
নাস্তিক জাবালিও পুজো পেতেন অযোধ্যায়
সারা দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তৈরির অভিযোগ মোদি সরকারের বিরুদ্ধে নতুন নয়। এই রাজনৈতিক দলটি এবং এদের শাখা প্রশাখা নানা সংগঠন একই সঙ্গে অসহিষ্ণুতার জয়গান করে এবং নিজেদের রাম ভক্ত বলে দাবি করে। অনেকে মনে করেন, রামায়ণের ইজারা এখন এদেরই হাতে। কিন্তু সত্যিই কি রামায়ণ এমনই অসহিষ্ণুতার কথা বলে!
একটু অতীত ঘুরে আসা যাক। রামায়ণে আছে, হিন্দুত্বে চূড়ান্ত অবিশ্বাসী নাস্তিক জাবালিও পুজো পান। জাবালি ছিলেন এক জন ব্রহ্মর্ষি। অন্তত, সুধীরচন্দ্র সরকার সংকলিত পৌরাণিক অভিধানে তো তাই বলা হয়েছে। ভরতের শত অনুরোধেও রাম অযোধ্যায় ফিরে যেতে রাজি না হলে জাবালি রামকে ‘ধর্মবিরুদ্ধ’ উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন, বাবাকে শ্রদ্ধা করা ভালো, কিন্তু বাবা যদি ভুলভাল বলেন, সেসব শোনার দরকার কী? অর্থাৎ পিতৃসত্য-টত্য বলে কিছু হয় না। জাবালি রামকে বললেন, এই পৃথিবীতে জীব একা জন্মায়, একাই বিনষ্ট হয়। মাতা পিতা ভ্রাতা বন্ধু সব সম্পর্ক অস্থায়ী। একে সত্য ভেবে যারা তাতে আসক্ত হয়, তারা নির্বোধ। কারণ কেউ কারও নয়। মৃত্যুতেই সব কিছুর পরিসমাপ্তি। দশরথও রামচন্দ্রের পিতা নন। রামচন্দ্রও দশরথের পুত্র নন। প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র ব্যক্তি। পিতা জীবনের বীজ মাত্র, ঋতুমতি মাতার গর্ভে একত্রে মিলিত শুক্র ও শোণিতই জন্মের মূল কারণ। মা বা মাতা সম্পর্কে এমন আবেগবিহীন মতও প্রকৃত হিন্দুত্বে সমাদরে গ্রহণযোগ্য। গ্রহণযোগ্য কারণ তিনি জ্ঞানী। তাঁর সম্পর্কে তাই বশিষ্ঠ মুনিকে বলতে শোনা যায়, জাবালির সমস্তই জ্ঞাত। মহাতপস্বী এই জাবালিকে আমরা আবার পাই, রাবণ বধের পর রামের অভিষেকে। দেখা যাচ্ছে এই পরম নাস্তিকও সেখানে সমাদরে আমন্ত্রিত। বিবরণ এই রকম। সুগ্রীবের আজ্ঞায় হনুমান জাম্ববান বেগদর্শী ও ঋষভ রত্নভূষিত স্বর্ণকলস নিয়ে মহাবেগে যাত্রা করলেন এবং শীঘ্র চতুঃসাগরের জল নিয়ে ফিরে এলেন। পাঁচশো নদীর জলও আনা হল। তার পর রাম সীতার সহিত রত্নময় পীঠে উপবিষ্ঠ হলে বৃদ্ধ বশিষ্ঠ, বিজয়, জাবালি প্রভৃতি পুরোহিতগণ যথাবিধি অভিষেক সম্পন্ন করলেন। জাবালি ভিন্ন মতের এক জন গুণী ঋষি। রামায়ণে তার প্রতি যে বিপুল সম্মান এবং সহিষ্ণুতা দেখা যায় তা অবাক করে দেয়।এমনই বৃহৎ পরিসর হিন্দু ধর্মের। অথচ এই সহিষ্ণুতার কোনও ছাপই নেই রাজনৈতিক আঙিনায় ক্ষমতা দখলে ব্যস্ত তথাকথিত হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলির আচরণে।
