
২৮ বছর ধরে মেয়েদের বন্ধু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘স্বয়ম’
নারী-শ্রমিকরা কেমন আছেন তাঁদের কর্মক্ষেত্রে? যৌন হেনস্থা থেকে নিরাপত্তা পাচ্ছেন কি তাঁরা? কর্মক্ষেত্রে নারী-কর্মীদের যৌন হেনস্থা নিবারণের আইন (২০১৩) চালু হওয়ার দশ বছর পর এই প্রশ্ন জারি রেখেছে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা স্বয়ম (Swayam – Women’s rights and ending discrimination and violence against women and girls)। কলকাতার বুকে নারীদের আপন ভাগ্য জয় করার অধিকারের লড়াইয়ে ২৮ বছর ধরে মেয়েদের বন্ধু হয়ে পাশে আছে এই নারীবাদী সংগঠন। প্রতি বছর, লিঙ্গ-ভিত্তিক সহিংসতার বিরুদ্ধে ১৬ দিনের আন্তর্জাতিক সচেতনতা পালন করে তারা। এই বৈশ্বিক কর্মসূচি, ২৫ নভেম্বর (International Day for the Elimination of Violence against Women) শুরু হয়ে ১০ ডিসেম্বর (Human Rights Day) শেষ হয়। ১৬ দিন ব্যাপী বিভিন্ন আলোচনা-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নারী-সচেতনতা উদযাপন করছে স্বয়ম।

কর্মক্ষেত্রে নারী-কর্মীদের যৌন হেনস্থা নিবারণের আইন (২০১৩) চালু হয় দশ বছর আগে। আইনে বলা আছে, যে কোনও নারী-কর্মী— স্থায়ী, অস্থায়ী, ঠিকাকর্মী, শিক্ষানবিশ, এমনকি কর্মপ্রার্থীও— এই আইনের সুরক্ষা পাবেন। আইন বলছে, কোনও সংস্থায় দশ জনের বেশি কর্মী থাকলেই সেখানে যৌন হেনস্থা প্রতিরোধের অভ্যন্তরীণ কমিটি তৈরি করতে হবে। কিন্তু তা হয়েছে কি? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের যৌন হেনস্থা রোধের আইনের ১০ বছর উপলক্ষে ২৫ নভেম্বর কলকাতা প্রেস ক্লাবে একটি আলোচনাসভার আয়োজন করে ‘স্বয়ম’। সংস্থার অধিকর্তা অমৃতা দাশগুপ্ত-সহ আলোচনায় উপস্থিত ছিলেন সোমা সেনগুপ্ত, শীর্ষা গুপ্তদের মতো নারী আন্দোলনের কর্মীরা ও আইনজীবী দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়।
কর্মক্ষেত্রে নারী-কর্মীদের যৌন হেনস্থা নিবারণের আইন (২০১৩) চালু হয় দশ বছর আগে। আইনে বলা আছে, যে কোনও নারী-কর্মী— স্থায়ী, অস্থায়ী, ঠিকাকর্মী, শিক্ষানবিশ, এমনকি কর্মপ্রার্থীও— এই আইনের সুরক্ষা পাবেন। কিন্তু তা হয়েছে কি?

আলোচনায় উঠে আসে যে অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলা কর্মীরা জানেনই না যে এ রকম কোনও আইন রয়েছে। অনেক কর্মক্ষেত্রেই আইসিসি (ইন্টারনাল কমপ্লেন্টস কমিটি) নেই। ১৯৯৭ সালে মহিলা কর্মীদের যৌন হেনস্থা রোধে সুপ্রিম কোর্ট ‘বিশাখা গাইডলাইনস’ তৈরি করে। তার পরেও ‘পশ’ আইন পাশ হতে লেগে যায় আরও ১৬ বছর। শেষ পর্যন্ত ২০১৩-র ওই আইনে বলা হয়, যে কোনও ধরনের কর্মক্ষেত্রে আইসিসি রাখতেই হবে। যাঁর প্রধান হবেন অফিসের কোনও সিনিয়র আধিকারিক। তার কোথায় কী!

