ছবি আঁকতে আঁকতে গুলি খাওয়া শ্রমিকের দেহ আগলেছেন চিত্রশিল্পী চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য

কলেজপড়ুয়া চিত্তপ্রসাদ এলেন নন্দলাল বসুর কাছে আঁকা শিখতে

উস্কোখুস্কো চুল। ব্যাগে খাতা। কালি, পেন্সিল, কলম। চশমার কাচে ঢাকা পড়ে যায় ছুরির মতো ধারালো চোখদুটো। গ্রাম থেকে গ্রামে জিদ্দি পাগলের মতো ঘুরছেন। ছবি আঁকছেন। মানুষের ছবি। দু’মুঠোর জন্য, ঠাঠা রোদে ধুঁকতে থাকা মানুষ। এক ঘটি জল না পেয়ে শুকিয়ে মরে যাওয়া মানুষ। দাঙ্গাবিদ্ধস্ত অঞ্চলে, সাম্প্রদায়িক শক্তির উল্টোদিকে রুখে দাঁড়ানো মানুষ। ভরে উঠছে পাতার পর পাতা। মন্বন্তরের মহাফেজখানা এই স্কেচবুক। চিত্তপ্রসাদের ডায়েরি।

ভূতপূর্ব ডায়েরিটি বই আকারে প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৪৩ সালে। ‘হাংরি বেঙ্গল’ নামে। মেদিনীপুর জেলা ঘুরে, দুর্ভিক্ষের ছবি একপ্রকার ‘তুলে আনা’। প্রধানমন্ত্রী চার্চিলের সবচাইতে ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের জাজ্বল্যমান দলিল। প্রমাণ রাখতে দেয়নি ইংরেজ সরকার। কয়েকটি বাদ দিয়ে সব কপি পুড়িয়ে ফেলেছিল পুলিশ।

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের পেইন্টিং ১

উডকাট প্রিন্ট, লিনোকাটের হদিস খানিক পাওয়া যাবে ‘বেঙ্গল স্কুলে’র শিল্পীগোষ্ঠীদের কাজে। আর রয়েছেন চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্য। তাঁর ছবিতে গতানুগতিক লালিত্যা নেই। বলিষ্ঠ আঁচড়। প্রত্যেকটি প্রিন্ট যেন কাগজ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে। ছবিগুলো চিৎকার করে যেন। কিছু না কিছু বলতে চায়। চিত্তপ্রসাদ তো কোনো স্কুল কিংবা গোষ্ঠিতে পড়েন না। তিনিই স্বতন্ত্র শিল্পরীতির সূচনা করছেন উত্তাল বাংলায়। ফিনফিনে শহুরে বাবুদের এক্সিবিশন থেকে বেরিয়ে তাঁর ছবি প্রদর্শিত হচ্ছে মাঠে ঘাটে। ‘চাষাভুষো’ মানুষ ছবি দেখে রসালো মন্তব্য শানাচ্ছে। কখনও তেভাগা, কখনও বা নৌবিদ্রোহে, জনতার ভিড়েও কলম চলেছে শিল্পীর।

১৯৩২ সালে, চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যালিটি স্কুল থেকে পাশ করে, কলেজপড়ুয়া চিত্তপ্রসাদ এলেন নন্দলাল বসুর কাছে আঁকা শিখতে। ইতিমধ্যেই রপ্ত করে ফেলেছেন স্কেচ করার কায়দা, শিখে ফেলেছেন প্রাথমিক কলাকৌশল। তবুও একটা তকমা দরকার। ছবি না বেচলে জুটবে না ভাত। আর ছবি আঁকাকেই পেশা করে ফেলেছেন তিনি। প্রথমে কলকাতার আর্ট-কলেজ বাদ সাধলো। শেষ ভরসা দ্রোনাচার্য নন্দলাল। শোনা যায়, ছবি দেখে তিনি বলেছিলেন, ‘তোমার তো শেখা হয়ে গেছে- নতুন করে আর শিখবে কী?’ এ কথায় প্রশংসা অথবা তাচ্ছিল্য কোনটির মাত্রা কিঞ্চিৎ বেশি ছিল, জানা সম্ভব না। একলব্য, চিত্তপ্রসাদ সেই যে আর্টকলেজের চক্কর ছেড়ে বেরোলেন, আর ওধার মাড়াননি।