যে দল ক্ষমতায় এলে ভিন ধর্মের উপাসনাসনা সৌধ (হলেই বা বিতর্কিত এবং বর্জিত) ভেঙে দেওয়া হয়। যার ফলশ্রুতিতে দেশ জুড়ে রক্তাক্ত দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল, যে দলের নেতারা প্রত্যেকে প্রাক স্বাধীনতা যুগে ইংরেজ বিরোধী লড়াইয়ে দেশের প্রতি মুখ ফিরিয়ে ছিলেন, যে সংগঠন গান্ধী হত্যার খবর পেয়ে আনন্দে পথে পথে মিষ্টি বিলি করেছিল (নেহরুকে লেখা প্যাটেলের চিঠি), ক্রমাগত হিন্দুত্ববাদী আখ্যা দিয়ে ভারতের সব ক’টি রাজনৈতিক দল হিন্দুদের নিয়ে মনোপলি রাজনীতি করার অধিকার তাদের হাতেই দিয়ে রেখেছে।
এই রাজনৈতিক দল এবং তার নানা ধরনের সংগঠন দেশ জুড়ে অসহিষ্ণুতার চর্চা করছে গত বেশ কয়েক বছর ধরে। তারা কোনও ধরনের ভিন্ন মত শুনতে নারাজ। তারা মনে করে হিন্দু ধর্মের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রভু-ভৃত্যের। অথচ রামায়ণে আমরা দেখি সমুদ্র দেবতা কথা না শুনলে তাই রাম ব্রহ্মাস্ত্র বাণ মেরে সমুদ্রকে শিক্ষা দিতে প্রস্তুত হন। সমুদ্রদেবতা তখন বলেন, বিশ্বকর্মাপুত্র নল যে সেতু তৈরি করবে সমুদ্রের উপর, তিনি তা ধারণ করবেন। এই ভাবেই তৈরি হল রাবণ বধের জন্য লঙ্কায় যাওয়ার ১০ যোজন চওড়া, ১০০ যোজন দীর্ঘ সেতু। রাবণের উপরেও থাকে ব্রহ্মার আশীর্বাদ। যে রাবণের জন্মের সময় ‘শৃগালদের মুখ থেকে অগ্নিশিখা নির্গত হচ্ছিল আর মাংসাশী জন্তুরা চক্রাকারে বামবর্তে বিচরণ করছিল’ সেই রাবণ কিন্তু ব্রহ্মার আশীর্বাদে দেব, দানব, দৈত্য, যক্ষ, রক্ষ, নাগ ও গরুরের অবধ্য। কেবল মাত্র মানুষই তাকে মারতে পারবে। তাই বিষ্ণুকে মানুষ হয়ে রাম নাম নিয়ে মর্তে আসতে হয়েছিল রাবণকে মারতে। ফলে রাম কখনওই দেবতা ছিলেন না। দেবতা হলে তিনি রাবণকে হত্যা করতে পারতেন না। বা অপমানিত সীতার কথাই ধরা যাক। রানি হয়ে স্বামী রামের সিংহাসনে বসতে চাননি। কারণ রামের ব্যবহারে তিনি অসম্মানিত বোধ করেছিলেন। তাই ‘স্বামী দেবতা’ রামের অনুরোধ হেলায় উপেক্ষা করে পাতাল প্রবেশ করলেন তিনি। সীতা কিন্তু আত্মহত্যা করেননি। পাতাল প্রবেশ ছিল তাঁর প্রতিবাদ। এই সীতাই সত্য যুগে বেদবতী নাম নিয়ে যখন তপস্যা করছিলেন বিষ্ণুর জন্য, রাবণ তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেশ স্পর্শ করেছিলেন। বেদবতীর মনে হয়েছিল, ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই স্পর্শ কার্যত ধর্ষণ। তখনই বেদবতী রাবণকে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, তোমার মৃত্যুর কারণ হয়ে আমি আবার ফিরে আসব। তাই ত্রেতা যুগে সীতার ফিরে আসা জনক কন্যা হয়ে। এই যোগী নাকি বিশ্বাস করেন, মেয়েদের স্থান রান্নাঘর। হিন্দুত্ববাদীরা সীতার এই প্রতিবাদী রূপ দেখতে অক্ষম।
