ভোটের ফল বেরোলে জনতা স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে ফেটে পড়ল

বন্যা আসে, বন্যা যায়

বন্যা যখন আসে, তখন চতুর্দিক ভাসায়। তারপর একদিন বন্যার জল ধীরে ধীরে সরতে আরম্ভ করে। থেকে যায় ভূমিকে উর্বরা করা পলিমাটি – ফল পরিণতি – সুজলা-সুফলা শস্যক্ষেত্র। ১৯৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলনের রেশও তেমনি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গিয়েছিল কিন্তু ওই ’৬৬ সালই আমাদের যৌবনের সাথে রাজনীতির মালাবদল ঘটিয়ে দিয়ে গিয়েছিল। বালক-কিশোর-ছাত্র-তরুণ – সবার হৃদয়ে এ সময়ে কমিউনিস্ট অথবা বামপন্থী রাজনীতির ছোঁয়া লাগে, শিক্ষক-মজুর-অফিস কর্মচারী, অনেকেই এসে ভিড় করে রাজনীতির অঙ্গনে। প্রকাশিত হয় অজস্র নতুন নতুন পত্র-পত্রিকা। সিপিএম-র পত্রিকা ‘দেশহিতৈষী’ বার বার ছাপাতে হয়। প্রকাশিত হয় ‘নন্দন’, ‘অনীক’, ‘দক্ষিণ দেশ’, ‘লাল তারা’ ইত্যাদি বিপ্লবী উত্তেজনা সৃষ্টিকারী হরেক পত্রিকা। সমর সেন প্রকাশ করেন ‘Now’ পত্রিকা – প্রকাশ হতে না হতেই সে পত্রিকা বাজার থেকে উধাও হয়ে যেত। পববর্তীকালে ওই ‘Now’ পত্রিকা ‘ফ্রন্টিয়ার’ নামে গণপরিচিতি পায়। 

আমাদের মধ্যে জানার ও পড়ার আগ্রহও ভীষণভাবে বেড়ে চলে। তরুণ সমাজ মার্কস-এঙ্গেলস-লেনিন-স্তালিন-মাও সেতুং-এর রচনা পাঠে ভীষণ পরিমাণ আগ্রহী হয়ে ওঠে। সর্বত্র রাজনৈতিক আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক, রাজনীতি ছাড়া আর সব কিছুই তখন ‘আলুনি’ বলে মনে হত আমাদের কাছে। রাজপথ কাঁপিয়ে চলত মিছিল – কেবল মিছিল। “লড়াই, লড়াই, লড়াই চাই, লড়াই করে বাঁচতে চাই” – এই স্লোগানের জন্মও সেই সময়েই। আমাদের মুখে মুখে তখন স্লোগান – “আমার নাম, তোমার নাম, ভিয়েতনাম, ভিয়েতনাম”। এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকা জুড়ে বাজছে মুক্তির রণদামামা। আমরা সব সেই মুক্তিযুদ্ধেরই শরিক। আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিও আমাদের ভাবনায় প্রায় মুক্ত হবার অপেক্ষায়। এই মুক্তি বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে না ঘটলেও একটা বড়ো রকমের ওলটপালটের জন্য দেশ জুড়ে একটা অস্থিরতা সত্যি তখন দানা বাঁধছিল। সাধারণ নির্বাচন তখন আসন্ন। এই নির্বাচনকে ব্যবহার করে সেই ওলটপালট ঘটাবার জন্য আমাদের বুকে বুকে তখন রণদামামা। 

’৬৬ সালের খাদ্য আন্দোলন কংগ্রেসকে কোণঠাসা করে দিয়েছিল। এই সময় অজয় মুখার্জি কংগ্রেস দল ছেড়ে বেরিয়ে এলেন – তাঁর সঙ্গে অতুল্য ঘোষ ও তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের বিরোধ তখন চরমে। অজয় মুখার্জি গঠন করলেন ‘বাংলা কংগ্রেস’। তাঁর দল বিরোধী বামেদের সঙ্গে যুক্ত হলে কংগ্রেস বিরোধী শক্তির বলবৃদ্ধি হল অনেকটা। মানুষ চাইছিল সিপিআই ও সিপিএম ঐক্যবদ্ধ হয়ে কংগ্রেসের বিরুদ্ধে লড়ুক। কিন্তু সাধারণ মানুষের ঐকান্তিক আগ্রহ সত্ত্বেও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে সবাই একজোট হয়ে লড়তে পারল না। দুই কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে সম্পর্কটা তখন আদায়-কাঁচকলায়। আমরা যারা সিপিএমের পক্ষভুক্ত, তারা সংশোধনবাদী সিপিআইকে এতটুকু সহ্য করতে পারতাম না তখন। পরিণতিতে তৈরি হয় কংগ্রেস বিরোধী দু’টো জোট। বাংলা কংগ্রেস ও সিপিআই মিলে গড়ে তুলল প্রগতিবাদী সংযুক্ত বামফ্রন্ট, আর সিপিএমের নেতৃত্বে অন্যান্য বামদলগুলিকে নিয়ে গড়ে উঠল সংযুক্ত বামফ্রন্ট। 

পশ্চিমবঙ্গের ভোটদাতারা কংগ্রেসকে হারিয়ে ওই দু’টো ফ্রন্টকে একত্রিত হয়ে সরকার গড়তে একরকম বাধ্য করল। ভোটের ফল বেরুলে দেখা গেল ১২৭টি আসনে জিতে কংগ্রেস সংখ্যালঘু দলে পরিণত হয়েছে। আরামবাগে অজয় মুখার্জির কাছে প্রফুল্ল সেন হেরে বসেছেন। পরাজিত হয়েছেন অতুল্য ঘোষও। সন্ধ্যার দিকে এ খবর প্রকাশিত হলে কলকাতা-সহ পশ্চিমবঙ্গের প্রায় সব শহরে, রাস্তায় রাস্তায়, অলিতে-গলিতে জনতা স্বতঃস্ফূর্ত আনন্দে ফেটে পড়ল। খাদ্য আন্দোলনের সময় প্রফুল্ল সেন বলেছিলেন, “ মানুষ চাউল পাচ্ছে না তো কাঁচকলা খাচ্ছে না কেন?” তাঁর সমর্থক ছিলেন একচক্ষু কানা কংগ্রেস নেতা অতুল্য ঘোষ। সাধারণ মানুষ তাঁদের ভোট পরাজয়ের খবর পেয়ে বিদ্রুপে ফেটে পড়ল। শহরের রাস্তায় রাস্তায়, গলির মোড়ে মোড়ে ঝোলানো হল কাঁচকলা আর কানা বেগুনের মালা। রাস্তার লাইটগুলোকে লাল সেলোফোন কাগজে মুড়ে দেয়া হল। রাজপথ-অলিগলি তখন লালে লাল। পোড়ানো হল অতুল্য-প্রফুল্লের কুশ পুত্তলিকা। এ যেন দ্বিতীয় স্বাধীনতা দিবস! আমাদেরও ভরসা বেড়ে গেল। দেশে গরিবরা মর্যাদা পাবে, বড়োলোকরা মাথা তুলে পথ চলতে পারবে না, জিনিসপত্রের দাম কমবে। পাপ বিদায়ের আনন্দে তখন মানুষ আত্মহারা! 

কংগ্রেস হেরেছে – এটাই জনগণের কাছে রাজনৈতিক সারকথা। 

(চলবে) 

Developed by DXDasia