
আকাদেমির সামনে প্রতি মাসে পত্র-পত্রিকা সাজিয়ে বসেন একদল মানুষ
হাট বসেছে শুক্রবারে। না, থুড়ি, এই হাট শুক্র নয়, শনিবারের। প্রতি মাসের দ্বিতীয় শনিবার। বিক্রেতারা কেউ সরকারি চাকুরে, কেউ বা শিক্ষক, কেউ চাকরি করেন সল্টলেকের অফিসে। থিয়েটারও করেন কেউ কেউ। কাজ-কম্মো-রিহার্সাল থাকলেও এই একটা দিন সব ছেড়ে সবাই হাজির হবেনই আকাদেমির সামনের চত্বরে। কারো বাড়ি হাওড়ায়, কেউ বা মফস্বলের মানুষ। দূরত্ব যতই হোক, এই একদিন কারো কোনো না নেই, কামাই নেই হাজিরায়। চত্বরে এসেই টেবিল-চেয়ার পেতে বসে পরা। ঝুলি-ব্যাগ থেকে একে একে বের করা পত্রিকা-চটি-মোটা বই। তারপর, এক ভাঁড় চায়ে বোধন সেরে শুরু পাঠকের অপেক্ষা। প্রতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে এমনই পার্বণে মাতেন কয়েকজন লিটল ম্যাগাজিন কর্মী।

লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন সফল না ব্যর্থ তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। এই ধরনের কোনো আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা আদৌ আছে কিনা, তা নিয়েও বিতর্ক আছে যথেষ্ঠ। সেই সব বিতর্কের মধ্যে না ঢুকেও বলা যায়, দুর্গাপুজোর মতোই লিটল ম্যাগাজিন পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতির অঙ্গ তো বটেই, আমাদের পরিচিতিকে একটা নতুন মাত্রা দিয়েছে এইসব ছোটো ছোটো পত্রিকাগুলো। এমনকি বাংলাদেশেও লিটল ম্যাগাজিনের এত রমরমা নেই, যা আছে আমাদের রাজ্যে। একথা অনস্বীকার্য যে, কোনো বাণিজ্যিক লাভের কথা চিন্তা না করে ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াতে গেলে আজকের যুগে যথেষ্ট কলজের জোর লাগে, এই সব ছোটো পত্রিকাগুলোর হিম্মতকে তাই শ্রদ্ধা জানাতেই হয়।

