
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৯তম পর্ব
এখনো জনতার থেকে অনবরত অনুরোধ আসছে বক্তব্য রাখার, কবিতা শোনাবার। আমিও রাজনৈতিক প্রচারের এ সুযোগকে কাজে লাগাতে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুকান্ত – যার যত কবিতা মুখস্ত ছিল, একে একে আবৃত্তি করে গেলাম। সব বলতে বলতে যখন থামার ক্লান্তি অনুভব করলাম, ধুতি ও গেঞ্জি পরা একজন মধ্যবয়স্ক লোক আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “জল খাবেন একটু?” আমি তাঁর পরিচয় জানতে চাইলে চারপাশের লোকজন বলে উঠল, “উনি আমাদের গ্রামপ্রধান গো”। সামনের ওই মাটির দোতলা বাড়িটা তো ওনারই। জানলাম, উনি স্কুল মাস্টার। আবার ওই দোতলা বাড়ির বাইরের দিকে একচালা মাটির বারান্দায় একটা বিশাল তালাবন্ধ কাঠের বাক্স সম্বল পোস্ট আপিসের তিনি পোস্ট মাস্টারও।
(গত পর্বের পর)
চৌকিদার বা ওই মাতব্বরদের কেউ ধারে কাছে ছিল না। কয়েকজন লোক বললেন, “মাস্টারমশাই, এনাদের নিয়ে আপনার ওই বারান্দায় ছায়ার মধ্যে বসাব?”
মাস্টারমশাইকে “হ্যাঁ” বা “না” বলার কোনো অবকাশ না দিয়ে ওই লোকেরাই আমাদের দড়ি খুলে মাস্টারমশাইয়ের বারান্দায় এনে তুললেন। মেরুদণ্ডটা টনটন করছিল। পোস্ট অফিসের কাঠের বাক্সের ওপর আমরা দু’জনেই এবার টানটান হয়ে শুয়ে পড়লাম।
দুপুরের খাওয়াদাওয়ার বন্দোবস্ত ওই মাস্টারমশাই-ই করে দিলেন। কিছু লোক আমাদের পাহারায় থাকল বদলাবদলি করে। সন্ধে প্রায় সাড়ে সাতটায় একজন পুলিশ অফিসার-সহ আঠারো জন লাঠি ও রাইফেলধারী পুলিশ এসে হাজির হল। সকালের ভিড়টা পুলিশ আসার সঙ্গে সঙ্গে আবার বাড়িটাকে ঘিরে ফেলল। তবে পুলিশের ধমক খেয়ে আস্তে আস্তে হাল্কা হয়ে গেলেন তারা।
পুলিশ অফিসার আমাদের ওপর একবার চোখ বুলিয়ে মাস্টারমশায়ের সাথে ওই বাড়ির ভেতর ঢুকে গেলেন। পুলিশদের কেউ কেউ আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইছিল। আর কয়েকজন তো যা খুশি তা গালাগাল করে তাদের রাগ মেটাতে লাগল। তাদের ক্ষোভ কমে এলে এই প্রথম হরিপদ কথা বলল, “আপনারা নিজেদের বাড়িতে, পাড়াপ্রতিবেশীদের মধ্যেও কি এভাবে গালিগালাজ করে কথা বলেন?” দু’চারজন পুলিশ হরিপদকে মারতে যায় আরকি! হাল ধরি আমি। বলি, “না না, আপনারা আমাদের গাল দিয়ে অন্যায় কিছু করেননি”। আমার মুখে একথা শুনে পুলিশরাও কেমন থমকে যায়।
আমি বলতে থাকি, “দেখুন, আমাদের রাজনীতি ব্যক্তিহত্যার রাজনীতি নয়। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেকে আছে, ব্যক্তিহত্যা তাদের বিপ্লবী কাজকর্মের প্রধান হাতিয়ার। হয়তো আপনাদের কোনো স্বজন, প্রতিবেশী, বন্ধুরা আমাদের বন্ধুদের হাতে নিহত হয়েছেন। সুতরাং আপনাদের আমাদের প্রতি, নকশালদের প্রতি রাগ থাকা স্বাভাবিক। আপনারা রাগ মেটাতে যা খুশি তা বলে আরও গাল পাড়তে পারেন। কিন্তু একটা কথা শুনে রাখুন, আমরা যে বিপ্লবী রাজনীতি করি, তা ব্যক্তিহত্যাকে সমর্থন করে না। জোতদার, জমিদার, বড়োলোকদের সমাজটাকে বদলে দিয়ে শ্রমিক কৃষক গরিবের রাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। আমাদের সেই স্বপ্নকে পূরণ করতে গেলে রাষ্ট্র বা সরকারের সাথে লড়াই বাঁধবেই। সেই লড়াইয়ে দু’পক্ষরই কেউ না কেউ মারা যেতেই পারেন। এই রক্তপাত অনিবার্য। কিন্তু, এই যে আপনারা পুলিশে কাজ করেন, আমাদের ধরতে আপনাদের কে পাঠিয়েছে? না, সরকার। আমরা যদি সংখ্যায় অনেক থাকতাম, আমাদের হাতে যদি আপনাদের মতো লাঠি বন্দুক থাকত, তবে আপনাদের সাথে লড়াই বেঁধে যেতই। সে লড়াইয়ে আমাদের অনেকে যেমন মারা যেতে পারত, তেমনি মারা পড়তে পারতেন আপনাদেরও কেউ কেউ। প্রত্যেক লড়াইয়ে এটা ঘটে থাকে। আপনারা যখন উর্দি পড়ে রাইফেল বা বন্দুক হাতে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, তখন দু’পক্ষই দু’পক্ষের কাছে শত্রু। কিন্তু আপনাদের কেউ যদি ছুটিতে দেশের বাড়িতে বা কোনো আত্মীয়ের বাড়ি যান, তখন তো আপনারা আর পুলিশ থাকেন না। আপনি বা আপনারা পুলিশে কাজ করেন বলেই তখন নিরস্ত্র আপনাদের কাউকে যদি আমাদের কেউ হত্যা করে বসে, আমাদের বিপ্লবী রাজনীতিতে তার সমর্থন মেলা ভার…”।
(চলবে…)
ছবি – প্রতীকী
