
মিটিং-মিছিল, নানা স্লোগানে ঘেরা শৈশব
মা পূর্ববঙ্গে বাড়ি-ঘর-জমি-জমা বিক্রি করে যা কিছু নিয়ে এসেছিল, তার প্রায় সবটাই বাবার চিকিৎসা, প্রায়শ্চিত্ত এবং সবশেষে শ্রাদ্ধাদি কাজে খরচ হয়ে গেল। সামান্য যে ক’টি টাকা ছিল, তা দিয়ে হুগলি জেলার বৈদ্যবাটির উত্তরপ্রান্তের চাঁপদানিতে চার কাঠা জমি কিনল দাদা। সেখানে আমার বড়ো মামার বড়ো ছেলে আগেই বাড়ি করে একটা ডেরা বেঁধেছিলেন। দাদা সেই বাড়ির কাছেই চারকাঠা জমি কিনল ধান খেতের ধারে। তারপর ষোলোশো টাকা রিফিউজি লোন নিয়ে টিনের চালা ও পাঁচ ইঞ্চি ইটের গাঁথনি দিয়ে দু’খানা ঘর তুলে আমাদের সবাইকে নিয়ে বৈদ্যবাটি চলে এল। টালির চালা দেওয়া একটা ছোটো পায়খানা ও একটি রান্নাঘরও ক’দিন পরে তৈরি হয়ে গেল। রান্নাঘরের মাঝখানে পার্টিশান দিয়ে দু’ভাগ করে নেওয়া হল। বাঁ দিকের অংশে মায়ের জন্য ‘বিধবা রান্নাঘর’। ডান দিকের অংশে বৌদির রান্নাঘর। মায়ের ঘরে মাছ-মাংসের প্রবেশ নিষিদ্ধ। মাছ-মাংস হাতে নিয়ে কেউ মাকে ছুঁইয়ে দিলে মাকে স্নান করে আসতে হত। একাদশীর দিন মার উপোস থাকত।
আরও পড়ুন
‘শ্রাদ্ধ হইয়া গেলে বাবার ভূত আর আইব না’
টেমার লেন তথা কলেজ স্ট্রিট তথা কলকাতা ছেড়ে ষোলো মাইল দূরের গ্রামে আমরা নতুন ঠাঁই গাড়লাম বটে, কিন্তু কলকাতার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন হল না। দাদাকে রোজই ট্রেনে চেপে কলকাতা যেতে হত। আর আমাদের স্মৃতি জুড়ে ছিল কলকাতার টান। সে কলকাতা মিটিং মিছিলের কলকাতা, পুলিশের লাঠি-গুলির সামনে বুক পেতে লড়াই করার অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ কলকাতা, শহিদ স্মরণে জীবনে মরণে রক্তঋণ শোধ করার প্রতিজ্ঞা নিয়ে মানুষের টগবগ করে ফুটবার কলকাতা। রাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের পর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামে কলকাতা জুড়ে তখন কত আন্দোলন – উদ্বাস্তু আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন, ব্রিটিশ মালিকানাধীন কলকাতা ট্রাম কোম্পানির এক পয়সা ভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, ইত্যাদি কত কী। ক্লাস ফাইভ সিক্সে আমি তখন পড়ি। স্কুলে যাবার ও ফেরার সময় ওই আন্দোলনকারী মানুষগুলোর মিছিলে কতবার কত সময়ে যে আমি হেঁটেছি তার ইয়ত্তা নেই। অনায়াসে মুখস্থ হয়ে গেছে কত শ্লোগান – “আমরা কারা? বাস্তুহারা। বাস্তুহারা করল কারা? গদিতে বসে আছে যারা”, “ট্রামের ভাড়া বাড়ায় কে, ব্রিটিশ কোম্পানি আবার কে”। “ট্রামে ট্রামে চাপব যারা, কেউ দেব না বাড়তি ভাড়া”। “শহিদের রক্ত, হবে নাকো ব্যর্থ” ইত্যাদি।
আরও পড়ুন
ভুল মন্তর পড়া বামুনের মাথায় ঢিল