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের পেইন্টিং ২

চল্লিশের দশকে তাঁকে দেখা যাবে কলাবাগানের ছাত্র ফেডারেশনের আস্তানায়। তিনি তখন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য। বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের হাত ধরে আন্দোলনে জড়িয়ে পড়া। পার্টির নানা প্রচারপত্রে তাঁর আঁকা ছবি। মুখপত্র ‘জনযুদ্ধ’ অথবা People’s War-এ প্রকাশিত হচ্ছে অসংখ্য উড-কাট প্রিন্ট, কার্টুন, স্কেচ। ফ্যাসিবাদ বিরোধী নানা আলেখ্য উঠে আসছে ছবিতে। তেভাগার কৃষকরা লাঠি হাতে দাঁড়াচ্ছেন। আবার শোধনবাদী দলগুলোকে তুলধোনা করা চলছে ব্যঙ্গচিত্রের মাধ্যমে।

গ্রামে গ্রামে ঘুরছেন পার্টির কাজে। সঙ্গে তরুণ সোমনাথ হোর। হাতে-কলমে শেখাচ্ছেন সোমনাথকে। কখনও গুলি খাওয়া শ্রমিকের দেহ আগলাচ্ছেন শিল্পী। ১৯৪৬ সালে পার্টির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব পি-সি যোশী তাঁকে নিয়ে আসেন মুম্বাইয়ে। আন্ধেরির শ্রমিকপট্টিতে ভাঙাচোরা একটা ঘর। নিরলস চলতে থাকে কাজ।

চিত্তপ্রসাদ বিশ্বাস রেখেছিলেন আন্দোলনে। মার্ক্সবাদী দর্শনে। তাঁর সৃষ্টিও আসলে আন্দোলনমুখর, শ্রেণিরাজনীতির ভাষ্যে নির্মিত। কলম সেখানে হাতিয়ার। বুর্জোয়াদের উৎখাত করার অস্ত্র। সেই অস্ত্রকেই ধারণ করেছিল তৎকালীন কমিউনিস্ট পার্টি।

চিত্তপ্রসাদ ভট্টাচার্যের পেইন্টিং ৩ 

ইতিমধ্যে ঘটে গিয়েছে দেশভাগ। বহু চোখের জলের বিনিময়ে স্বাধীন ভারতবর্ষ। বদল ঘটেছে পার্টিতে। শিল্প ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে চরমপন্থী-সংকীর্ণ পার্টিলাইন, অভ্যন্তরীণ কচকচি-সংঘাতের সঙ্গে পা মেলাতে পারছিলেন না চিত্তপ্রসাদ। শিল্পীর স্বাধীন-সত্ত্বা একরৈখিক প্রচারকাজের বেড়াজালে হারাচ্ছে খেই। পচে যাচ্ছে মেহনতি মানুষের একমাত্র সংগঠন। বিশেষত নতুন সম্পাদক বি-টি-রণদিভের কার্যকলাপ, কর্মসূচি নির্ধারণ সম্পর্কে জমছিল প্রবল বিতৃষ্ণা। তাই ১৯৪৯ সালে পার্টি থেকে সরে এসেছেন। কিন্ত মার্ক্সবাদের প্রতি ভরসা হারাননি শেষ দিন অবধি…

ছবি বেচে খেতে পারেননি চিত্তপ্রসাদ। শোনা যায়, যা আয় হত প্রায় সবটাই বিলিয়ে দিতেন। ‘Defend Chittagong’ সিরিজের একটি ছবি বিক্রি হয়েছিল প্রায় দশ হাজার টাকায়। সবটুকুই রিলিফ ফান্ডে দিয়ে দিয়েছেন। পার্টি ছাড়ার পর প্রবল অর্থকষ্ট শুরু হল। এমনিতেই প্রথাগত গ্যালারির দরজা বন্ধ। তবুও পঞ্চাশের দশকে মহারাষ্ট্র ঘুরে ছবি এঁকেছেন। প্রদর্শিত হয়নি।

১৯৭৮ সালে রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠান থেকে একটি ‘প্রায় বেওয়ারিশ’ মৃতদেহ রওনা দিয়েছিল শ্মশানের উদ্দেশ্যে। শেষ যাত্রায় সঙ্গী হিসেবে দশজনও ছিল না। ইউনিসেফ তাঁর মৃত্যুর ক’বছর আগে একটি সিরিজ ‘Angels without Fairy Tales’ ছেপেছিল। ততদিনে…

ভ্যানগঘও তো তাঁর জীবদ্দশায় তেমন কদর পাননি। চিত্তপ্রসাদ পাবেন কেন?

তথ্যঋণঃ কৃষ্ণজিৎ সেনগুপ্ত- কার্টুন-পত্তর। শরীফ আতিক- উজ-জামান। Chittaprosad: A Retrospective (1915-1978) DAG
চিত্রঋণঃ Artheritagegallery.com এবং DAG 

Developed by DXDasia