
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭৯তম পর্ব
জেল সেপাইরা কিন্তু বাইরের পুলিশের মতো নয়। তবে পরনে বাইরের পুলিশের মতোই খাকি ড্রেস। জেল সেপাইদের উর্দ্ধতম দায়িত্বের পদাধিকারীদের ডাকা হয় জমাদার বলে। আর আছে জেলমেট ও পাহারাদার বলে পরিচিত একদল কর্মী। এরা কিন্তু সরাসরি কর্মচারী নয়। মেটরা হল দীর্ঘমেয়াদি সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের থেকে বাছাই করা কর্মী। প্রত্যেকটি ওয়ার্ডের দেখভাল এদের দায়িত্ব। খদ্দরের সাদা হাফ প্যান্ট ও জামা পরা মেটদের কোমরে থাকে চামড়ার বেল্ট। বেল্টে পেতলের চৌকো চাকতিতে জেলের নাম খোদাই করা। আর পাহারাদাররা হল স্বল্প মেয়াদের সাজাপ্রাপ্তদের থেকে বাছাই করা বন্দি কর্মী। তাদের ডিউটি হল মেটের আদেশ পালন করা, সাধারণ বন্দিদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া, যেদিন বাইরের লোকেদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ (ইন্টারভিউ) করতে দেওয়া হয়, সেদিন তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসা। এদেরও খদ্দরের হাফ প্যান্ট ও ফতুয়ার মতো জামাই ‘জেল ড্রেস’। ওই মেট ও পাহারাদাররা দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাই রাতে ওয়ার্ড যখন জেল সেপাইরা বন্ধ করে, তখন এরাও বিচারাধীন বন্দিদের সাথে ওয়ার্ডের ভেতরে থাকে।
(গত পর্বের পর)
আমাদের যেখানে ঢোকানো হল, তার নাম আমদানি ওয়ার্ড। অন্যান্য ওয়ার্ডগুলো এক নম্বর, দুই নম্বর – এভাবে চিহ্নিত। কিন্তু আমদানি ওয়ার্ডের কোনো নম্বর নেই। যেই বন্দিরা প্রথম জেলে ঢোকে, তাদের প্রথমে ওই ওয়ার্ডে এনে পুরে দেওয়া হয়, তাই এমন নাম।
বিশাল ওয়ার্ড। প্রত্যেকটা ওয়ার্ড আবার মাঝখানে লোহার গ্রিল দিয়ে ভাগ করা। আছে একটি পায়খানা ও প্রস্রাব করার জায়গা। একটি চৌবাচ্চা। আমাদের দু’জনকে সে রাতে মেটের আদেশে শোয়ার জায়গা দেওয়া হল ওই পায়খানার পাশে। কম্বল চাদর পেতে দুর্গন্ধ সহ্য করে রাতটা আমাদের ওখানেই কাটাতে হল। সেই ওয়ার্ডে তখন কম করে তিরিশ-চল্লিশ জন আমাদের মতো নতুন ‘আসামি’। তার মধ্যে অনেকে এই ওয়ার্ডের পুরোনো বাসিন্দা। তবে এক সপ্তাহের বেশি নতুন কাউকে এই ওয়ার্ডে থাকতে হয় না। পরের দিন থেকে এদের একে একে বড়োকর্তাদের নির্দেশনামা অনুযায়ী বিভিন্ন ওয়ার্ডে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
ভোরে ওয়ার্ডের গেট খোলা ও গুনতির পর আমাদের ওপর মেটের আদেশ হল বাইরের কল থেকে বালতি করে জল এনে পায়খানার পাশের চৌবাচ্চা ভর্তি করা। কাউকে কাউকে পাঠানো হল ওয়ার্ডের সামনে উঠোনের ঘাস তোলার জন্য। আমরা বিচারাধীন বন্দি। বিচার শেষ হওয়ার আগে আমাদের দিয়ে কোনো কাজ করানো নিষিদ্ধ। তবু কেন আমাদের এ কাজ করতে হল পরে বলছি।
আরও পড়ুন: জেলে ‘গোলমাল’ বাঁধাতে চেষ্টা করলাম আমরা
সকাল ছ’টার সময় ওয়ার্ডের প্রথম গ্রিলের দরজা খুলে দেয় পাহারায় থাকা জেল সেপাই। বন্দি আসামিদের হাঁটু মুড়ে বসে থাকতে হয়। একজন জমাদার সেপাই এক, দো, তিন করে আমাদের গুনতি করেন। জেল সেপাইয়ের কাছে নোট থাকে, গতকাল রাত্রে ডিউটিতে যোগদানের সময় কতজন বন্দিকে তিনি গুনে নিয়েছিলেন, তার হিসেব মিলিয়ে নেন। এইভাবে সব ওয়ার্ডের গুনতি শেষ না হওয়া পর্যন্ত আসামিদের একইভাবে বসে থাকতে হয়। গুনে যদি গত রাতে যত বন্দি ছিল, তার সঙ্গে আজ সকালে গুনতি করা বন্দির সংখ্যা এক হয়, তাহলে ঘণ্টা বাজে। আমরা উঠে দাঁড়াতে পারি। সকাল ৯টা পর্যন্ত আমরা ওয়ার্ডের বাইরে থাকতে পারি।
(চলবে…)

