যতক্ষণ আয়ু থাকবে, তাকে বিপ্লবের কাজেই ব্যবহার করব

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৭তম পর্ব

আমাদের আবেদনে ওই যুবকদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য লক্ষ করলাম। কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করার পর অবশেষে একজন এসে আমাদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। আমরা কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় মাঠে গিয়ে পেচ্ছাব করে নিজেদের জায়গায় এসে শুয়ে পড়লাম। ওরা আমাদের জামাকাপড় সার্চ করেছে ঠিকই, কিন্তু জামার বুক পকেটে থাকা ক্যানিং-এর ঘরের ছোট্ট চাবিটা ওদের হাতে পরেনি। মাটিতে শুয়ে আমার প্রথম কাজ ওই চাবিটাকে মাটির মেঝেতে পুঁতে দেওয়া। তা করে আমরা নিশ্চিন্ত হলাম কিছুটা। 

(গত পর্বের পর) 

রাত পোহালে কী হতে পারে, কী ঘটতে পারে, সে কথা ভাবতে ভাবতেই রাত যেন ফুঃ দিয়ে সকালকে ডেকে আনল। সূর্যের আলো মুখ দেখাতে না দেখাতে আমাদের মুখ দর্শনের জন্য ভিড় জমতে থাকে ওই প্রাইমারি স্কুলে। অসংখ্য জোড়া চোখ অবাক হয়ে আমাদের দেখে। আমরাও তাদের চোখের দিকে তাকিয়ে সম্পূর্ণ ভোরের অপেক্ষায় সময় গুনি। ধীর পায়ে ভোর এসে অবশেষে স্কুলবাড়ি আলোয় ভরিয়ে তোলে। তখন খালি লোক আর লোক। নারী, পুরুষ, যুবক, শিশু, বৃদ্ধ, বৃদ্ধা – গ্রামটা পুরোই যেন আজ এক বিস্ময়কর ‘যাত্রা’ দেখতে সেখানে হাজির।

হরিপদ বেশ চুপচাপ চরিত্রের মানুষ। কোনো কথাবার্তা সে প্রায় বলে না। আমি নিজে নিজে ভেবে সিদ্ধান্তে এলাম – আমাদের ব্যাগ এবং কাগজপত্র গ্রামের লোকেদের কাছে আমাদের পরিচয় উন্মুক্ত করে দিয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় তাই আর গোপন করে কোনো লাভ হবে না। কয়েক জোড়া চোখের মণি আমাদের যেন প্রশ্ন করছে, “তোমরা কে? তোমরা কারা? এখানে কেন এসেছ?” এতগুলো মানুষ যদি শত্রু ভেবে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তাহলে আমরা মুহূর্তে গতায়ু হয়ে যাব। তারচেয়ে যতক্ষণ আয়ু থাকবে, বরং তাকে বিপ্লবী রাজনীতির বিস্তারে কাজে লাগাই। শুরু হয় আমাদের পরিচয় ঘোষণার পালা। 

আমি বললাম, “হ্যাঁ, লোকে আমাদের নকশাল বলে। কিন্ত আমরা আমাদের নকশাল বলি না। আমরা কমিউনিস্ট। বিপ্লবী কমিউনিস্ট। নকশালবাড়িতে ঘটে যাওয়া কৃষক আন্দোলনকে যারা সমর্থন করে, তাদের নকশাল বলা হয়। যে কমিউনিস্টরা মন্ত্রীত্ব দখলের জন্য আপনাদের দুয়ারে এসে ভোট ভিক্ষে করে, আমরা সে কমিউনিস্ট নই। ওরা কমিউনিস্ট নামের কলঙ্ক। আমরা খেটে খাওয়া মানুষদের সব রকম আন্দোলনকে সমর্থন করি। তাই সমর্থন করি নকশালবাড়ি আন্দোলনকে”।

আমি তো ভাষণ দিয়ে চলেছি, এমন সময় ওই প্রাইমারি স্কুলের হেডমাস্টার আমাদের সামনে এসে উপস্থিত হন। চারদিকে ঘিরে থাকা লোকজন চিৎকার করে বলে, “মাস্টারমশাই, ওদের বলতে দিন, কোমরের দড়ি খুলে দিন। ওনারা পালাবার লোক নন”। বুঝলাম, এই লোকগুলো আমাদের মেরে ফেলবে না। এদের চোখে মুখে কিছুটা সমর্থনের আভাস। 

আমি ও হরিপদ মাস্টারমশাইকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করি। মাস্টারমশাই “থাক থাক প্রণাম করতে হবে না” বলে আমাদের গার্ড করে লোকজনকে ফিরে যাওয়ার জন্য আবেদন করেন। লোকজনের ভিড় কিন্তু বাড়তেই থাকে। জনসমুদ্রের ঢেউ পারলে ছোট্ট স্কুলবাড়িটাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। 

মাস্টারমশাই একজনকে একটা ঘটি ও এক বালতি জল আনতে আদেশ দিলেন। আমাদের বললেন, মুখ হাত-পা ধুয়ে নিতে। আমাদের দড়ির বাঁধন খুলে দেওয়া হল। লোকজনের মধ্যে আবার একদল চেঁচিয়ে উঠল, “যা বলছিলেন বলুন। থামলে চলবে না কিন্তু”। 

মাস্টারমশাই প্রায় ধমকে ওদের চিৎকার চ্যাঁচামিচি বন্ধ করতে বাধ্য করলেন। তাঁর বাড়ি সম্ভবত স্কুলবাড়ির পেছনেই। তাঁর আদেশে একজন দু’টি থালায় পান্তা ভাত এবং আখের গুড় নিয়ে এল। আমাদের হাতমুখ ধুয়ে পান্তা খেয়ে নিতে অনুরোধ করলেন মাস্টারমশাই। আমাদের পরিচয়, আমাদের উদ্দেশ্য ইত্যাদি জানতে চেষ্টা করলেন। খেতে খেতে আমি কখনও বাংলা, কখনও ইংরেজি ভাষায় তার কথার জবাব দিলাম। আমাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করতে সংস্কৃত শ্লোকও শোনালাম, যেখানে বলা হয়েছে, যে রাজা প্রজার দেখভাল করতে পারে না, তাকে কুকুরের মতো পিটিয়ে মারার অধিকার আছে প্রজাদের। কথাগুলো চারপাশের লোকজনেরও কানে যাচ্ছিল। তারা বলাবলি করতে লাগল, “এরা সব শিক্ষিত ছেলে, অনেক কিছু জানে”। তাদের অনেকের চোখেই কেমন শ্রদ্ধা শ্রদ্ধা ভাব লক্ষ করলাম। একজন তো প্রশ্ন করে বসলেন, “আপনার তো বলছেন আপনারা নকশাল নয়, আবার বলছেন…”

(চলবে…) 

 

Developed by DXDasia