অন্দরমহলে, চিকের আড়ালে আজ হারিয়েই গেছে বিনয়িনী আর সুনয়নীর প্রতিভা
সে ছিল এক আমল। পুরনো কলকাতার গায়ে তখন তারুণ্যের সুবাস। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির তখন খুব রমরমা। রবীন্দ্রনাথের প্রতিভার আলো তখন ছুঁয়ে যাচ্ছে বাঙালির মন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরবাড়ির আলো। সূর্যের মতো উজ্জ্বল। অথচ ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলেও মৃদু চাঁদের কিরণের মতো আলোময় হয়েছিলেন কয়েকজন। সম্মান বা প্রতিপত্তি তাঁদের সবার লক্ষ্য ছিল না। তাঁদের সৃষ্টিশীল সত্তা বিচিত্র সব সৃজনের মধ্যে আনন্দ খুঁজে নিত। অন্দরমহলে, চিকের আড়ালে অনেক প্রতিভা হয়তো হারিয়ে গেছে। আবার কয়েকজন নিজেদের প্রকাশের গুণে পরিচিত হয়েছেন বিদ্বান মহলে। আজ এমন দুই বোনের গল্প বলি। জোড়াসাঁকোর বৈঠকখানা বাড়ির দুই বোন — বিনয়িনী আর সুনয়নীর গল্প।
দুজনেই ছিলেন রূপে লক্ষ্মী, গুণে সরস্বতী। গুণেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর সৌদামিনীদেবীর দুই মেয়ে। বিনয়িনীর বিয়ের ঠিক হয়েছিল মহাধুমধাম করে। পাত্র শেষেন্দ্রভূষণ। অথচ তাঁর বিয়ের ঠিক আগেই মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন গুণেন্দ্রনাথ। আনন্দের জৌলুস হারিয়ে নিঝুম অভিমান বুকে নিয়ে বিয়ে হল বিনয়িনীর। এই বিনয়িনীর মেয়েই প্রতিমা দেবী। মায়ের বুকভরা অভিমান স্পর্শ করেছিল তাঁকে। পরে নিজের লেখায় গুণেন্দ্রনাথের আকস্মিক মৃত্যুর কথার উল্লেখ করেছিলেন তিনি। বিনয়িনীর বিয়ের পর প্রথমজীবন কেটেছে ঠাকুরবাড়ির অন্দরের আর পাঁচজন মেয়ে-বউয়ের মতোই। জপতপ, প্রসাধন, রান্নাঘর — এইসব নিয়ে। কিন্তু শিল্পী মেয়েটি ওই সাধারণ সাংসারিক নিত্যকর্মের মধ্যেই নিজের বিশিষ্টতার স্পর্শ রেখেছিলেন। সন্ধেবেলায় ঠাকুরবাড়ির মেয়ে বউয়েরা গা ধুয়ে সাজগোজ করে খোঁপা বাঁধতেন। সেই খোঁপায় ফুলের মালা জড়িয়ে দিতেন বাড়ির কোনো প্রবীণা। সেই খোঁপা বাঁধায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন বিনয়িনী। বেনেবাগান, মনভোলানো, ফাঁশজাল, কলকা ইত্যাদি খোঁপার কারিকুরিতে বিনয়িনীর জুড়ি মেলা ছিল ভার। খোঁপার নামগুলিও বেশ অন্যরকম। স্নিগ্ধমধুর ব্যক্তিত্বের অধিকারী বিনয়িনী আরো একটি কাজে মগ্ন হয়েছিলেন। আত্মজীবনী লেখার কাজে। তখন তাঁর পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স। জীবনের বেশিটা সময় কাটিয়ে এসেছেন। সারাজীবন নীরবে, আড়ালে থাকা একটি মেয়ের হঠাৎ আত্মজীবনী লিখতে ইচ্ছে