
দেবেন্দ্রনাথের কঠিন নির্দেশে ‘বিধবা বিবাহ’ বন্ধ করে এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
সাহানাদেবী ও প্রতিমাদেবী
১৮৫৬ সালের ২৬ শে জুলাই বিদ্যাসাগর (Vidyasagar) এবং লর্ড ডালহৌসির (Lord Dalhousie) উদ্যোগে বিধবা বিবাহ আইন (widow Remarriage Act) প্রতিষ্ঠা পেল। তবে সমাজে মান্যতা পেতে যে লড়াই শুরু হল তার শেষ কি আদৌ হয়েছে? এই বিষয়ে মনের দ্বিধা দ্বন্দ্ব আজও হয়তো পুরোপুরি অতিক্রম করতে পারেনি বাঙালি (Bengali)। ঠাকুরবাড়ির মতো আধুনিক প্রগতিশীল পরিবারেও বিধবা বিবাহ (Widow Remarriage) হতে সময় লেগেছিল বেশ।
দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিগত জীবনে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বেশ গোঁড়া ছিলেন। প্রথমজীবনে রবীন্দ্রনাথের সাধ্য ছিল না তাঁকে অতিক্রম করে নিজের ভাবনাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার।
প্রথম বিধবা বিয়ের কথা উঠতেই দেবেন্দ্রনাথের (Debendranath Tagore) কঠিন নির্দেশে রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath tagore) সে বিয়ে বন্ধ করে এসেছিলেন। অথচ পরে নিজের ছেলে রথীন্দ্রনাথের (Rathindranath Tagore) সঙ্গে বিধবা প্রতিমাদেবীর (Pratima Devi) বিয়ে দিয়েছিলেন। এই দ্বিচারিতা একক কোনও প্রাচীন সংস্কার নয়। এর আড়ালে রয়েছে নতুন ভাবনা গ্রহণ করতে না পারার যৌথ সামাজিক অপারগতা। তাছাড়া দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্যক্তিগত জীবনে বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে বেশ গোঁড়া ছিলেন। প্রথমজীবনে রবীন্দ্রনাথের সাধ্য ছিল না তাঁকে অতিক্রম করে নিজের ভাবনাকে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার। ঠাকুরবাড়িতে (Thakurbari) শুরুর দিকে বিধবা বিবাহে মত ছিল না কারো। বিদ্যাসাগরের এতটা আধুনিক ভাবনার শরিক প্রথমেই হতে পারেনি ঠাকুর পরিবার।

দেবেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথের এক দাদা ছিলেন বীরেন্দ্রনাথ ঠাকুর (Birendranath Tagore)। তিনি ছিলেন মস্তিষ্কবিকারগ্রস্ত। বিয়ের কিছুদিন পর থেকেই তিনি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। সারাদিন নিজের ঘরে বসে অঙ্ক করতেন, খাবার খেতেন না। তাঁর স্ত্রী প্রফুল্লময়ীর জীবন ছিল বড় কষ্টের। দুখিনীর জীবনপ্রদীপ ছিল তাঁদের সন্তান বলেন্দ্রনাথ। কিন্তু দুর্ভাগ্য প্রফুল্লময়ীর সঙ্গ ছাড়েনি। বলেন্দ্রনাথ ছিলেন স্বল্পায়ু। বলেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর রয়ে গেলেন সাহানাদেবী (Sahana Devi), বলেন্দ্রনাথের স্ত্রী। মাত্র ষোলো বছরের মেয়েটির বৈধব্য মেনে নিতে পারেননি প্রফুল্লময়ী। সাহানার বাবা এবং তিনি ঠিক করেছিলেন সাহানার আবার বিয়ে দেবেন। এই বিষয়ে মনস্থির করে সাহানাকে নিয়ে এলাহাবাদ চলে গিয়েছিলেন প্রফুল্লময়ী। কিন্তু বিয়ের আগে সেখানে উপস্থিত হলেন রবীন্দ্রনাথ, দেবেন্দ্রনাথের প্রতিনিধি হয়ে। উদারচেতা ঠাকুরবাড়ির একজনও রাজি ছিলেন না এই বিয়েতে। রবীন্দ্রনাথ বুঝিয়ে সুঝিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন সাহানাদেবীকে। সাহানা ঠাকুরবাড়িতে যথাযথ মর্যাদার আসনও পাননি। বিলেত গিয়ে লেখাপড়া করেছেন। কিন্তু দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে ফিরেও এসেছেন। তারপর খুব অল্প বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়। প্রফুল্লময়ী নিজের স্মৃতিকথায় দুঃখ করে লিখেছিলেন, ‘আমিই তাঁর একমাত্র অবলম্বন ছিলাম’।
