
নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৬২তম পর্ব
মণির তটে আমার থাকা আর নিরাপদ নয় বুঝে সে রাতের শেষেই ইরান আমাকে নৌকো করে মণি নদী পার করে বলে গেল, “সাবধানে যেও সোনাদা!” ভোরের হাওয়া তখন আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে যেন বলেছিল, “এইসব আত্মজনদের কখনও ভুলিস না সোনা”।
না, আজও আমি তাদের ভুলিনি, ভুলতে পারিনি।
(গত পর্বের পর)
এই পর্যায়ে আমার সঙ্গে কাজ করার জন্য কলকাতা থেকে আরেকজন কমরেডকে পাঠানো হল। বয়সে আমার থেকে ছোটো। প্রাইমারি স্কুলে মাস্টারি করত। মাস্টারি ছেড়ে আমার ও অন্য অনেকের মতো বিপ্লবে যোগদান করতে গ্রামে এসেছে। কয়েকদিন একসঙ্গে ঘোরাঘুরি করার পর হটনগরে আমাদের কাজকর্ম ও তার পরিণতিতে আমার অভিজ্ঞতা কী হয়েছে, তা ওকে বুঝিয়ে বললাম। ঠিক করলাম, আমরা দু’জনে মিলে নিজেদের উদ্যোগেই কাজের এলাকা খুঁজে বার করব। এবং সেখানে নিজেদের পরিকল্পনামতো রাজনৈতিক কাজকর্ম গড়ে তুলব। ক্যানিং বাজারে থাকার জন্য একটি ঘরও পেয়ে গেলাম আমরা। আলু, বেগুন, আনাজপত্র নিয়ে সেই বাজারে ঠাঁই গেঁড়ে বসলাম।
ওই বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা নানানজনের সঙ্গে আমাদের ধীরে ধীরে পরিচয় গড়ে উঠল। তুলনামূলকভাবে যাঁর সঙ্গে বেশি বন্ধুত্ব হল, তাঁর নাম কমল দাস। পরিচয় একটু গভীর হতেই তাঁর কাছে আমাদের উদ্দেশ্য ব্যক্ত করে বসলাম সুযোগ বুঝে। এর মধ্যেই তাঁর সঙ্গে দাদা সম্পর্ক পাতিয়ে ফেলেছি। তিনি আমাদের কমলদা। আমরা তাঁরই আত্মীয় বলে পরিচিত হলাম। কমলদার বাড়ি সুন্দরবনের প্রান্তভাগের এক গ্রাম সাতজেলিয়ায়। সেখানে তাঁর নাকি একটা দোকানঘর আছে। গ্রামে কোনো উৎসব, মেলা ইত্যাদি হলে কমলদা সেই দোকানে চা বিক্রি করেন। অন্য সময়ে ক্যানিং-এ পান পাতার ব্যবসা করেন।
আরও পড়ুন
মণি নদীর তটও ভেঙে গেল…
কমলদা আমাদের বুদ্ধি দিলেন শাঁখা-চুড়ি-ফিতে-মালা-আলতা-সিঁদুর ফেরি করার জন্য কাচের ডালাওয়ালা একটা বাক্স তৈরি করতে। কলকাতা থেকে মালপত্র কিনে এনে সাতজেলিয়া ও তার আশেপাশের গ্রামে আমাদের একজন ঘুরে ঘুরে ফেরি করব। কমলদার দোকানটাকে মেয়েদের সাজসজ্জার নানা জিনিসপত্র দিয়ে সাজানো হবে।
পরিকল্পনা মতো একদিন আমরা দু’জন কমলদার সঙ্গে সাতজেলিয়া রওনা দিলাম। ক্যানিং থেকে সকাল ন’টায় নৌকো ছাড়ল। আমরা সাতজেলিয়া পৌঁছলাম বিকেল সাড়ে তিনটে নাগাদ। রাস্তার পাশে খড়ের চালা আর কঞ্চির বেড়া দেওয়া টালির চালওয়ালা একটা ঘরে আমাদের নিয়ে হাজির হলেন কমলদা। কথায় কথায় জানা গেল, ক’দিন বাদে ওইখানে একটা বিরাট মেলা হওয়ার কথা। সেদিন গ্রামেরই একটা ছোট্ট মেয়ে ‘দেবীর ভর’ প্রাপ্ত হয়, এবং নানাজনে নানান শেকড়-বাকড় ওষুধপত্র দেয়। সেই ‘দৈব ওষুধ’ নিতে ওই মেলায় সুন্দরবনের নানা প্রান্ত থেকে বহু লোক ভিড় করে। বিক্রিবাট্টাও খুব একটা কম হয় না। ঠিক হল, আমরা মালপত্র নিয়ে মেলার আগের দিন সাতজেলিয়া চলে আসব। পরের দিন সকাল থেকে দোকান সাজিয়ে বসব।
পরের দিনই কলকাতা ফিরে গিয়ে টাকাপয়সা সংগ্রহ করে মালপত্র কিনতে শুরু করি দু’জনে। এই সুন্দরবনের বিরাট অংশই তখন পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্গত। আর সীমান্ত ‘বিপ্লবী ঘাঁটি’ প্রতিষ্ঠা করার জন্য উপযুক্ত জায়গা। আমরা যদি এখানে লেখে পড়ে থাকতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই একদিন না একদিন স্বপ্ন সফল করতে পারব।
ক্যানিং থেকে বহু লোক ওঠে নৌকোয়। সাতজেলিয়া পর্যন্ত দীর্ঘ নদীপথের স্থানে স্থানে নৌকো ভেড়ে। লোকজন মালপত্র নিয়ে ওঠানামা করে। নদীর পার মাটি দিয়ে উঁচু করা। জল তার অনেক নিচে। নৌকো থেকে দু’পারের গ্রাম প্রায় দেখাই যায় না। ভেড়ির ওপর দিয়ে লোকজন, ভ্যানরিক্সা চলাচল করতে দেখি। বয়স্ক নারী ও কুমারী মেয়েরা জাল বা কাপড়ের ফাঁদ তৈরি করে চিংড়ি মাছের ‘মীন’ ধরে। মা-দিদিরা জল ঝেড়ে ‘মীন’ তুললে ছোটো ছেলেমেয়েরা মাটি বা অ্যালুমিনিয়ামের পাত্র নিয়ে জলের কিনারায় নেমে আসে। পাত্র বাড়িয়ে দেয়। তারপর একটা বড়ো হাঁড়িতে ‘মীন’গুলো রেখে আবার কখন নামতে হবে, তার অপেক্ষায় থাকে। মাঝে মাঝে খড়ের চাল ও মাটির দেওয়ালের ঘরবাড়ি একবার দেখা দিয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছিল। নৌকোটা আমাদের বেশ বড়ো। অনেক যাত্রী। তাদের খিদে মেটানোর জন্য কয়েকজন ঘুগনি মুড়ি চানাচুর বিক্রি করছিলেন। দাঁড়ে বসা মাঝি সুর সাধছিলেন মাঝে মাঝে।
(চলবে)