হল। এইটিই পরম আশ্চর্যের। তখন অবশ্য রাসসুন্দরী, কেশবচন্দ্রের মা সারদাসুন্দরীর আত্মজীবনী সমাজে প্রকাশিত হয়ে গিয়েছে। রবি ঠাকুরের দিদি সৌদামিনী লিখে ফেলেছেন পিতৃস্মৃতি, স্বর্ণকুমারী দেবী লিখেছেন, ‘সেকেলে কথা’। বিনয়িনী দেবী একমনে লিখে চলেছেন তাঁর আত্মজীবনী — ‘কাহিনী’। কিন্তু এই আত্মজীবনী অপ্রকাশিত। বিনয়িনীর নির্মল অন্তর্মুখী স্বভাবের মতোই। অথচ অত্যন্ত সাবলীল ছিল তাঁর লেখা। সেই সময়ের এক জরুরি দলিল বলা যেতে পারে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের জীবনযাত্রা সম্পর্কেও নির্মেদ বর্ণনা রয়েছে এই অপ্রকাশিত আত্মজীবনীতে। বিনয়িনীর মনে মনে জীবন সংগ্রামের ক্লান্তি জমেছিল। অনেক লড়াইয়ের পর একটি মেয়ে নিজের কাছেই নিজের গল্প করতে বসেছিল আত্মজীবনী লেখার আড়ালে। কার্তিকের ভোর, শ্রীধর ঠাকুরের পুজো, সন্ধ্যা আরতি, রুপোর প্রদীপদানি, মহা সমারোহে পুজো সব স্মৃতি নস্টালজিক ভঙ্গিতে বিনয়িনীর শব্দের পাশে পাশে বসেছে। এক সহজিয়া সুর যেন শব্দগুলিকে মায়াবি করেছে। স্বামী চলে যাওয়ার তীব্র ব্যথাকে শব্দের টুকরো করে ছড়িয়ে দিয়েছেন। এ যেন বিনয়িনীর কষ্ট প্রকাশের এক অভিনব উপায়। বিনয়িনী লিখছেন, “আগেরদিন থেকে তাঁর অসুখ বেড়েছে। আমাকে কোথাও উঠে যেতে বারণ করলেন। পরদিন বিকেল ছটার সময় অকস্মাৎ তিনি চলে গেলেন। হাতে আমার হাত রেখে কি যেন বলে গেলেন সেটি আমি অনেক করেও বুঝতে পারলাম না। জীবনের সমস্ত সুখ এই সঙ্গে শেষ হল। — তখন আমার যে ধৈর্যগুণ এল, এখন মনে হলে আশ্চর্য হয়ে থাকি। মনে হল এই যে যাওয়া আসা এ তো কতগুলো তৃণগুচ্ছনদীর ঢেউয়ে কখনও একত্র হচ্ছে আবার সরে যাচ্ছে। এর জন্য এত কাতরতা হচ্ছে কেন?” সত্যিই মনে হয় দার্শনিকের কলম। পুরনো কথার এই যে চর্চা করেছিলেন বিনয়িনী, তা ঠাকুরবাড়িতে নতুন নয়। কিন্তু বিশ শতকের একটি মেয়ের এমন দিনলিপি ও স্মৃতিচারণ আজকের দিনে অমূল্য।
এইবার বলি সুনয়িনীর কথা। তিনি অবন ঠাকুর, গগন ঠাকুরের মতো ‘ছবি লিখতেন’। কোনো প্রথাগত শিক্ষা নয়। অন্তরের টানেই হঠাৎ একদিন আঁকতে শুরু করলেন। নেহাত সংসার আর ঠাকুরঘরের মধ্যেই দিন কাটছিল সুনয়িনীর। এর মধ্যেই হাতে তুলে নিলেন তুলি। অনেক হিন্দু দেববিগ্রহ মূর্ত হয়ে উঠল তাঁর তুলির স্পর্শে। অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই সহোদরাটিও চিত্রশিল্পী ছিলেন। আপন খেয়ালে, কিচ্ছু না ভেবে তুলি নিয়ে বসে পড়তেন সুনয়িনী। কারো অনুকরণ না করেই ছবি আঁকতেন সুনয়িনী। কোনো বিদেশি আর্ট ফর্ম নয়, সুনয়িনী নির্বাচন করেছিলেন বাংলার পটচিত্রের ধারা। পটুয়াদের মতো দিঘল টানা চোখ আঁকতেন সুনয়নী। যামিনী রায়েরও আগে এই টানা চোখ আঁকার কৃতিত্ব সুনয়িনীকে দিয়েছিলেন চিত্রা দেব, ‘ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল’ বইতে। লিখেছিলেন, ‘এ ধরনের চোখ আঁকার ব্যাপারে সুনয়িনী যামিনী রায়ের পূর্ববর্তিনী।’ সুনয়িনীও বিনয়িনীর মতো প্রচার নয়, আপন মনে, খেয়াল খুশিতে ছবি এঁকে যেতেন। সাবলীল স্বকীয়তা তাঁর আঁকার বৈশিষ্ট্য ছিল। দুই চিত্রকর দাদার উৎসাহ তো ছিলই। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সরকারি আর্ট কলেজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুনয়িনীর আঁকা দেখে মুগ্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘ও যে ধারার ছবি আঁকছে তার জন্য আমার আর সার্টিফিকেট লিখে দিতে হবে না। পরে দেশের লোকের কাছ থেকে ও নিজেই সার্টিফিকেট আদায় করে নেবে।’ স্বামী রজনীমোহনের উৎসাহও পেয়েছিলেন সুনয়িনী। বাড়তি সুবিধা ছিল সুনয়নী পরিবারসহ পিতৃগৃহেই থাকতেন । ফলে কাজের অবসর ও স্বাচ্ছন্দ্য ছিল। সুনয়িনীর আঁকা পাশ্চাত্যের প্রশংসাও কুড়িয়েছে। স্টেলা ক্রামরিশ সুনয়নীর ছবির আলোচনা করেন। এই আলোচনা পড়ে শ্রীমতী ককশীটার ১৯২৭ সালে লন্ডনের ‘উইমেনস আর্ট ক্লাব’ থেকে সুনয়নীর ছবি প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করেছিলেন। বিদেশিরা মুগ্ধ হয়েছিলেন সুনয়নীর আঁকা দিঘল চোখের গড়নে। পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত থেকেও প্রদর্শনীর ডাক এসেছিল। কিন্তু সুনয়নী প্রচার নয়, মনের প্রসার খুঁজতেন ছবি আঁকার মধ্যে। এমনই সহজ, সুন্দর ছিল সুনয়নীর কবিতাও। ছন্দে গেঁথে দিব্যি মনের ভাব প্রকাশ করতেন সুনয়নী—
“খেয়া তরীখানি বাহিয়া এখনি
আসিবে যে নেয়ে করিতে পার
বলিবে কে যাবি আয় ত্বরা করি
নাহি কোনো ভয় ভাবনা আর।”
সুনয়নী ছড়া ও ছবিতে বাংলার মেঠো পথের সুঘ্রাণ মিশিয়ে দিয়েছিলেন। রূপকথা, ব্রতকথা, পুরাণ , আলপনা, নকশিকাঁথার ভঙ্গি তাঁর শিল্পকে বিশিষ্ট ও স্নিগ্ধ করেছে।
অবন ঠাকুর ও গগন ঠাকুরের শিল্প যথেষ্ট জনপ্রিয়তা ও প্রচারের আলো পেয়েছে। কিন্তু ওই বাড়িরই দুটি বোন সারাজীবন ঘরকন্যার প্রতিটি দায়িত্ব এবং গভীর শোক সামলে শিল্পচর্চা করে গিয়েছেন। বিনয়নী ও সুনয়িনী এই দুই শিল্পী বোনের শিল্পচর্চাও প্রচারের আলোয় আসুক! অতীতের আড়াল সরে যাক, ঠাকুরবাড়ির এই দুই সরস্বতীর শিল্পকে ছুঁয়ে যাক অমরত্ব।
গ্রন্থঋণঃ
ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব