
২৮তম যাত্রা উৎসব চলবে এক মাসেরও বেশি
ষোড়শ শতকের প্রথম ভাগ। অভিনীত হচ্ছে ‘কৃষ্ণ কীর্ত্তন’ পালা। নবদ্বীপের চন্দ্রশেখর অঙ্গন তখন জমজমাট। কলাকুশলীরা উজাড় করে দিচ্ছেন নিজেদের। মুগ্ধ দর্শক প্রতিটি মুহূর্তে যেন লীন হয়ে যাচ্ছেন কৃষ্ণ মহিমায়। শ্রীরাধিকা ও রুক্মিণী বিভিন্ন দৃশ্যপট আবিষ্ট করে দিচ্ছে যাত্রামোদীদের। জানেন কি, নবদ্বীপের এই পালায় তখন অভিনয় করছেন স্বয়ং চৈতন্য মহাপ্রভু!

বাংলার যাত্রাপালার ইতিহাস এমনই প্রাচীন ও সমৃদ্ধ। সেই চৈতন্যদেব থেকে আজকের তরুণ অভিনেতা — ৫০০ বছরের বেশি এই পরিক্রমায় কত অভিনেতা, শিল্পী ও কুশীলব যাত্রাপালাকে নিয়ে গিয়েছেন অনন্য উচ্চতায়। তাই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের ২৮তম যাত্রা উৎসব স্মরণ করছে বাংলার জয়-যাত্রাকে। ২৪ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে এক মাসেরও বেশি।
আরও পড়ুন: যাত্রার সেকাল-একাল
প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে অনেক কিছুই। পুরোনোর জায়গা নিচ্ছেন নতুন। তাতে আমাদের সংস্কৃতির বিভিন্ন উপাদানে জমছে মলিন ধুলো। তাকে সরিয়ে আবার নিজের মহিমায় গণপরিসরে হাজির করার উদ্যোগ নিয়েছে রাজ্য সরকার। এই পুনরুদ্ধার পর্বে আবার আলো পড়েছে যাত্রার মঞ্চে। এর অংশ হিসেবে তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের উদ্যোগে চলছে যাত্রা উৎসব। এই উৎসব চলছে আড়াই দশকের বেশি সময় ধরে। তবে যাত্রার কলাকুশলীরা উৎসবের ২৮তম সংস্করণে হাজির হলেন বঙ্গসংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র রবীন্দ্র সদনে। এর আগে বারাসতের কাছারি ময়দান ও বাগবাজারের ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ মঞ্চ-এ হয়েছে যাত্রা উৎসব। এবার তার সঙ্গে জুড়েছে রবীন্দ্র সদন ও একতারা মুক্তমঞ্চ।

২৪ নভেম্বর শুক্রবার রাজ্যের মন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গ যাত্রা একাডেমির সভাপতি অরূপ বিশ্বাস, মন্ত্রী ও একাডেমির সহ সভাপতি ইন্দ্রনীল সেন এবং মন্ত্রী স্বপন দেবনাথের উপস্থিতিতে যাত্রা উৎসবের উদ্বোধন হয়। কীভাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে যাত্রা শিল্পের মরা গাঙে গতি এসেছে, তা ব্যাখ্যা করেন মন্ত্রীরা। দেওয়া হয় শান্তিগোপাল তপনকুমার পুরস্কার।
২০১৩ সালে বাগবাজারের পাশাপাশি বারাসাতের কাছারি ময়দানে উৎসব শুরু হয়। কেন্দ্রীয় এই উৎসব ছাড়া জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত হয় যাত্রা উৎসব। তাতে অংশ নেয় জেলার যাত্রা দলগুলি। যাত্রা উৎসবের জন্য তৈরি হয় থিম সং। যা পরিবেশন করেন যাত্রার শিল্পীরাই।
রবীন্দ্র সদনের অঙ্গনে উৎসব তিনদিনের হলেও বাগবাজারের মঞ্চে উৎসব চলবে এক মাস, ২৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ৩২ দিনে ৩৪টি যাত্রাপালার অভিনয় হবে। গত শুক্রবার রবীন্দ্র সদনে অভিনীত হয় জোড়াদীঘির চৌধুরী বাড়ি, অনল চক্রবর্তী নির্দেশিত এবং কাকলি চৌধুরী অভিনীত পালাটি মঞ্চস্থ করে দ্য নিউ অগ্রগামী যাত্রা কোম্পানি।

