
উনানের কত রকমফের, কত্ত কত্ত নাম
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত আটপৌরে যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-চর্যার শিকড়ে মিশে আছে ঘন হয়ে। আজ থাকল উনান বা উনুনের কথা।
‘আতপে উনায় যেন ননীর পুতল।’
কৃত্তিবাসী রামায়ণে বাংলার মানুষ বহুবছর আগে থেকেই এই বর্ণনা পড়ে আসছেন। এখানে উনায় মানে উনান। সংস্কৃত শব্দ ‘উষ্ণ’ থেকে ‘উনান’ কথাটি এসেছে। উষ্ণ> উহ্ন> উন্হ> উনহান> উনআন> উনান। কেতকাদাস ক্ষেমানন্দের মনসামঙ্গলের ‘লখিন্দরের প্রতি সর্পাঘাত’ অধ্যায়েও উনানের বর্ণনা রয়েছে—
আরও পড়ুন
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি: ঝুড়ি
‘বেহুলা রন্ধন করি উলাইল ভাত।
গা-তোল ভোজন কর ওহে প্রাণনাথ।।’
গ্ৰাম্য বা লোকভাষায় উনানকে আমরা আখা, চুল্লি, চুলা, চুল্লিকা নামে জানি। প্রবাদে রয়েছে- ‘চুলোর দোরে যাওয়া’– মানে যমের দ্বারে যাওয়া। রেগে গিয়ে মেয়েদের ‘চুলোমুখি’ বলা হয়। এখানে চুলোমুখি অর্থাৎ পোড়ামুখি। তিনটি ‘ঝিক’ বা মাথা-যুক্ত গোলাকার, ডিম্বাকার গর্ত বিশেষকেই আমরা উনান বলি। পৃথিবীতে সভ্যতার উষালগ্ন থেকে আদিম মানুষ যখন পুড়িয়ে খাওয়া শিখল, ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে উনানের জন্ম।
অতীতে তিনটে পাথর বা দুটি পাথর একত্র রেখে নিচে কাঠ-সহযোগে অগ্নি প্রজ্জ্বলন করা হত। এভাবেই উনান এসেছে। পরবর্তীকালে আদিম মানুষেরা নদীর তীরবর্তী জমিতে যখন বাস করতে শুরু করল তখন নদীর পলিমাটি দিয়ে উনান বানিয়েছিল। আর এইভাবে উনান বানানোর পরিকল্পনাটি কিন্তু এসেছিল মেয়েদের মস্তিষ্ক থেকেই। মায়েদের মস্তিষ্কপ্রসূত উনান বানোর এই পদ্ধতি এখনো পর্যন্ত বহমান রয়েছে। প্রাচীন উনান বানোর পদ্ধতি এখনও ভূস্বর্গ কাশ্মীর, গুজরাট, রাজস্থানে দৃশ্যমান। বাংলা তথা ভারতের প্রতিবেশী দেশ ও অঞ্চলে যেমন শ্রীলঙ্কা, নেপাল, চীন, ভুটান, তিব্বত ইত্যাদি জায়গায় বাংলার মতো উনান বানানো হয়।

উনানকে সাধারণত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে—
১. স্থায়ী উনান
২. অস্থায়ী উনান
১. স্থায়ী উনান: স্থায়ী উনান বলতে যা ঘন ঘন ভাঙা হয় না। একবার বানানো হলে এক-দু’বছর পর ভাঙা হয় বা কিছু পরিবর্তন করা হয়। একে আবার দু’ভাগে ভাগ করা হয়ে থাকে। যথা-ক. সাংসারিক ও খ. কুটিরশিল্পের জন্য নির্মিত।
আরও পড়ুন
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি: যাঁতি ও উদূখোল
ক. সাংসারিক উনান: মূলত বাড়ির হেঁশেলঘর থেকে অন্যান্য নানা ঘর পর্যন্ত এ উনানের বিচরণ। যেমন- ধানসেদ্ধের উনান, ভাতের, খোলা (মুড়ি, চিড়ে, খই), রুটির (রুমালি, তন্দুরি) ইত্যাদি।
