আমাদের দড়ি বেঁধে রাখা হল, কয়েকটি যুবক থাকল পাহারায়

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬৬তম পর্ব

এবং নৌকো এল। নৌকোর কাঠ তুলে টেনে হিঁচড়ে আমাদের ঢুকিয়ে দিয়ে যাত্রা শুরু করল। নৌকোর পেটে জমে থাকা নোনা জলের আদরে আমাদের দেহের ছড়ে যাওয়া জায়গাগুলো জ্বলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সচেতনতা ফিরে পেলাম। হরিপদকে কানে কানে বললাম, “গুলি খেয়ে মরার আগে আমরা কী বলব, হরিপদ?” ও ফিসফিস করে বলল, “বিপ্লবীদের হত্যা করে বিপ্লবকে ঠেকানো যায় না, যাবে না”। বন্দুক হাতে লোকটা আমাদের ফিসফিসানি বোধহয় শুনতে পেয়েছিল। বলে উঠল, “যতই ফন্দি আঁটো, তোমাদের বিপ্লব এবার কাবার হয়ে এল”। এবং বলে খ্যাঁক করে একবার হেসে উঠল। 

হরিপদর সাথে আমার খুব বেশি চেনা জানা ছিল না। কিন্তু তার মুখে আমার প্রশ্নের ওই জবাব শুনে ব্যথা বেদনা যেন কোথায় উড়ে গেল। হাত খোলা থাকলে আমি ওকে সেদিন বিপ্লবী উত্তেজনায় জড়িয়ে ধরে বলতাম, “সাবাশ! কমরেড, সাবাশ!” সেই উল্লাস প্রকাশ করার কোনো সময় দিল না আমার দেহ। আমি এবার সত্যি সত্যি জ্ঞানহারা হলাম। 

(গত পর্বের পর)

জ্ঞান ফিরলে বুঝলাম, যেখান থেকে আমাদের নৌকো যাত্রা করেছিল, সেখানেই আবার ফিরে এসেছে। এবং আমাদের মেরে ফেলেনি ওরা। কথাবার্তা থেকে বুঝতে পারছি, ওরা নাকি সকালেই পুলিশে খবর দিয়েছিল। যেই ছেলেটা আমাদের ব্যাগ চুরি করে, সে যা নেওয়ার তা নিয়ে ব্যাগদু’টো ফেলে পালিয়েছে। গ্রামের লোকেরা সেগুলো নিয়ে গেছে গ্রামের মাতব্বরদের কাছে। বইপত্র ডায়রি ইত্যাদি ঘেঁটে আমাদের চরিত্র বুঝতে অসুবিধে হয়নি তাদের। আমাদের পাহারা দিয়ে রেখে ওরা গোসাবার পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ নাকি বলে, কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা যাচ্ছে। বুঝলাম, ওই তাস খেলুড়েরাই ছিল পাহারাদার। কিন্তু সন্ধে হয়ে গেলেও পুলিশ না আসায় ওই মাতব্বরেরা আর সবুর করা উচিত মনে করেনি। তাই নিজেরাই বিচারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়ে দণ্ডাজ্ঞা ঘোষণা করে। তা কার্যকর করতেই আমাদের বেঁধে রওনা হয়েছিল নৌকো করে। 

কিন্তু ‘পুলুস’কে যেহেতু খবর দেওয়া হয়ে গেছে, তখন আইন নিজের হাতে তুলে নিলে নিজেরই বিপদ দেখে আনবে না তো! নৌকোয় উঠে তাদের এই বির্তকই আমাদের প্রাণহরণ না করে আবার গ্রামে নিয়ে আসে। মাটির দাওয়াওয়ালা একটি প্রাইমারি স্কুলে আমাদের তোলা হয় দড়ি বাঁধা অবস্থাতেই। কয়েকটি যুবককে পাহারায় রেখে সবাই একে একে বাড়ি চলে যায়। অন্ধকার দূর করতে ঝুলিয়ে রেখে যায় একটি হ্যাজাক। হাতে কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় মাটির ঘরের দেওয়ালে ঠেসান দিয়ে পরবর্তী পরিণতির কথা ভাবতে ভাবতে ঝিমুতে থাকি। 

পাহারাদার যুবকেরা বেঞ্চে বসে কিছুক্ষণ তাস পেটাল। তারপর শুরু করল নাটকের রিহের্সাল। কান পেতে শুনলাম – নাটকটা কিন্তু শ্রমিক কৃষকদের নিয়েই। আমি কেমন আশা ফিরে পেলাম। আস্তে আস্তে বলে উঠলাম, “দাদারা, একটা কথা বলব?” একজন ঝাঁকিয়ে উঠে বলল, “কী বলবেন, বলুন!” বললাম, “দেখুন, আমাদের কাছে একটা পয়সাও নেই, আর এখানকার পথঘাট কিছুই চিনি না আমরা। সুতরাং, পালিয়ে যাব তার সাধ্যি নেই! আপনারা যদি আমাদের হাতের বাঁধন খুলে দেন, কোমরের বাঁধন যেমনি আছে তেমনি থাক, আমরা তাহলে পেচ্ছাব করে এসে একটু শুতে পারি। আপনাদের রিহের্সাল আমাদের খুব ভালো লেগেছে। শেষটকুও আমরা শুনব কিন্তু”। 

আমাদের আবেদনে ওই যুবকদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য লক্ষ করলাম। কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে কথা বলাবলি করার পর অবশেষে একজন এসে আমাদের হাতের বাঁধন খুলে দিল। আমরা কোমরে দড়ি বাঁধা অবস্থায় মাঠে গিয়ে পেচ্ছাব করে নিজেদের জায়গায় এসে শুয়ে পড়লাম। ওরা আমাদের জামাকাপড় সার্চ করেছে ঠিকই, কিন্তু জামার বুক পকেটে থাকা ক্যানিং-এর ঘরের ছোট্ট চাবিটা ওদের হাতে পরেনি। মাটিতে শুয়ে আমার প্রথম কাজ ওই চাবিটাকে মাটির মেঝেতে পুঁতে দেওয়া। তা করে আমরা নিশ্চিন্ত হলাম কিছুটা। 

(চলবে)

Developed by DXDasia