
সিংহদুয়ারের অনুমতি পেতে লন্ডনে মামলা করেছিলেন শ্রীকৃষ্ণ মল্লিক
গণেশ টকিজের কাছে অনেকগুলো বড়ো বড়ো বাড়ি। ঢের পুরোনো। কারা সেখানে থাকত, কত সালে তৈরি- তা সব ঠিকঠাক জানাও যায় না। বাড়ির বাসিন্দা বদলেছে। চারপাশের পরিস্থিতি বদলেছে। যে পথে পালকি চলত, সেখানে এখন ট্রামলাইনেও জং ধরেছে। শুধু ইমারৎটি রয়ে গেছে। আরো কিছু বছর পরে তাও থাকবে কিনা সন্দেহ।
তেমনি একটি বাড়ি লোহিয়া মাতৃসদন।
যাতায়াতের সময় এই বাড়ি নিশ্চিত চোখে পড়বে। এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। বিশাল হলুদ রঙের বাড়ি। লোহিয়া মাতৃসদন। চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবেই এর পরিচিতি। এবং এই পরিচিতিটিও বেশ পুরোনো। অবশ্য আজ মাতৃসদনের দরজা বন্ধ। হয়তো অন্যকিছু হবে সেখানে। জানা নেই। দুপুর রোদে বড়ো উজ্জ্বল দেখায় বিশাল এই বাড়ি। গেটের মাথায় পাহারা দিচ্ছে স্বয়ং পশুরাজ সিংহ। সিংহদুয়ার বোধহয় একেই বলে। তারপর শুরু হয় বিশাল একটা উঠোন। তার চারধার জুড়ে দু-বাহুর মতো বিস্তৃত বাড়িটির শাখা-প্রশাখা। আর উঠোন থেকেই অনেকগুলো সিঁড়ি উঠেছে বাড়িটির একতলায়। গ্রিক মন্দিরের মতোই এই বাড়ির সম্মুখ ছাদটি। যেন উলটে রাখা একটি বই। আর সেখান থেকে নিচে নেমেছে, ডোরিক রীতির অনেকগুলি থাম। সেই কলকাতার গড়নের সঙ্গে তাল মেলানো কাঠামো এই পেল্লায় বাড়ির। রাজকীয়।
রাজত্বের দিন বয়ে গেছে। আর, এই দেশের গরিব-গুর্বো মানুষগুলো তো চিরকালই রাজার উচ্ছিষ্ট। তেমনই কিছু পথবাসী মানুষের আস্তানা হয়েছে এখন ওই ছাদটি। তাদের ময়লা ছেঁড়া ন্যাতা মেলা এদিকসেদিক, খড়কুটোর মতো। সিঁড়িতে পথশিশুদের খেলাঘর। দৃষ্টিশোভন নয় মোটেই। কিন্তু, একদিকে ভালোই। যারা কোনোদিন প্রাসাদে থাকার অধিকার পাবে না, কোনো একভাবে এও তো প্রাসাদীয় স্বাদ নেওয়া।
কার ছিল এই বিশাল প্রাসাদটি? মাতৃসদন তো পরের যুগের কথা।
“কালের অনন্ত লীলা নাহি বোঝা যায়।
কালের প্রভাবে দেখ কিবা শোভা পায়
শ্রীকৃষ্ণ মল্লিকের এই প্রাসাদরতন।
হল আদি প্রদ্যুম্নের লীলানিকেতন।”
এই বাড়ির পৈঠার ধাপে নাকি একসময় লেখা ছিল এই পয়ারি ছত্রগুলি। বাড়িটি যে একদা মল্লিক বাড়ি ছিল– তার প্রমাণ দেয় এই ছত্রগুলি। শ্রীকৃষ্ণ মল্লিকের সাহস, বাবুয়ানি সবই ছিল আকাশছোঁয়া। বিশাল বাড়ি বানানোর পরেও আশ মেটেনি। ঠিক করলেন, লাটসাহেবের সিংহদুয়ারের মতো হবে তাঁর বাড়ির সদর দুয়ার। কিন্তু অনুমতি মিলল না আদালতের। লাট সাহেব আর বাঙালিবাবু কি সমমর্যাদার? শ্রীকৃষ্ণ মল্লিক লন্ডনের প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত দৌড় দেন। জেতেনও। সিংহদুয়ার গড়েই তবে শান্ত হন। একজন সিংহদুয়ার গড়ার অনুমতি পেতে মামলা চালাচ্ছেন কালাপানির ওইপারের বিলেতে! নিছক বাবুয়ানি দিয়ে একে ব্যাখ্যা করা মুস্কিল। অর্থের আর ক্ষমতার দেমাক, লালমুখো লাটসাহেবের সমান হয়ে ওঠার আকাঙ্ক্ষা—যাই হোক না কেন, এইসব গপ্প শহরের ইতিহাসকে আরো রঙিন করে।

