্যবাহী হাতে লেখা পত্রিকা ‘সপ্তর্ষি’র চৌত্রিংশতিতম সংখ্যা।

১৮ তম ইতিহাস উৎসবে ঠাঁই পেয়েছিল প্রায় তিন হাজার বছর আগের মৃৎপাত্র থেকে শুরু করে স্বাধীনতার আগে কলকাতার ঐতিহ্য, ট্রামের টিকিট ও দুষ্প্রাপ্য ছবি। এ ছাড়াও আদিম মানুষের ব্যবহৃত পাথর ও ধাতুর বিভিন্ন পাত্রও বেশ আকর্ষণীয়।

বাগদেবীর নানা রূপে ডোকরা থেকে শুরু করে পট প্রদর্শিত হয়েছে এই উৎসবে। ইতিহাস নিয়ে বর্তমান প্রজন্মের আগ্রহ ঠিক কতটা, এ বিষয়ে নিউ আলিপুর কলেজের অধ্যক্ষ জয়দীপ ষড়ঙ্গী জানান, আমরা বেশ কয়েক বছর ধরে কলকাতার ইতিহাস নিয়ে কাজ করছি। গবেষণাধর্মী ভবানীপুরের ইতিহাস নিয়ে বেশ কয়েকটি পাঠ্যপুস্তক প্রকাশিত হয়েছে। তিনি আরও জানান, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে তাঁরা সমগ্র কলকাতার ইতিহাস নিয়ে একটা বই প্রকাশ করার চেষ্টা করছেন, যা কলকাতার ইতিহাসপ্রেমী মানুষের কাছে আরও অনেকটা মনোগ্রাহী হবে বলে আশা করা যায়। বইটি ট্রাভেল গাইড হিসাবেও কাজ করবে বলে আশা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদেরও। 

শহরের বিশিষ্ট সংগ্রাহকদের অমূল্য সংগ্রহ উৎসবে সেজে উঠেছিল দশটি ‘থিম’-এ বাঁধা প্রদর্শনী। মৃণাল সেন ও তপন সিংহের জন্মশতবর্ষে শ্রদ্ধার্ঘ্য: তাঁদের ব্যবহৃত জিনিসের পাশাপাশি ছিল সিনেমার পোস্টার, বুকলেট, ছবি ইত্যাদি। রাজেন্দ্র প্রসাদ থেকে শুরু করে প্রফুল্ল সেন, ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী প্রমুখের লেখা চিঠি ছিল প্রদর্শনীর আর একটি ভাগে। ১৯৩৭ থেকে কলকাতার ট্রামের টিকিটের যাত্রা ‘ট্রামের এ কাল-সে কাল’ বিভাগে।

 

দেশভাগ-পরবর্তী উত্তাল রাজনৈতিক সময়ের প্রেক্ষাপটে ‘প্রণয়ের গান গাহিতে বোলো না মোরে’ গানটি গ্রামোফোন কোম্পানি থেকে রেকর্ড করেছিলেন সংগীতশিল্পী সত্য চৌধুরী। প্রণব রায়ের লেখা গানে সুর দিয়েছিলেন কমল দাশগুপ্ত। তৎকালীন পাকিস্তান সরকার গানটিতে হিংসা ও হানাহানির চিত্র নিয়ে আপত্তি তোলে। দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সুসম্পর্ক রাখতে গানটি নিষিদ্ধ করে বাজার থেকে তুলে নেওয়া হয়। প্রদর্শনীতে প্রাসঙ্গিক সব তথ্য সাজিয়ে দেওয়া ছাড়াও, গানটি শোনানোরও ব্যবস্থা ছিল।

নিউ আলিপুর কলেজের শিক্ষক ও পড়ুয়ারা

প্রদর্শনীতে তুলে ধরা হয়েছিল ভারত-ইতালি সম্পর্ক। ছিল রামায়ণ বিষয়ে তাইল্যান্ড কম্বোডিয়া সিঙ্গাপুর মালয়েশিয়া নেপাল ভুটান-সহ ২৮টি দেশের ডাকটিকিট-সম্ভার। প্রদর্শিত হয়েছে অভিষেকের সময় রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের পোশাকে ব্যবহৃত একটি ‘টাসেল’ বা ঝালর। বিভিন্ন শিল্পমাধ্যমে বাগ্দেবীর উপস্থাপনায় সেজে উঠেছিলো একটি বিভাগ। ছিল হরপ্পা-মহেঞ্জোদড়ো সভ্যতার অস্ত্র ও নানা সামগ্রী। গত ১১ থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা এই উৎসব চলে সাবর্ণ রায়চৌধুরী বড়ো বাড়িতে। সম্মানিত করা হয়েছে সংস্কৃতিজগতের বিশিষ্টজনদের। ছিল কুইজ, আলোচনা, হেরিটেজ ওয়াকও। 

নিজেদের এই উদ্যোগ প্রসঙ্গে দেবর্ষি বলেন, ‘‘প্রতি বছর আমরা এ ধরনের প্রদর্শনীর আয়োজন করি। তাতে এক বছর ধরে গবেষণামূলক কাজকর্ম চলে। এ বারও অনেক পরিশ্রম করে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছি।’’

পরিশেষে এ কথা বলাই যায় যে বাংলার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সাবর্ণদের এই ইতিহাস উৎসব প্রতিবারের মতো এবারও ইতিহাসপ্রেমীদের সমৃদ্ধ করেছে। সংগীতশিল্পী সোমলতা আচার্য যেমন বলছিলেন, এই ইতিহাস উৎসবে  হয়তো বিশাল সংখ্যক মানুষের ভিড়় নেই, কিন্তু যাঁরা ইতিহাসের গুরুত্ব বোঝেন, তাঁরা অবশ্যই রয়েছেন, এটাই পরম প্রাপ্তি।

সাবর্ণ সংগ্রহশালার ঠিকানা : 
সপ্তর্ষি ভবন, বড়ো বাড়ি, ৬৭/৩, ডায়মন্ড হারবার রোড, বড়িশা, কলকাতা, ৭০০০০৮
ফোন : ৯৮৩০২৮৯৪০০

Post Tags
Developed by DXDasia