
দেখা যাবে অস্ট্রেলিয়ার জীব বৈচিত্র, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, বন্যপ্রাণ
কলকাতা শহরের রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছে এক টুকরো অস্ট্রেলিয়া। আহা! ঘাবড়ে যাবেন না যেন! মহানগরের রাস্তায় চলমান অস্ট্রেলিয়া আদপে একটি ট্রাম। অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন কেন্দ্র থেকে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীব বৈচিত্র থেকে সংস্কৃতি এ’সব নিয়েই সেজে উঠেছে গোটা একটি ট্রাম। ট্রামের অন্দরও সেজে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ার ছোঁয়ায়। রয়েছে ক্যাঙারুর মূর্তি। ট্রামের একেবারে সামনে লেখা রয়েছে ‘COME AND VISIT AUSTRALIA!’

অভিনেত্রী রাইমা সেন, অস্ট্রেলিয়ার কনসল-জেনারেল হিউ বয়লন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহণ সচিব সৌমিত্র মোহন
কলকাতা ও অস্ট্রেলিয়া, ট্রাম আজও সচল দুই জায়গায়। কলকাতার ট্রামের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দেড়শো বছর আগে, ১৮৭৩-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি, কলকাতায় ছুটেছিল ভারতের প্রথম ট্রাম। তবে তা ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম। সেই ট্রাম টেনে ছিল অস্ট্রেলিয়ান ঘোড়া।
১৮ জুন থেকে সফর শুরু করেছে বিশেষ ট্রামটি। দিন পনের তার চলার কথা। এ দেশের মানুষের কাছে অস্ট্রেলিয়ার পর্যটনের প্রসার ও প্রচারের জন্য এমন উদ্যোগ নিয়েছে কলকাতায় অবস্থিত অস্ট্রেলিয়ার দূতাবাস। বিশেষ ট্রামের সফর শুরুর দিন হাজির ছিলেন, অভিনেত্রী রাইমা সেন, অস্ট্রেলিয়ার কনসল-জেনারেল হিউ বয়লন এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পরিবহণ সচিব সৌমিত্র মোহন। রাইমা হলেন এই উদ্যোগের মুখ।
ধর্মতলা ট্রাম ডিপোয় তনবীর আলমের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। আটের দশকের শেষ থেকে তিনি ট্রাম চালাচ্ছেন, ন’মাস পর তিনি অবসর নেবেন। এখন তিনি ড্রাইভারদের ইন-চার্জ। প্রায় তিন দশকেরও বেশি সময় যাবৎ শহরের ট্রামের বহু ওঠাপড়ার সাক্ষী। বললেন, ২৫২/১ নম্বর ট্রামের কামরা অস্ট্রেলিয়ার থিমে সাজে সাজানো হয়েছে। এই বিশেষ ট্রাম নিয়ে আম জনতা কতটা আগ্রহী? বঙ্গদর্শন.কম-কে তনবীর বলেন, “আগ্রহ ভালোই আছে। গাড়ি ধর্মতলায় এলে আশপাশের বাচ্চারা আসছে, দেখেছে। মানুষ জানতে চাইছে কী জন্য এমন সাজানো হয়েছে, ছবি তুলছে। ট্রামটা বেশ কিছুদিন ধরে চলছে, এখন রাস্তার ধুলোবালি, কাদায় প্রথম দিনের জাঁকজমক ভাবটা চলে গেছে।”

