শাবলের এক ঘায়ে ‘খতম’ হয়ে গেল চৌকিদার

নকশাল আন্দোলন নিয়ে লিখছেন সৃজন সেন, আজ ৫৫তম পর্ব

একটি রাজনৈতিক গ্রুপের যে সমস্ত বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত, ‘দক্ষিণ দেশ’ গ্রুপ তার ব্যতিক্রম ছিল না। নিচুতলা থেকে উঁচুতলায়, উঁচুতলা থেকে আবার নিচুতলায় পরিক্রমার মধ্য দিয়ে যেভাবে পার্টির কর্মসূচি নির্মাণ ও তাকে কার্যকর করার ধারা অনুসরণ করা উচিত – ‘দক্ষিণ দেশ’ গোষ্ঠীরও তা ছিল না। সমীরদার নিয়মিত যোগাযোগ রাখা ও কদাচিৎ কেসির আগমন ও কথাবার্তা ও কাজের নির্দেশদানের মধ্য দিয়ে একটি রাজনৈতিক গ্রুপ কখনও পার্টি চরিত্র অর্জন করতে পারে না।

তবে, এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, কেন্দ্রীয়ভাবে আমাদের এদিককার কাজকর্ম পরিচালনার দায়িত্ব কেসি’রই ছিল। মাস্টারমশাই কোনোদিন এ অঞ্চলে আমাদের মুখোমুখি হননি। শুনেছি, মাস্টারমশাইয়ের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয় আরও অনেকের মতো ছাত্রজীবন থেকে। তারপর অনুশীলন পার্টি। কারাবাস, কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগদান এবং দক্ষতার সঙ্গে সংগ্রাম ও সংগঠন পরিচালনায় মুনশিয়ানা অর্জন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিখণ্ডিত হলে তিনি ‘সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে’ সংগ্রামের ধারায় একদিকে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে মাওসেতুং-এর নেতৃত্বাধীন চিনা পার্টির মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে ক্রিশ্চেভের সংশোধনবাদী লাইনের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ধারায় সিপি(আই)এম-এর যোগদান করেন, হুগলি জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সম্পাদক হবার দায়িত্ব পান। তেমনই প্রায় একই সময়ে সিপিআই(এম) যে একটি নয়াসংশোধনবাদী পার্টি, এ পার্টি কোনোদিনই এদেশে বিপ্লব করবে না – এই বোধ থেকে গোপনে রাজনৈতিক কার্যকলাপ চালিয়ে যাওয়া শুরু করেন আরও কয়েকজনের সঙ্গে এক হয়ে। এঁদের দ্বারাই সংশোধনবাদ, নয়াসংশোধনবাদ বিরোধী রাজনৈতিক সংগ্রাম ও কৃষিবিপ্লবী কর্মসূচিতে কমরেডদের সামিল করার উদ্দেশ্যে প্রথমে হাতে লিখে ও পরে ছাপা অবস্থায় ‘চিন্তা’ নামে একটি ক্ষুদ্র রাজনৈতিক পুস্তিকা অনিয়মিতভাবে প্রকাশ হতে থাকে। 

শিলিগুড়ির চারু মজুমদার তাঁর আট দলিলের মাধ্যমে যেভাবে পরিচিত হয়েছিলেন, অমূল্য সেন ও তাঁর সঙ্গীসাথীদের দ্বারা সেই পর্যন্ত প্রকাশিত ‘চিন্তা’ পত্রিকার ৬টি সংখ্যাকে ‘ছয় দলিল’ নামে অবিহিত করতে ভালোবাসতেন তাঁদের সঙ্গে জড়িত কমরেডরা। মাস্টারমশাই প্রকাশিত অনেকগুলো রচনাই সে সময়ে বিপ্লবী ধারার কর্মীদের দিশা যোগাতে সমর্থ হয়েছিল। তবে, কৃষকদের মধ্যে কাজ করার লাইন, ‘মাস লাইন’ বা গণকর্মনীতি সম্পর্কিত লেখাগুলি খ্যাতি অর্জন করেছিল। আবার, বেশ কিছু লেখা মাস্টারমশাই বা অমূল্য সেনের লেখা বলে বর্তমানকালে তাঁর ‘ভক্তরা’ দাবি করলেও তা নিয়ে বিতর্কও আছে। অবশ্য এ লেখায় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করার অবকাশ নেই।

যা হোক, আমরা আবার গ্রামে ফিরে যাই। ‘অ্যাকশন’ করার জন্য আমাদের বিপ্লবী উদ্যোগ এবার তৃতীয় সুযোগের জন্য যখন অপেক্ষা করছিল, তখন ওপরতলা থেকে নির্দেশ এল – আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম রামভদ্রপুরে উচ্চতম কমিটির একটি জরুরি সভার আয়োজন আমাদের সম্পূর্ণ করতে হবে। দিনক্ষণ ঠিক হয়ে গেল। সেই মিটিং অবশ্যই রাতে হবে। আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছিল জয়নগর স্টেশন থেকে কমরেডদের ‘রিসিভ’ করে রামভদ্রপুর পৌঁছে দেওয়া। জয়নগর স্টেশন থেকে মাঠের মধ্যে দিয়ে প্রায় সাত-আট কিলোমিটার অতিক্রম করে হটনগরে পৌঁছনো যায়। সেখান থেকে রামভদ্রপুর।

নির্দিষ্ট দিনে আমি দুপুরেই আমার ডেরা থেকে বেরিয়ে পড়ি। জয়নগর স্টেশনে পৌঁছে দেখলাম, আমি অনেক আগে চলে গিয়েছি। সুতরাং, আরও ঘণ্টাদুয়েক অপেক্ষা করতে হবে। কী করা যায় ভাবতে লাগলাম। সিদ্ধান্তে এলাম, জয়নগরের পরের স্টেশন মথুরাপুর। মাঝে বিষ্ণুপুর বলে একটা জায়গা আছে, ডায়মন্ডহারবার থেকে রায়দীঘি পর্যন্ত বাস চলাচল করে যে রাস্তায়, সেই রাস্তায় মথুরাপুর ও জয়নগরের মাঝবরাবর বিষ্ণুপুর। বিষ্ণুপুরের মহাশ্মশানও এখানে খুব বিখ্যাত। যে পথটি বিষ্ণুপুর থেকে মথুরাপুরের দিকে চলে গিয়েছে, তার মাঝবরাবর বাঁ দিকে বাঁশের বেড়া, টালির চালা দেওয়া একটা সিনেমাহল ছিল। আমি সময় কাটাবার জন্য ঠিক করলাম সিনেমা দেখব। টিকিটের লাইনে দেখা হয়ে গেল হটনগরেরই একজনের সঙ্গে। সে বললে, “সোনাদা, তুমি এখানে! চৌকিদার তো আজ সকালেই খতম হয়ে গিয়েছে। গ্রামের পথ দিয়ে যাচ্ছিল। বিদ্যা তাকে দেখতে পেয়ে শাবলে এক ঘায়ে খতম করে দিয়েছে”। তা শুনে আমি তো হতভম্ব! এখন কী করি? 

(চলবে)  
 

Developed by DXDasia