খ. কুটির শিল্পের উনান: সাধারণত ব্যবসায়িক সংযোগের কারণে এই জাতীয় উনান বানানো হয়। এখানে বলে নেওয়া ভালো যে কুটির শিল্পের উনানকে আবার চারভাগে ভাগ করা হয়– ভাঁটি, ভিয়েন, শাল ও বেকারি। বাতাসা, মিষ্টান্নের উনান হল ভিয়েনের উদাহরণ। ধোপা, চুনের, দেশিমদের, পুয়ান হল ভাঁটি উনানের উদাহরণ। শাল উনান হল লোহা গলানো, পিতল-কাঁসা, সোনা, ঢালাই ও আখশাল, খেজুরশাল ইত্যাদি। বেকারি উনান কেক, পাঁউরুটি ইত্যাদি বানানোর জন্য ব্যবহৃত হয়।
২. অস্থায়ী উনান: যে উনানের কোনো স্থায়ী রূপ হয় না। কখনো দু-তিন ঘণ্টার জন্য, আবার কখনো এক-দুদিনের, কখনও আবার একসপ্তাহের জন্য তৈরি হওয়া উনানই হল অস্থায়ী উনান। যেমন- দুধ গরমের উনান, যজ্ঞিবাড়ির উনান, স্বল্পখাবারের, মেলার, নিত্য হোমের, খাবার বিক্রেতার উনান ইত্যাদি।
বানানোর কৌশল অনুযায়ী আবার ভিন্ন ভিন্ন নাম রয়েছে। যথা- কামারশালার উনান, নৌকায় ব্যবহৃত উনান, কুমোরদের পনঘর, ধানসেদ্ধ’র উনান, রাভা জনজাতিদের বানানো উনান, দুতলা, একপাখা, দুপাখা, তিনপাখা, চারপাখা (পাখা মানে উনানের মুখ), ডোকড়াদের বানানো উনান, ধোঁয়াহীন উনান (এই পদ্ধতিতে নেপাল ও জাপানে উনান বানানো হয়), তোলা উনান, শেষ অন্তিম বা মরা পোড়ানোর উনান ইত্যাদি।
১৮৯২ রচিত কবিরাজ উপেন্দ্রনাথ সেন ও দেবেন্দ্রনাথ সেন রচিত ‘আর্য়ুর্বেদ-সংগ্ৰহ’ গ্ৰন্থে নানা প্রকার উনানের বিবরণ পাওয়া যায়। উনান যেখানে থাকে সেই ঘরকে চুলাঘর বা উনানঘর বলে। মৃৎশিল্পী, বিশেষত কুমোররা একধরনের উনান বানান, তাকে ‘পুয়ান ভাঁটি’ বলা হয়। এই ধরনের উনান পশ্চিম মেদিনীপুরের মির্জাবাজারের দেওয়ালি পুতুল-শিল্পীরা বানান। এছাড়া শান্তিপুরেও তৈরি হয়। ব্যবহারের পাশাপাশি বাঙালির উনানকে কেন্দ্র করে ‘উনানপুজো’ ও ‘অরন্ধন উৎসব’ প্রচলিত রয়েছে। এই উৎসব শীতলষষ্ঠী ও ভাদ্র সংক্রান্তিতে দেখা যায়। ‘সারা বছর রান্না হয় যেটার মধ্যে, সেটারও তো রেষ্ট বলে একটা ব্যাপার থাকা চাই নাকি!’– বলেছিল আমাদের হুগলি বলাগড়ের কার্তিক কাকা। কথাটা খুব প্র্যাকটিকাল হলেও, এই ধারণার থেকেও যে একটা পুজো জন্ম নিতে পারে, সেটা অবাক করেছিল সেবার আলপনার খোঁজে গিয়ে। হয়তো এর মূলে রয়েছে পুরাকথার নানা দিক। আসলে প্রয়োজনীয়তা থেকেও মানুষ অনেক সংস্কৃতি তৈরি করেছিল।
কথিত আছে, শ্রীরামকৃষ্ণদেব উনানঘরেই জন্মেছিলেন। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত উনুনের এক মহৎ সংযোগ রয়েছে। উনান বানানোর উৎসে পৌঁছালে দেখব, এর বানানোর কৌশলে নারীর ভূমিকা রয়েছে। সিন্ধু সভ্যতায় উনান ও ভাঁটির সন্ধান পাওয়া গেছে। ভাঁটি যেখানে অজস্র সরা, মৃৎপাত্র পোড়ানোর ব্যবস্থা থাকত। কাজেই উনান বানানোর মধ্য দিয়ে সেই পদ্ধতি আমাদের মায়েদের অবচেতনে রয়ে গেছে। যা আমরা বয়ে চলেছি এখনো।
গ্ৰন্থঋণ:
কৃত্তিবাসী রামায়ণ, কেতকাদাস ক্ষেমানন্দ, মনসার ভাসান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, বাঙ্গালা ভাষার অভিধান; কৌশিকী, সম্পাদনা তারাপদ সাঁতরা।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: অশোককুমার কুণ্ডু এবং আমাদের প্রকৃতি।
ছবি লেখকের সংগ্রহ করা।
