
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৭০তম পর্ব
আমি বলতে থাকি, “দেখুন, আমাদের রাজনীতি ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি নয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকে আছে, ব্যক্তিহত্যা তাদের বিপ্লবী কাজকর্মের প্রধান হাতিয়ার। হয়তো আপনাদের কোনো স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুরা আমাদের বন্ধুদের হাতে নিহত হয়েছেন। সুতরাং আপনাদের আমাদের প্রতি, নকশালদের প্রতি রাগ থাকা স্বাভাবিক। আপনারা রাগ মেটাতে যা খুশি তা বলে আরও গাল পাড়তে পারেন। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখুন, আমরা যে বিপ্লবী রাজনীতি করি, তা ব্যক্তিহত্যাকে সমর্থন করে না। জোতদার, জমিদার, বড়োলোকদের সমাজটাকে বদলে দিয়ে শ্রমিক কৃষক গরিবের রাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। আমাদের সেই স্বপ্নকে পূরণ করতে গেলে রাষ্ট্র বা সরকারের সাথে লড়াই বাঁধবেই। সেই লড়াইয়ে দু’পক্ষরই কেউ না কেউ মারা যেতেই পারেন। এই রক্তপাত অনিবার্য। কিন্তু, এই যে আপনারা পুলিশে কাজ করেন, আমাদের ধরতে আপনাদের কে পাঠিয়েছে? না, সরকার। আমরা যদি সংখ্যায় অনেক থাকতাম, আমাদের হাতে যদি আপনাদের মতো লাঠি বন্দুক থাকত, তবে আপনাদের সাথে লড়াই বেঁধে যেতই। সে লড়াইয়ে আমাদের অনেকে যেমন মারা যেতে পারত, তেমনি মারা পড়তে পারতেন আপনাদেরও কেউ কেউ। প্রত্যেক লড়াইয়ে এটা ঘটে থাকে। আপনারা যখন উর্দি পড়ে রাইফেল বা বন্দুক হাতে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন দু’পক্ষই দু’পক্ষের কাছে শত্রু। কিন্তু আপনাদের কেউ যদি ছুটিতে দেশের বাড়িতে বা কোনো আত্মীয়ের বাড়ি যান, তখন তো আপনারা আর পুলিশ থাকেন না। আপনি বা আপনারা পুলিশে কাজ করেন বলেই তখন নিরস্ত্র আপনাদের কাউকে যদি আমাদের কেউ হত্যা করে বসে, আমাদের বিপ্লবী রাজনীতিতে তার সমর্থন মেলা ভার…”।
(গত পর্বের পর)
আমি যখন একথাগুলো ওনাদের বুঝিয়ে বলছি, তখন পুলিশদের মধ্যেকার দু’একজন কিছু বলার জন্য নিশপিশ করলেও অধিকাংশই নিশ্চুপ হয়ে শুনছিলেন। এমন সময় অফিসার বাড়ির ভেতর থেকে আমাদের সামনে এসে হাজির হলেন। তিনি বোধহয় আমাদের ব্যাগপত্র, ডায়রি, বই ইত্যাদিতে চোখ বুলিয়ে এসেছেন। বললেন, “লেখাপড়া শিখে এই মানুষমারা রাজনীতিতে আপনারা কী যে পান, আমার একটু জানতে বুঝতে ইচ্ছে করে”। আমি তাঁর কথার জবাব দিতে যাচ্ছিলাম, তখন বাড়ির মালিক সেই মাস্টারমশাই তথা গ্রামপ্রধান ওখানে এলেন। আমাদের দু’জন আর ওই বিশাল পুলিশ বাহিনীর থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত তাঁকেই করতে হবে। তাঁর কপালে চিন্তার ভাঁজ। অফিসারকে আড়ালে ডেকে নিয়ে পরামর্শে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় আমার আর জবাবি ভাষণ দেওয়া হল না।