ট্রামভাড়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় হাফ প্যান্ট পরা আমি ও আমার ক’জন বন্ধু স্কুল থেকে ফেরার সময়ে লাফ মেরে ট্রামে উঠে হাত জোর করে যাত্রীদের বলছি, “বাড়তি ভাড়া দেবেন না। কিছুতেই দেবেন না”। দু’স্টপেজ যাওয়ার পরে ট্রাম থেকে লাফ দিয়ে নেমে আবার পরের ট্রামে একই ভূমিকা পালন করেছি। কলকাতার পথে পথে প্রতিবাদী যেসব মিছিল তখন বেরোত, তার প্রায় সব কটায় ছিল লাল পতাকা আর লাল ফেস্টুনের আধিক্য। সে পতাকায় আবার বেশি ছিল কাস্তে হাতুড়ি তারার অঙ্গসজ্জা। লালের দলে ছিল কমিউনিস্ট পার্টি, ফরোয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, মার্কসবাদী ফরোয়ার্ড ব্লক, ওয়ার্কার্স পার্টি ইত্যাদি। কংগ্রেসিদের পতাকায় তখন থাকত চরকা মার্কা। কংগ্রেসিদের ওই বয়সেই আমরা দেখতে পারতাম না। কংগ্রেসিরা তখন ছিল শাসকপক্ষের, সরকারপক্ষের। তাদের সরকারই তখন প্রতিবাদী মানুষের ওপর লাঠি-গুলি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ত। গুলি করে মানুষ মারত। আমার দাদা-টাডা সকলেই তখন কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। আমিও সেই শৈশব বয়সেই কেমন করে জানি আমার লাল পতাকার প্রতি, কমিউনিস্ট সরকারের প্রতি পক্ষপাত গড়ে উঠেছিল। ‘ইনকিলাব’ বলেই ‘জিন্দাবাদ’ বলতে হয়, তা আমি জেনে গিয়েছিলাম। আর ‘বন্দেমাতরম্’ শ্লোগান শুনলেই আমি ও আমার সমবয়স্ক বন্ধুরা প্রত্যূত্তরে বলে উঠলাম, “গাঁজা খেয়ে মাথা গরম”।
একবার কলেজ স্ট্রিট মোড়ে কারা যেন ট্রামে আগুন ধরিয়ে দেয় আন্দোলনের জঙ্গি উত্তেজনায়। পুলিশ লাঠি মারতে মারতে মানুষকে তাড়া করে টেমার লেনে ঢুকে পড়ে। আমাদের বাসা বাড়িটা ছিল ২০বি নম্বর টেমার লেনে – তার দু’বাড়ি পরেই ট্রাম লাইন। আমাদের ঘরের সঙ্গেই ছিলেন এক টুকরো ছাত – রাস্তার দিকে। সেই ছাতা থেকে একটি আধলা ইট আমি ছুঁড়ে মারি লাঠি উঁচিয়ে গলিতে ঢোকা পুলিশের দিকে। একজন পুলিশের মাথায় তা লাগে। পুলিশটি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েন। কিছু পুলিশ ওপর দিকে তাকিয়ে খুঁজতে চেষ্টা করে – কে বা কারা মারল ওই ইটের টুকরো। দাদা আমাকে কান ধরে টেনে নিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে ঘর বন্ধ করে দেয়। পুলিশরা কিছুক্ষণ পরে ফিরে যায়। পুলিশের বদলে দাদা এক চড় মেরে আমার কানটা লাল করে দিয়ে বলে ওঠে, “পুলিশের গুলি খাইয়্যা মরণের শখ অইছে না!” তাই, কলকাতা ছেড়ে চাঁপদানি বৈদ্যবাটিতে যখন এলাম তখনও আমি কমিউনিস্ট পক্ষপাতে দুষ্ট। আমি কাস্তে হাতুড়ি মার্কা লাল পতাকা আঁকতে পারি। ভোটের সময়ে বলতে পারি, “ভোট দেবেন কীসে? কাস্তে ধানের শিষে”। আমার এক জেঠতুতো দাদা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। তিনি আমাকে একবার বলেছিলেন, “কমিউনিস্ট পার্টি শ্রমিক-কৃষক-গরিব মানুষদের পার্টি। আর আমরা চাঁপদানিতে এসে আমাদের নতুন ঠাঁই বানালাম – সেখানে যাদের বাস, তাদের অধিকাংশই চটকল, সুতোকলের শ্রমিক। কারখানায় ভোঁ আমাদের ঘুম ভাঙায়, আমাদের সময় সচেতন করে। এই শ্রমিক ও শ্রমিক পরিবারের মানুষদের সান্নিধ্যে আমার বড়ো হয়ে ওঠার দ্বিতীয় পর্ব শুরু হয়।