যে কোনো কাজই যখন বড়ো পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন হয়, তখন জোট বাঁধা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। লিটল ম্যাগাজিনগুলোও বারবার জোট বেঁধেছে, কখনও রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতায়, কখনও নিজেদের অস্তিত্বের তাগিদে। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রামের টালমাটাল পরিস্থিতিতে এমনভাবেই তৈরি হয়েছিল ‘লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চ’। তাদের উদ্যোগে ২০০৮ সালে প্রেসিডেন্সি কলেজের মাঠে আয়োজিত হয়েছিল গোটা পশ্চিমবঙ্গের লিটল ম্যাগাজিন কর্মীদের প্রথম নিজস্ব মেলা। দু’বছর সেখানে মেলা চলার পর জায়গা পালটে কলেজ স্কোয়ারে চালু হল ‘সারা বাংলা লিটল ম্যাগাজিন মেলা’, প্রতি জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে যেটা এখনও চলছে। এই মেলা একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে লিটল ম্যাগাজিন কর্মী এবং লিটল ম্যাগাজিনের পাঠকদের কাছে। অনেক পত্রিকাই এই মেলা উপলক্ষ্যে বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।
আরও পড়ুন
কলকাতার বুকে বাংলাদেশের বই-তরণী
কয়েক বছর জমজমাট মেলা চালানোর পর লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চের কয়েকজন সক্রিয় সদস্যের মনে হয়েছিল, সারা বছর পাঠকদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখতে গেলে শুধুমাত্র শীতকালের কয়েকটা মেলা যথেষ্ট নয়। গোটা শীতকাল জুড়েই সারা বাংলা এবং কলকাতায় অনেকগুলো লিটল ম্যাগাজন মেলা এবং বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু এর বাইরেও বছরের অন্য সময়গুলোতে পাঠকের সামনে পত্রিকা নিয়ে বসার প্রয়োজন আছে। লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলন কেবল শীতের বিনোদন নয়, এর সৃজনশীলতাকে সারা বছরের মনন এবং মেহনতের সঙ্গে যুক্ত করার দরকার। সেই ভাবনা থেকেই ঠিক হয়, প্রতি মাসের অন্তত একটা দিন কলকাতার যে কোনো একটা জায়গায় লিটল ম্যাগাজিন পত্রিকা নিয়ে বসার আয়োজন করতে হবে। এমন একটা জায়গাকে বেছে নিতে হবে, যেখানে সারা বছরই পথচলতি মানুষের আনাগোনা থাকে। ভেবেচিন্তে আকাদেমি অফ ফাইন আর্টস আর রাণুছায়া মঞ্চের সামনের চত্বরটাকেই বেছে নেওয়া হল, যেখানে এমনিতেই নানান জিনিসের বিকিকিনি হয়, তার মধ্যে পাশের প্যারিশ হল থেকে টেবিল চেয়ার ভাড়া করে প্রতি মাসের শেষ শনিবার বসা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হল।
২০১৪ সালের গ্রীষ্মকালে প্রথমবার লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা তাঁদের পত্রিকা নিয়ে সেখানে জমায়েত হলেন। এরপর থেকে প্রত্যেক মাসেই মেলা বসছে। জগতে সবকিছুই পরিবর্তনশীল, এই মাসিক মেলারও কিছু বদল ঘটেছে কালের নিয়মে। মাসের শেষ শনিবারের বদলে এখন মেলা বসে প্রতি মাসের দ্বিতীয় শনিবার, বিকেল সাড়ে চারটে থেকে সন্ধে সাতটা। ২০১৭ সাল থেকে এই মেলার নাম রাখা হয়েছে ‘লিটল ম্যাগাজিন হাট’।

‘জনস্বার্থ বার্তা’, ‘সদিনামা’, ‘একক মাত্রা ’, ‘জনমন’, ‘নিবিড় ’, ‘স্বাস্থ্য শিক্ষা উন্নয়ন’-এর মতো কয়েকটি পত্রিকা নিয়মিত এই লিটল ম্যাগাজিন হাটে যোগদান করে। পাশাপাশি আরও অনেক পত্রিকাকেও এখানে দেখা যায় অনিয়মিতভাবে, যেমন ‘বিনির্মাণ’, ‘গুরুচণ্ডালী’, ‘মাস্তুল’, ছাপাখানার গলি’, ‘চৌরঙ্গী’ এবং আরও কয়েকটি লিটল ম্যাগাজিন। ধীরে ধীরে এই হাট মানুষের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে। যদিও কলেজ স্কোয়ারের মতো জমজমাট নয়, তা সত্ত্বেও পাঠক এবং ক্রেতার সমাগমও আগের থেকে খানিকটা বেড়েছে। পত্রিকা বিক্রির পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতেও এই হাটে প্রতিবাদ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশের শাহবাগ আন্দোলনে সমর্থন জানানো হয়েছে এই হাট থেকে, উত্তর প্রদেশের দাদরি গণপিটুনির ঘটনায় জানানো হয়েছে প্রতিবাদ, কর্ণাটকে গৌরী লঙ্কেশ হত্যার প্রতিবাদে হাটেই পোস্টার প্রদর্শনের আয়োজন করা হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন সমন্বয় মঞ্চের অন্যতম আহ্বায়ক প্রেমাংশু দাশগুপ্তের কথায়, “শত অবজ্ঞা সত্ত্বেও লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা প্রতি মাসেই সাধারণ মানুষের সামনে পত্রিকা সাজিয়ে বসছেন, এটাই আমাদের কাছে সবথেকে বড়ো প্রাপ্তি”।