আরও পড়ুন
পুলিশরা ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিলেন আমাদের ওপর
এর মধ্যে দু’একবার ওই বাড়ির দু’টো ছেলেমেয়ে আমাদের উঁকি মেরে দেখছিল। একজন বয়স্কা মহিলাকেও দেখতে পেলাম। পরে বুঝেছিলাম, তারা গ্রামপ্রধানের ছেলে, মেয়ে এবং স্ত্রী। পরিবারের সবাইকে দোতলায় পাঠিয়ে দিয়ে ভেতরের একটা ঘরে পুলিশ-সহ আমাদের সবার থাকার বন্দোবস্ত হল। গ্রামপ্রধান স্বয়ং এবং দু’জন পুলিশ হাত লাগিয়ে ভাত, আলু আর ডিম সেদ্ধ রেঁধে ফেলল আমাদের রাতের ভোজের জন্য। ওপর থেকে লেপ নামানো হল গায়ে দেবার প্রয়োজন মেটাতে।
খাওয়া-দাওয়া হলে আমি অফিসারকে বললাম, “এতদিন আমরা রাতে কেউ ঘুমাতাম, কেউ রাত জেগে পাহারা দিতাম পুলিশের আক্রমণ এড়াতে। আজ সেই পুলিশের পাহারায় আমরা লেপ গায়ে দিয়ে ঘুমোব, ভাবতেই অবাক লাগছে”। অফিসার মধ্যবয়স্ক মানুষ, মুখে সব সময় হাসি যেন লেপ্টে আছে। এরকম লোকও পুলিশে কাজ করে তাহলে!
অফিসার বললেল, “নিন নিন ঘুমিয়ে নিন”। সকালেই আবার গোসাবা রওনা দিতে হবে। ফেরিঘাট অনেকটা দূর এখান থেকে। আসার সময় অতটা পথ হাঁটতে গিয়ে নতুন পুলিশি বুটে তাঁর পায়ের চামড়া কী রকম ছড়ে গেছে আমাদের দেখালেন। আমরা লেপ দিয়ে মুখ ঢেকে তারপর নিজেদের ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।
পরের দিন আমাদের দু’জনের হাতে হাতকড়া ও কোমরে দড়ির বাঁধন দিয়ে পুলিশ বাহিনী রওনা দেবার জন্য প্রস্তুত হল।
সেই মুহূর্তে দু’জন গ্রামীণ বয়স্কা বিধবা মহিলা গ্রামপ্রধানকে হাত ধরে অনুরোধ করল, “ও অসিত, ওরা তো আমাদের ঘরের ছেলেরই মতো, পুলিশদের বল না ওদের ছেড়ে দিতে”। এই প্রথম আমরা মাস্টারমশাই তথা গ্রামপ্রধানের নাম জানলাম – অসিত মৃধা। বয়স্কাদের অনুরোধ শুনে কেমন যেন হয়ে গেলেন ভদ্রলোক। রাস্তার ওপর লাইন করে দাঁড়ানো পুলিশদের দিকে চোখ বুলিয়ে তিনি বললেন, “আমার তো এদের ছেড়ে দেওয়ার কোনো মান্যতা নেই। এরা এখন পুলিশের অধীন। আর আমাদের এখানকার রাজনীতির সব কিছুই তো তোমরা জানো”। বলেই আমাদের দিকে এগিয়ে এলেন। তাঁর চোখের কোণ জলে যেন ঝাপসা হয়ে এসেছে।
তিনি দু’হাত আমাদের দু’জনের কাঁধে রেখে বললেন, “ভবিষ্যতে যদি কোনোদিন এদিকে আসেন, আমার সঙ্গে নিশ্চয়ই দেখা করবেন”। পেছন দিকে তাকিয়ে দেখলাম, মাস্টারমশাইয়ের মূল বাড়ির দরজায় তাঁর স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা আত্মীয়দের বিদায় দেবার মতো করে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। পুলিশ অফিসার বললেন, “চলুন, অনেকটা পথ হাঁটতে হবে, তার উপর নৌকো কখন মিলবে তা-ই বা কে জানে!”
(চলবে…)
ছবি – প্রতীকী
ছবিসূত্র – cpiml.org