তবে, সুখ সইল না বেশিদিন। বিপর্যয় নেমে এল। অর্থের অভাবে হরেন্দ্রকৃষ্ণ শীলকে বাড়ি বিক্রি করে দিতে বাধ্য হলেন। মাতৃসদন হওয়ার আগে অবধি বাড়িটি হরেন শীলের বাড়ি হিসেবেই পরিচিত ছিল। সুবর্ণবণিক সমাজের কৃতি মানুষ হরেন শীল। উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে বিশেষ পারদর্শী। বাংলাভাষায় লিখতেন খেয়াল সঙ্গীত। কথা, সুর দুটোই দিতেন। তাঁর ছেলে উমাপতি ছিলেন সেতারবাদক ও কীর্তনীয়া। শ্রীরাধাদামোদর কীর্তন সমাজের কাণ্ডারি ছিলেন তিনি। হরেন শীলের আমলে অনেক বড়ো বড়ো সঙ্গীতকারদের আনাগোনা থাকত সেখানে। দিলীপ কুমার মুখোপাধ্যায়, গঙ্গানারায়ণ চট্টোপাধ্যায় প্রমুখের পায়ের চিহ্ন মিশে আছে এই বাড়ির ধুলোয়। অর্থাৎ শুধু অর্থ, প্রতিপত্তির দিকে ছুটে যায়নি শীল পরিবার। তাকে ছাপিয়ে অন্য এক জীবনের খোঁজ ছিল।
তবে, হরেন শীল ও তার পরিবারও বেশিদিন সেই বাড়ির মালিকানা ভোগ করেনি। শ্রীকৃষ্ণ মল্লিকের বংশধর প্রদ্যুম্ন মল্লিক ফের সেই বাড়ির দখল নেন। একবাড়ি, তার বাসিন্দা অনেক। আর পরবর্তীকালে তা হয়ে গেল মাতৃসদন। আরো অনেকগুলো প্রজন্মের সাক্ষী।
বর্তমানে সেটাও বন্ধ।
সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘরের কথা খুব মনে পড়ে যায়। পাথুরিয়াঘাটা থেকে শুরু করে জোড়াসাঁকো, বাগবাজার, শ্যামবাজার, শোভাবাজার– জুড়ে একদা যে বাঙালিবাবুদের রাজত্ব ছিল, তার ছিটেফোঁটাও আর বেঁচে নেই। বেঁচে না থাকাটাই হয়তো সত্য। তবু মনে হয়, বাঙলির বাবুয়ানিটা তার একটা পথহারানোর গল্প। ব্রিটিশের সঙ্গ, ঔপনিবেশিক শাসন– সবকিছু মিলিয়ে নিজেদের যাপন থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছিল নীলরক্তের মানুষগুলো। তাতে একটা প্রাথমিক ফুলে-ফেঁপে ওঠা ছিল। চোখ ধাঁধানো জৌলুশ ছিল। কিন্তু তা ধরে রাখার কৌশল তাঁরা রপ্ত করতে পারেনি। হতে পারে তার একটা কারণ, জীবনকে অন্যভাবে দেখতে চাওয়ার ইচ্ছেটা, খোঁজটা। তাই সে ভোগ করেছে যেমন, খুইয়েছে তার ঢের বেশি। এটা পরিহাস হতে পারে। তবে মনে হয়– এই হারিয়ে ফেলাটাই মধ্যেই জাতিটার নিজস্ব গতিশীলতা।
আর ভেঙে যাওয়াটাই যখন গন্তব্য, তখন তার খড়কুটোকে খানিক রক্ষার চেষ্টা এই ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে। ক্ষয়ে যায় যা, ইতিহাস লেখার দরকার পড়ে তারই। বাড়িটির কাঠামোয় অবশ্য এখনো ক্ষয় ধরেনি। সিংহদুয়ারের সিংহ অবশ্য জানে এই ক্ষয়রোগের ইতিহাস। তার চোখের সামনেই গোটা শহরটা বদলে গেল বেবাক।
ছবিসূত্রঃ https://commons.wikimedia.org/wiki/File:Lohia_Matri_Seva_Sadan_Straight_view.jpg
