
সংশোধনবাদ থেকে নয়াসংশোধনবাদ
সমীর রায়ের সঙ্গে এরপরই আমার যোগাযোগ শুরু হয়ে গেল। সেই পর্বে তাঁরই সহযোগিতায় আমার রাজনৈতিক পড়াশোনা তুলনাগতভাবে বেড়ে গেল। ‘শোধনবাদ’ কী কিছুটা বুঝতে শুরু করলাম। সংযুক্ত পার্টি কিছুদিনের মধ্যেই ভাগ হয়ে গেল। পার্টির মধ্যে যারা বুদ্ধিজীবী বলে পরিচিত ছিলেন, তাঁরা রয়ে গেলেন পার্টির প্রাচীন পক্ষে, তাঁদের আমরা বলতাম ‘দক্ষিণপন্থী’। আর আমরা রয়ে গেলাম যে পক্ষে তাঁরা পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘বামপন্থী’ কমিউনিস্ট হিসেবে। সেই অংশই ১৯৬৪ সালে সপ্তম কংগ্রেসের মধ্য দিয়ে নতুন পার্টির রূপ নিল – পরবর্তীকালে যে পার্টি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিল।
পার্টি যখন যুক্তপার্টি ছিল, তখন পার্টির অঘোষিত বৌদ্ধিক মুখপত্র ছিল ‘পরিচয়’। পার্টিভাগের পর সেই ‘পরিচয়’-এর কান্ডারিরা দক্ষিণপন্থী রুশপন্থী অংশের সঙ্গেই রয়ে গেল। বাম মনোভাবাপন্নরা ‘পরিচয়’ থেকে বেরিয়ে এসে একটি নতুন পত্রিকা প্রকাশ করতে শুরু করলেন। পত্রিকাটির নাম ছিল ‘নন্দন’। সমীরদার হাত ধরে ঐ ‘নন্দন’ পত্রিকার দপ্তরে আমার আনাগোনা শুরু হল। কয়েকটি ছড়া ও কবিতাও সে পত্রিকাতে প্রকাশিত হল আমার। পরিচিত হলাম অনেক কবি সাহিত্যিকের সঙ্গে। এঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন গল্পকার ও অনুবাদক সত্য গুপ্ত এবং সমীরদার প্রিয় বন্ধু কবি কমলেশ সেন। কমলেশ সেন সম্পাদিত কবিতাপত্র ‘কর্ণিক’-এও আমার ছড়া-কবিতা প্রকাশিত হল। উত্তরপাড়া কলেজে পড়ার সময় আমি ‘সৃজন সেন’ নাম ব্যবহার করা শুরু করেছিলাম। পরবর্তীকালে প্রথম প্রথম দু’নামেই আমার লেখা ছাপা হত। ধীরে ধীরে আমার আসল নামটাই হারিয়ে গেল। আমি সৃজন সেন নামেই পরিচিত হতে শুরু করলাম। এখন আমি পুরোপুরি সৃজন সেন।
‘নন্দন’ পত্রিকাকে ঘিরে সেদিন যাঁদের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম, কিছুদিনের মধ্যে উপলব্ধি করলাম, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন বিভাজিত নতুন পার্টির সঙ্গে থাকলেও তাঁরা সে পার্টিকে সঠিক বিপ্লবী পার্টি ভাবতে পারছেন না। যেদিন ময়দানে বিশাল সমাবেশ করে নতুন পার্টি গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়েছিল, সেদিন মিছিল করে ময়দানের দিকে যাবার পথে একজন একটা ছোট্ট লিফলেট আমার হাতে গুঁজে দিয়ে মুহূর্তে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। রাতে বাড়ি ফিরে সেই লিফলেটটিতে চোখ বোলাতে গিয়ে দেখলাম তাতে বলা হয়েছে, যে পার্টি গঠিত হল, তার সঙ্গে পার্টির দক্ষিণপন্থী অংশের তফাৎ সামান্যই। এই নেতৃত্বের অধিকাংশই সংসদীয় পথের উমেদার। কিন্তু দেশ এখন বিপ্লবের জন্য পরিপক্ব। সেই বিপ্লব সাধনের জন্য আমাদের নতুন সংগঠন ও নতুন পথের অন্বেষণ করতে হবে। নতুন পার্টির নেতৃত্বকে ঐ লিফলেটের রচয়িতারা ‘নয়া সংশোধনবাদী’, অর্থাৎ নতুন ধরনের এক সংশোধনবাদী গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করলেন।
সবে নতুন পার্টি গঠিত হয়েছে। আমার ও আমাদের মধ্যে নতুন ধরনের উন্মাদনা। পার্টির সান্ধ্য পত্রিকা বিক্রি করে আমি পার্টির তরফ থেকে একটা সিল্কের কাস্তে হাতুড়ি আঁকা লাল পতাকা উপহার পেয়েছি। সেই সময় ঐ লিফলেটের রচয়িতাদের আমার কাছে উৎপাত বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারলাম সমীরদাও ওই নতুন ভাবনার মানুষদের দলে। একটা রাজনৈতিক বিহ্বলতা আমাকে গ্রাস করল।
(চলবে)