তবে আধুনিক বলিষ্ঠ ভাবনা নিজের জোরেই জায়গা করে নিয়েছিল ঠাকুরবাড়িতে। পাথুরিয়াঘাটার ঠাকুরবাড়িতে প্রথম বিধবাবিবাহ হয়েছিল। দর্পনারায়ণ ঠাকুরের ছেলে হরিমোহনের উত্তরপুরুষ সতীন্দ্রমোহনের মেয়ে ছিলেন ছায়াময়ী। রবীন্দ্রনাথ ছায়াময়ীর বিয়ের সম্বন্ধ করেছিলেন নিজের মেজো মেয়ে রেণুকার স্বামী সত্যেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। রেণুকা তার বছর পাঁচেক আগে মারা গিয়েছেন। সেই থেকে শোকসন্তপ্ত হয়েও রবীন্দ্রপরিবার সত্যেন্দ্রনাথের সঙ্গে ছিলেন এবং তাঁর বিয়ের আয়োজন করেন। ১৯০৮ সালের ১৮ই জুন এই বিয়ে হয়। রবীন্দ্রনাথ রেণুকার গয়না ছায়াময়ীকে দেওয়ার কথাও বলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের ঘটনা এই যে বিয়ের কয়েকমাসের মধ্যে সত্যেন্দ্রনাথ মারা যান। ছায়ার দুঃখের কথা ভেবে কোনো কিনারা পাচ্ছিলেন না কেউ। রবীন্দ্রনাথ তখন যতীন্দ্রমোহনকে মেয়ের দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়ার জন্য উৎসাহ দেন। ছায়ার পুনর্বিবাহ হয় এবং এইটিই ছিল ঠাকুরবাড়ির প্রথম বিধবা বিবাহ। পাত্র ছিলেন ঢাকার বিখ্যাত ব্রাহ্ম নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের ছেলে নলিনীকান্ত চট্টোপাধ্যায়। এই বিয়েতে রবীন্দ্রনাথের পূর্ণ সমর্থন ছিল। যতীন্দ্রমোহন নিজেও বেশ সাহসী ছিলেন। ছায়াময়ী এইবার পরিপূর্ণ সুখ ও শান্তির জীবন কাটিয়েছিলেন। বিধবা বিবাহ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের মত ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হচ্ছিল।
ঠাকুরপরিবার ধীরে ধীরে ‘বিধবা বিবাহ’ নামের সামাজিক আলোটিকে গ্রহণ করতে শুরু করেছিল। খেয়াল রাখতে হবে এই প্রগতিশীল আচরণ সম্ভব হয়েছে ১৯০৫ সালের পর।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে প্রথম বিধবা বিবাহ রথীন্দ্রনাথ-প্রতিমাদেবীর বিয়ে। এই বিয়ে ঠাকুরবাড়িতে মুক্ত মনের স্পর্শ নিয়ে এল। পিরালি ব্রাহ্মণ ঘরে রক্তের সম্পর্কহীন কাছাকাছি সম্পর্কের মধ্যে বিয়ে হত। প্রতিমাদেবী ছিলেন পাঁচ নম্বর ঠাকুরবাড়ির বিনয়িনীর মেয়ে। অবনীন্দ্রনাথ-সমরেন্দ্রনাথ-গগনেন্দ্রনাথের ভাগনি। প্রতিমাদেবীর জন্মের পর মৃণালিনীদেবী বলেছিলেন, এই মেয়েটিকে তিনি পুত্রবধূ করবেন। রবীন্দ্রনাথও বিষয়টি জানতেন। প্রতিমাদেবী একটু বড় হওয়ার পর রবীন্দ্রনাথের কাছে বিয়ের প্রস্তাব যেতে তিনি গররাজি হয়েছিলেন। কারণ রথীন্দ্রনাথের তখন কিশোর বয়স। প্রতিমাদেবীর বিয়ে হয়ে যায় নীলানাথের সঙ্গে। কিন্তু বিয়ের কয়েকদিন পর আকস্মিক দুর্ঘটনায় মারা যান নীলানাথ। এর পাঁচ বছর পর রথীন্দ্রনাথ বিলেত থেকে ফিরে এলে প্রতিমাদেবীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। গগনেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের উদ্যোগে রাজি হলেন প্রতিমাদেবী। প্রতিমাদেবীর নিজের মনের বাধা কাটতে সময় লেগেছিল। পারিবারিক বাধাও এসেছিল। প্রতিমাদেবীর আগের শ্বশুরবাড়ির লোকজন আপত্তি জানিয়েছিলেন। পরে যেকোনো ভোজসভায় প্রতিমাদেবীকে দেখলে তাঁরা সেখান থেকে উঠে চলে যেতেন। তবু প্রতিমাদেবীর নতুন জীবন শুরু হয়। পরবর্তীতে এ জীবনের পরিণতি কী হয়েছিল, সে আলোচনা এখন থাক। এই বিয়ে রবীন্দ্রনাথের কাছে বহুদিন আগে সাহানাদেবীর প্রতি করা অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত । এরপরেও রবীন্দ্রনাথ অমিতা ঠাকুরের মা লাবণ্যলেখার পুনর্বিবাহ দিয়েছিলেন প্রিয় শিষ্য অজিতকুমার চক্রবর্তীর সঙ্গে। গগনেন্দ্রনাথ নিজের বিধবা পুত্রবধূ মৃণালিনীর বিয়ে দিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু মেয়েটির আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি।
ঠাকুরপরিবার ধীরে ধীরে আবার ‘বিধবা বিবাহ’ নামের সামাজিক আলোটিকে গ্রহণ করতে শুরু করেছেন। খেয়াল রাখতে হবে এই প্রগতিশীল আচরণ সম্ভব হয়েছে ১৯০৫ সালের পর। ১৯০৫ সালে দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যু হয়েছিল।
সহায়ক বই
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