ট্রাম ডিপোতে বসে লক্ষ্য করলাম বিশেষ ট্রামটিকে ডিপোয় ঢুকতে দেখে এবং ডিপো থেকে রওনা হওয়ার সময়, অনেকেই বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। জানতে চাইছেন বিশেষ ট্রামটি নিয়ে। এমনকি ওই ট্রামে উঠতে বাড়তি টাকা লাগবে কি-না সে’প্রশ্নও করলেন একজন। অর্থাৎ মানুষের মধ্যে প্রচারের কিছুটা খামিত রয়েছে গিয়েছে। অনেকে জানেন না। এখন ট্রামের নিত্যযাত্রীর সংখ্যা খুব কম। তবুও যাঁরা নিয়মিত ট্রামে চড়েন এমন দু-একজনের বক্তব্য, তাঁরা বিশেষভাবে সাজানো ট্রামটি দেখেছেন, চড়েছেন। অস্ট্রেলিয়াকে মাথায় রেখে ট্রামের সাজসজ্জা তাঁদের ভালো লেগেছে।
তনবীর জানালেন, ট্রামটি গড়িয়াহাট থেকে ছেড়ে ধর্মতলায় (Esplanade) আসে, তারপর শ্যামবাজার যায়। ফিরতি পথে শ্যামবাজার থেকে ধর্মতলায় এসে গড়িয়াহাট ফিরে যায়। দু’বেলা একবার করে হলেও বিশেষ ট্রামটি চলাচল করছে। অন্ততপক্ষে সকালে একবার ও বিকেল একবার।

কথা হচ্ছিল পরিবহণ দপ্তরের কর্মী উত্তম মান্নার সঙ্গে। তিনি ধর্মতলার ট্রাম-গুমটির দায়িত্বে আছেন। বললেন, “বিকেলের দিকে অনেক লোক আসেন ট্রাম দেখতে। ট্রামের সঙ্গে ছবি, সেলফি তুলছেন। ট্রামের ভিডিও করছেন। এর মাধ্যমে যত মানুষ ট্রামের কাছাকাছি আসছেন, এমনি সময় তো আসেন না, এটাই একটা ভালো দিক।” বিশেষ ট্রামটির কনডাক্টর উপেন্দ্রনাথ সিং বললেন, রাস্তায় লোকজন দাঁড়িয়ে ট্রামের সাজগোজ দেখছেন। একটা কৌতূহল তৈরি হচ্ছে। পাশাপাশি অনেকেই গাড়ির সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ করছেন।
কলকাতা ও অস্ট্রেলিয়া, ট্রাম আজও সচল দুই জায়গায়। কলকাতার ট্রামের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দেড়শো বছর আগে, ১৮৭৩-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি, কলকাতায় ছুটেছিল ভারতের প্রথম ট্রাম। তবে তা ছিল ঘোড়ায় টানা ট্রাম। সেই ট্রাম টেনে ছিল অস্ট্রেলিয়ান ঘোড়া। ট্রামের প্রতি ভালোবাসায় তিন দশক ধরে কলকাতার ট্রাম রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন শহরের ট্রাম কন্ডাক্টর রবের্তো দান্দ্রিয়া। কলকাতা ট্রামের দেড়শো বছর পূর্তিতে আয়োজিত ট্রামযাত্রা উপলক্ষ্যে গত বছরেও তিনি কলকাতায় এসেছিলেন।

ট্রামের মধ্যে রাইমা ও হিউ বয়লন
কলকাতায় ট্রাম কেবল গণপরিবহণের মাধ্যম নয়। শহরে সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং নস্টালজিয়া মিশে আছে তাতে। এবার ট্রামের সঙ্গে যুক্ত হল অস্ট্রেলিয়ার পর্যটন। অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, জীব বৈচিত্র, বন্যপ্রাণ, ভ্রমণ কেন্দ্র ইত্যাদি তুলে ধরছে ২৫২/১ নম্বর ট্রামটি। ট্রামের গায়ে ফুটে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ার নানান দৃশ্য। এতে অস্ট্রেলিয়ার পর্যটনের প্রচার হচ্ছে। ভ্রমণপ্রেমী বাঙালি অস্ট্রেলিয়ার সাজে সাজানো ট্রামে চাপলে, তাঁদের মনে অস্ট্রেলিয়া দেখার সাধ হবে। তাঁরা বেড়ানোর গন্তব্য হিসাবে বেছে নেবেন ক্যাঙারুর দেশকে। এই আশা থেকে বিশেষ ট্রাম সফরের উদ্যোগ। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও কলকাতার বন্ধুত্ব আন্তরিক হবে। নিবিড় সাংস্কৃতিক যোগাযোগও গড়ে উঠবে।
