গানে, কবিতায় ভারতের অন্যতম প্রথম চা-বিশেষজ্ঞ ডলি রায়ের স্মৃতিচারণা

ঘরোয়া আড্ডায় ডলি রায়কে স্মরণ করলেন শুভানুধ্যায়ী ও গুণমুগ্ধরা

ত ২১ এপ্রিল ৬৯ বছর বয়সে কলকাতার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে প্রয়াত হয়েছিলেন ভারতের অন্যতম প্রথম মহিলা চা-বিশেষজ্ঞ ও চা-পরীক্ষক ডলি রায়। গত ৫ মে দক্ষিণ কলকাতার দক্ষিণাপনে হয়ে গেল তাঁর স্মরণ-অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন সমাজের বিভিন্ন অংশের বিশিষ্ট মানুষ এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা। সেখানে নানান স্মৃতিচারণার মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।

ডলি রায়ের হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত উপস্থিতি, আধুনিকতা আর নান্দনিকতায় মোড়া আসবাব, বিভিন্ন ধরনের ফ্রুট টি, স্যান্ডউইচ, ইকো-ফ্রেন্ডলি পরিবেশে এই ক্যাফেটেরিয়াটি হয়ে উঠেছিল অনন্য। এখানেই তিনি উৎসাহীদের শেখাতেন দার্জিলিং, আসাম, কাশ্মিরী কাওয়া, লেমন জিঞ্জার, অরেঞ্জ অ্যান্ড মিন্ট টি-এর রকমফের আর তৈরির প্রণালী। এখানে গিফট প্যাকে বিক্রিও হয় এইসব বহুমূল্য সুস্বাদু চায়ের পাতা।

বঙ্গজীবনের অঙ্গ চা। সেই চায়ের কত ধরন, স্বাদ, গন্ধ, বর্ণ। মিস্টার গার্ডেনের হাত ধরে দার্জিলিংয়ে প্রথম পরীক্ষামূলক চা চাষ (১৮৩৫), তারপর দার্জিলিং লাগোয়া আলুবাড়িতে কার্শিয়াং-দার্জিলিং চা-কোম্পানির হাত ধরে চা-গার্ডেনের গোড়াপত্তনের মাধ্যমে বাণিজ্যিক চা চাষের শুরু (১৮৫৬)। এখন একুশ শতক। সময়ের হাত ধরে চায়েরও ভোলবদল ঘটেছে। দুধ চা আর লিকার চা পেরিয়ে এসেছে দার্জিলিং টি (ফার্স্ট ফ্লাশ, সেকেন্ড ফ্লাশ), আর্ল গ্রে, মিন্ট চা, ফ্লেভারড-চা, আইস-টি, হাল আমলের ডুয়ার্স টি। সেইসব রকমারি চা-কে বাংলাতে প্রথমবার নিয়ে আসেন শ্রীমতি ডলি রায়।

বিবাহসূত্রে তৃণমূল সাংসদ সৌগত রায়ের স্ত্রী ডলি রায় (Dolly Roy)। কিন্তু স্বামীর ছায়া ছাড়িয়ে নিজের কর্মবলে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলার ফ্লেভারড-টি সংস্কৃতির পথিকৃৎ। তিনি ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা টি-টেস্টার। ১৯৭০-এর দশকে মাত্র কুড়ি বছর বয়সে যখন মুম্বাইয়ের টি-বোর্ডে কর্মরতা ছিলেন, তখন তাঁকে টি-অ্যাম্বাসাডার হিসাবে আমেরিকাতে পাঠানো হয়। পরবর্তী জীবনে ইউরোপ এবং ভারতের টি-ব্রোকিং ফার্মে সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। চাকরি-পরবর্তী জীবনে কলকাতার দক্ষিণাপনে তিনি খোলেন কলকাতার প্রথম টি-শপ ডলিস টি (Dolly’s The Tea Shop – ১৯৮৮)। আজকে যখন শহরজুড়ে আর শহরতলিতে ইন্দ্রজালের মতো ছড়িয়ে পড়ছে অসংখ্য টি-শপ আর ক্যাফেটেরিয়া, সেই সময় দাঁড়িয়ে বলা যায় এই সংস্কৃতির আদি জাদুকর ছিলেন তিনিই। 

 

এই দোকানটি শহর কলকাতার চা-প্রেমীদের মিলনক্ষেত্র হতে বেশি সময় নেয়নি। সাধারণ মানুষ, সেলিব্রিটি সবার পছন্দের আড্ডাঘর হল এই দোকানটি। ডলি রায়ের হাস্যোজ্জ্বল প্রাণবন্ত উপস্থিতি, আধুনিকতা আর নান্দনিকতায় মোড়া আসবাব, বিভিন্ন ধরনের ফ্রুট টি, স্যান্ডউইচ, ইকো-ফ্রেন্ডলি পরিবেশে এই ক্যাফেটেরিয়াটি হয়ে উঠেছিল অনন্য। এখানেই তিনি উৎসাহীদের শেখাতেন দার্জিলিং, আসাম, কাশ্মিরী কাওয়া, লেমন জিঞ্জার, অরেঞ্জ অ্যান্ড মিন্ট টি-এর রকমফের আর তৈরির প্রণালী। এখানে গিফট প্যাকে বিক্রিও হয় এইসব বহুমূল্য সুস্বাদু চায়ের পাতা। অনেক দশক পেরিয়ে এই টি শপ এখনও সগৌরবে বিরাজমান, যেখানে গেলে কিছুদিন আগে পর্যন্তও ডলি রায়কে সমস্ত প্রাণবন্ততা নিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যেত।

তাঁর স্বপ্নের এই টি-শপেই তাঁকে স্মরণ করলেন বাংলার চা-প্রেমী মানুষের একাংশ। সমাজের বিশিষ্টজন, তাঁর পরিবার, বৃহত্তর পরিবার, টি-শপের স্নেহধন্য কর্মীদের উপস্থিতিতে এই স্মরণসভাটি ভরে উঠেছিলো। উপস্থিত ছিলেন বাংলার অভিনয় ও সংগীত জগতের বহু মানুষ। বিশিষ্ট অভিনেত্রী বিদীপ্তা চক্রবর্তী শ্রীমতি ডলি রায়কে স্মরণ করে বার্তা পাঠের মাধ্যমে স্মরণসভার সূচনা করেন। তারপর সাংসদ সৌগত রায় তাঁর সহধর্মিনীর স্মৃতিচারণ করেন। বিশিষ্ট অভিনেত্রী সুদীপ্তা চক্রবর্তী কবিতাপাঠের মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর একে একে সংগীত পরিবেশন করেন বাবুয়া সেনগুপ্ত, অনিমা সিনহা, সুকন্যা রায় সরকার, দ্বীপান্বিতা হাজরা, দোহার ব্যান্ডের সদস্যরা। স্মরণসভায় উপস্থিত ছিলেন অভিনেতা সুজয়প্রসাদ চ্যাটার্জি, অভিনেত্রী মুনমুন সেন, বিশিষ্ট অভিনেত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগ সেন, বাংলার প্রাক্তন ক্রিকেটার রাজু ব্যানার্জি, ভারতের প্রাক্তন সরকারি আমলা, সুবক্তা ও লেখক, অধুনা রাজ্যসভার সদস্য জহর সরকার। উপস্থিত ছিলেন তাঁর পরিবারের আপনজনেরা। বিকেল ৪টে থেকে শুরু হয়ে সন্ধে ৭টা পর্যন্ত চলে এই স্মরণসভা।

চা-বিলাসী বাঙালি। চায়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অতীত, বর্তমান। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বেড়ে ওঠে আলাপ, বন্ধুরা আরও কাছে এসে বসে। চায়ের ধোঁয়ার সঙ্গে গজিয়ে ওঠে, এগিয়ে চলে আড্ডা, আলোচনা। খেলা, রাজনীতি, সমাজ, অর্থনীতি, ব্যক্তিগত আলাপচারিতা, ধর্ম, প্রেম। চায়ের কাপে লেগে থাকে পুরোনো বন্ধুদের স্মৃতি, যাদের সঙ্গে আড্ডা জমতো রোজ, কিন্তু এখন আর দেখা হয় না। সেই চায়ের ঠেক, চায়ের স্বাদ ও ধরনের সঙ্গে কখনও কখনও জড়িয়ে যায় কোনো এলাকাও, যে এলাকাগুলি নির্দিষ্ট সেই চায়ের ঠেক বাদ দিলে অচেনা দেশের মতো মনে হয়। অনাড়ম্বর এই স্মরণসভায় গানে, কবিতায়, স্মৃতিচারণে সেই সমস্ত চায়েস্থেটিক বাঙালির পক্ষ থেকে তাঁর জন্য যেন উচ্চারিত হল সেই কালজয়ী পংক্তি- “এক কাপ চায়ে আমি তোমাকে চাই।”

Post Tags
Developed by DXDasia