গত ১০ বছরের ১০০টি অভিযোগ নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ৯৬ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী কর্মীর চরিত্র হননেরই চেষ্টা হয়েছে। ৭০ শতাংশ অভিযোগের ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত উচ্চপদে কর্মরত। ৯০ দিনের মধ্যে অভিযোগের নিষ্পত্তি করতে বলা হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা হয়নি। সমীক্ষার ফল বলছে, ৮ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযুক্তের চাকরি গেছে। ৬ শতাংশ অভিযুক্তের ডিমোশন হয়েছে। ৪ শতাংশকে বদলি করা হয়েছে। আর ২২ শতাংশ ক্ষেত্রে অভিযোগকারী জানতেই পারেননি অভিযোগের ফলাফল। আইনজীবী দেবাশিষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ১০ বছরে আইনের যথাযথ প্রয়োগ যে হয়নি তার প্রমাণ, ২০০৯-এর একটি মামলায় সুপ্রিম কোর্টকে ফের নতুন করে নির্দেশ দিতে হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী স্মৃতি ইরানি লোকসভায় জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন এবং তার সদস্যদের নাম প্রকাশ্যে জানানো বাধ্যতামূলক। কোম্পানি (অ্যাকাউন্টস) রুলস ২০১৪ অনুযায়ী, প্রত্যেকটি সংস্থাকে বার্ষিক রিপোর্টে ‘বোর্ড অব ডিরেক্টরস’-কে জানাতে হবে যে, সেই সংস্থায় অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এমন সুস্পষ্ট আইন ও বিধি থাকা সত্ত্বেও কী করে বড়ো বড়ো বাণিজ্যিক সংস্থা বছরের পর বছর আইন ভাঙতে পারছে? এমন নয় যে, কর্মক্ষেত্রে যৌন হেনস্থার ঘটনা ঘটছে না। ক্রাইম ইন ইন্ডিয়া রিপোর্ট অনুসারে এই অপরাধের সংখ্যা ২০১৯ সালে ৫০৯, ২০২০-এ ৪৮৫, ২০২১-এ ৪১৮। মনে রাখা ভাল, নারী-কর্মীদের যৌন হয়রানির অতি সামান্য অংশই অভিযোগ হিসাবে দায়ের হয়।

পাশাপাশি দেখা চাই সরকারের ভূমিকা কী। আইনে বলা আছে, যে সব সংস্থায় ১০ জনের কম কর্মী থাকবেন, সেগুলিতে অভ্যন্তরীণ কমিটি তৈরি বাধ্যতামূলক না হলেও, সেগুলির নারী-কর্মীদের নিরাপত্তার জন্য প্রত্যেক জেলায় একটি স্থানীয় কমিটি থাকবে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের অধীনে গঠিত এই স্থানীয় কমিটির সভাপতি (চেয়ারপার্সন) হতে হবে মহিলা। অসংগঠিত ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলারা যাতে তাঁদের নিয়োগকর্তা (গৃহপরিচারিকার ক্ষেত্রে গৃহস্বামী), সহকর্মী, বা যে কোনও হেনস্থাকারীর থেকে সুরক্ষা পান, প্রতিকার পান, প্রধানত সেই জন্যই এই স্থানীয় কমিটিগুলি গঠনের কথা বলা হয়েছে আইনে। পশ্চিমবঙ্গে নারী ও শিশুকল্যাণ দফতর ২০১৫ সালে সব জেলাশাসককে চিঠি দিয়ে এই কমিটি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। দেখা যাচ্ছে, খাতায়-কলমে কমিটি তৈরি যদি বা হয়ে থাকে, তার কার্যকারিতার কোনও সাক্ষ্য মিলছে না। শ্রমিকরা জানেন না তাঁদের জেলার স্থানীয় কমিটি কোথায়, কী করে অভিযোগ জানাতে হবে।

কর্মসূচীর প্রথম দিনের এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ছাড়া, গত ৩০ নভেম্বর, কর্মসূচীর পঞ্চম দিনে কলকাতার শেক্সপিয়র সরণি’র কলাকুঞ্জে ‘সুরে সুরে : দক্ষিণ এশিয়ার নারী’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা শিল্পী রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, সমাজকর্মী, লোকসংগীত শিল্পী নবনীতা চৌধুরী এবং বাংলা ব্যান্ড উইথ দ্য ফোক। এই ১৬ দিন ধরে বাংলার বিভিন্ন গ্রামে গঞ্জে গিয়ে দেওয়াল লিখন, হ্যান্ডবিল বিলি, গান পরিবেশন করে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজ করে যাবে বলে জানিয়েছেন স্বয়মের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট ত্রিপর্ণা নন্দী। একুশ শতকের ২২ বছর কেটে গেলেও সমাজে আজও লিঙ্গ বৈষম্যের বিষবৃক্ষ যখন বিষফল ফলাচ্ছে তখন স্বয়ম আগামীর বীজকে দিচ্ছে লিঙ্গ সাম্য শিক্ষার সুরক্ষা কবচ। কারণ ভবিষ্যৎ পৃথিবীর চাবি যাদের হাতে থাকবে, তাদের মনকে করে তুলতে হবে নির্দ্বিধায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলার উপযুক্ত।