যাত্রার ইতিহাস কবে শুরু, সেটা নির্দিষ্ট করে বলা মুশকিল। শ্রীচৈতন্য যেমন অভিনয় করতেন, তেমনই পাওয়া যায় শ্রীবাস, গদাধর, অদ্বৈত আচার্যের নাম। বাংলার অন্যতম প্রাচীন ও জনপ্রিয় লোকশিল্প হিসেবে যাত্রা আজও টিকে আছে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে। সিঙ্গল স্ক্রিন সিনেমা থেকে আজকের ওটিটি, বিনোদনের নানা উপকরণ চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। তবু গ্রাম বাংলার হৃদয়ে রয়ে গিয়েছে যাত্রা প্রেমের পরম্পরা। ইতিহাসের এই যাত্রাকে তুলে ধরা হয়েছে ছবি ও লেখায়। যাত্রার ৫০০ বছরের ইতিহাস সংক্রান্ত প্রদর্শনী টানছে দর্শকদের।
প্রদর্শনীর পাশেই মঞ্চ, তার সামনের খোলা মাঠে যাত্রা বিষয়ক আলোচনায় মগ্ন নানা বয়সের মানুষেরা। হঠাৎ কেউ নন্দন চত্বরে উপস্থিত হলে চমকে গিয়েছেন। নানা সজ্জা, অলঙ্করণ, লেখনীতে এই চত্বর হয়ে উঠেছিল যাত্রানগরী। নাগরিক কোলাহলের মধ্যে যাত্রা কখনও এমন সদর্পে উপস্থিত হয়েছে বলে মনে পড়ে না! অনেকের মতো এমনটাই বললেন শ্যামনগরের বিশাখা দত্ত, উত্তরপাড়ার মনোতোষ বিশ্বাসরা। তাঁদের বক্তব্য, ইতিহাসের প্রদর্শনী, আলোচনার পাশাপাশি এই সময়ের পালা দেখার সুযোগ মিলছে, এটাই বড়ো প্রাপ্তির। শনিবার সন্ধ্যায় অভিনয় দেখতে কানায় কানায় ভরে উঠেছিল রবীন্দ্র সদন।

উৎসবের সূচনার দিনই তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের মন্ত্ৰী ইন্দ্রনীল সেন বলেছেন, “বাংলার সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র রবীন্দ্র সদন। সেখানে যাত্রা উৎসব আয়োজিত হচ্ছে। এটা খুবই সম্মানের। এ জন্য ধন্যবাদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে।”
যাত্রা উৎসব ঘিরে এবারের বিপুল আয়োজন মন্ত্রীর এই আবেগকে সত্যি প্রমাণ করেছে। রামরাজাতলা থেকে নন্দনে এসেছিলেন সোমা বসাক, নন্দিতা মিত্র। তাঁরা বলেন, “আমরা নিয়মিত এখানে আসি। আজ এসে দেখছি, পুরো চত্বর সুন্দরভাবে সাজানো হয়েছে। শহরের মানুষ যাত্রার কথা ভুলে গিয়েছে। তাই এই উদ্যোগ প্রশংসনীয়।”

অতীতে যাত্রা উৎসব শুধু অনুষ্ঠিত হত ফণীভূষণ বিদ্যাবিনোদ মঞ্চে। যাত্রার প্রসারের লক্ষ্যে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্যোগে ২০১৩ সালে বাগবাজারের পাশাপাশি বারাসাতের কাছারি ময়দানে উৎসব শুরু হয়। কেন্দ্রীয় এই উৎসব ছাড়া জেলায় জেলায় অনুষ্ঠিত হয় যাত্রা উৎসব। তাতে অংশ নেয় জেলার যাত্রা দলগুলি। যাত্রা উৎসবের জন্য তৈরি হয় থিম সং। যা পরিবেশন করেন যাত্রার শিল্পীরাই। শহরের মানুষের কাছে লোকসংস্কৃতির এই ধারা পৌঁছে দেওয়ার জন্য অনুষ্ঠিত হয় পাড়ায় পাড়ায় যাত্রা।

ফেলে আসা সময়ের হাত ধরেই এগিয়ে চলে ভাবীকাল। এবারের যাত্রা উৎসব ফণীভূষণ মুখোপাধ্যায় থেকে শান্তিগোপাল, উৎপল দত্ত থেকে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়, চপল ভাদুড়ি থেকে ভৈরব গঙ্গোপাধ্যায়, এমন কত শিল্পীকে স্মরণ করে যেন নতুনকে এগিয়ে চলার উৎসাহ দিল।
থাকুক না টেলিভিশনের বিনোদন, মুঠোফোনের সব পেয়েছির জগৎ, আন্তরিক উপস্থাপনা ও হৃদয়ভেদী সংলাপে বাংলার অন্যতম প্রাচীন লোকসংস্কৃতি তার জয়যাত্রায় এগিয়ে যাবে, এই বার্তাই দিতে চাইছে এবারের উৎসব।
_____
ছবি: সুমন সাধু ও পায়েল সামন্ত
