দেবেন্দ্রনাথের প্রস্তাব শুনে রামকৃষ্ণ বললেন “আমি বাবু সাজতে পারবুনি”

রামকৃষ্ণ তখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখতে গিয়েছিলেন

ব্রাহ্মসমাজের সঙ্গে রামকৃষ্ণের সম্পর্ক নিয়ে বহুসময় বহু চর্চা হয়েছে। স্বয়ং রামকৃষ্ণ বলেছেনঃ

“এদানির ব্রাহ্মধর্ম যার ছড়াছড়ি

তারেও বারবার নমস্কার করি।।” 

‘ছড়াছড়ি’ শব্দে তখনকার দিনে প্রচলিত একটু ক্ষুদ্র তাচ্ছিল্য লুকানো রয়েছে, তবে রামকৃষ্ণ সেটিকেও ‘নমস্কার’ করেছেন। ব্রাহ্মসমাজের নেতা কেশবচন্দ্র সেনের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতার কথাও প্রায় সকলেই জানেন। প্রায়ই দেখা করতেন তাঁরা। কেশবের মৃত্যুর কিছু আগে রামকৃষ্ণ কেশবের কাছে গিয়েছিলেন। কেশব রামকৃষ্ণকে এতই শ্রদ্ধা করতেন যে, তাঁর পদধূলি নিতেন। ব্রাহ্মসমাজের অন্যান্য প্রধান ব্যক্তিরাও রামকৃষ্ণের কাছে যেতেন; বিশেষত, শিবনাথ শাস্ত্রী ও বিজয়কৃষ্ণ প্রায়ই যেতেন। নরেন্দ্রনাথ দত্ত ‘বিবেকানন্দ’ হওয়ার আগে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে যাতায়াত করতেন। একবার বিজয়কৃষ্ণ রামকৃষ্ণের শ্রীচরণ বুকে ধরে আকার-ইঙ্গিতে বলতে চেয়েছিলেন—রামকৃষ্ণ ভগবানের অবতার। রামকৃষ্ণ তখন মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দেখতে গিয়েছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ তাঁকে বাৎসরিক উৎসবে যোগদানের আমন্ত্রণ জানান, সেইসঙ্গে ঠিকঠাক পোশাক পরে আসতে অনুরোধ জানান। তাঁর এ প্রস্তাব শুনে রামকৃষ্ণ বলেনঃ

“আমি বাবু সাজতে পারবুনি।”

পরে দেবেন্দ্রনাথ চিঠি পাঠিয়ে নাকি বলেছিলেন, রামকৃষ্ণকে সভাস্থলে আনা উচিৎ হবে না। দেবেন্দ্রনাথ ধর্মপ্রাণ ছিলেন ঠিকই, তবে একই সঙ্গে তিনি কলকাতার অভিজাত ভদ্রসমাজের মানুষও। সভায় বহু সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি থাকবেন—সেখানে এমনকি এক পরমহংস পর্যন্ত যদি পরিষ্কার সাদা জামাকাপড় পরে না আসেন, নিতান্ত বেমানান হয়ে দাঁড়াবে। যিশুকেও যেকারণে ‘হাউস অফ লর্ডস’-এ বসতে দেওয়া হয়নি।

তা এক দিক দিয়ে ভালোই হয়েছে, আমাদের পোষাক পরিহিত ভদ্রসমাজের চেহারা তাতে অনাবৃত হয়েছে। প্রকৃত জ্ঞানী, সত্যবাদী, স্পষ্টবাদী সৎ ‘মানুষ’ নিজেকে নিয়ে বা পোষাক নিয়ে ভাবেন না, তাঁদের ভাবনা জগৎসংসার নিয়ে, জীবনবোধ নিয়ে, দর্শন নিয়ে। যেকারণে, পোষাক পরা মানুষদের মানবিক আদর্শ হয়ে ওঠেন তাঁরা। যেকারণে, তাঁরা মনীষী, ‘মানুষ-ঈশ্বর’।একবার, কেশবের জামাতা, কুচবিহারের মহারাজা নৃপেন্দ্রনারায়ণ ভূপের ছোট একটি স্টীমারে বাহ্ম প্রচারক-সহ  আরো কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে, দক্ষিণেশ্বর থেকে ভাগনে হৃদয়কে নিয়ে উঠলেন রামকৃষ্ণ। তিনি এবং কেশব পরস্পরকে করজোড়ে একেবারে নত হয়ে নমস্কার করলেন। রামকৃষ্ণের চুল এলোমেলো, আঁচড়ানো হয়নি, কাঁচাপাকা দাড়ি, চোখ আধবোজা-আত্মমগ্ন। ঠোঁট অল্প স্থূল, নিচের ঠোঁট একটু শিথিল, তার ফলে সামনের দাঁত দেখা যায়। লালপাড় ধুতি পরনে, গায়ে খাটো শার্ট, বোতাম খোলা। পায়ে জুতো নেই। তবে অন্য ক্ষেত্রে তাঁকে চটি বা জুতো পরতেও দেখা যেত। রামকৃষ্ণ কুঞ্চিত চোখে সবার দিকে একবার ভালো করে দেখে নিলেন—দেখলেন সকলের দৃষ্টি ভালো। তারপর তাঁর নজর পড়ে স্টীমারের ওপর বসে থাকা ইউরোপীয় পোষাক-পরা যুবকটির ওপর। রামকৃষ্ণ জিজ্ঞেস করলেনঃ “ওটি কে?” কেশব আন্দাজে উত্তর দেনঃ “ও বোধহয় সদ্য ইংল্যান্ড থেকে ফিরেছে।” “ঠিক ঠিক”—রামকৃষ্ণ বললেন “জানোই তো, সাহেব দেখলেই ভয় ধরে যায়!” একথা শুনে সকলেই হেসে লুটোপাটি।

রামকৃষ্ণ রসিকজন, কথাটি রসিকতার সুরেই বলেছিলেন, কিন্তু তার রসিকতার ভিতরেও থাকতো গূঢ় তাৎপর্য-দর্শন। প্রতিটি কথাই শিশুবৎসল সারল্যে বলতেন। বিবেকানন্দ বলেছেন, রামকৃষ্ণের কাছে তাঁর প্রধান ঋণ—নির্ভয় সত্যকথনের সামর্থ্য। আমরা জানি, রামকৃষ্ণ প্রত্যেক মানুষকে তাঁর নাম ধরে ডাকতেন। আর যদি কারো মধ্যে হামবড়াই ভাব দেখতেন, প্রকাশ্যেই তাকে গাল পাড়তেন। ধর্মবোধে, স্বতঃপ্রজ্ঞায় এবং আত্মশাসনে তিনি নিতান্ত নম্র, কিন্তু অকারণ চাপল্য কিংবা দম্ভ তাঁর ধারে কাছে ঘেঁষতে পারত না। তিনি আজীবন বলে গিয়েছেন- নাম বহু, কিন্তু সত্য এক। এই হল ধর্মক্ষেত্রে গণতন্ত্র, প্রত্যেকের সমমর্যাদা, প্রত্যেকের সমান অধিকার।

“যত মত তত পথ”

 

তথ্যসূত্রঃ

উদ্বোধনঃ শতাব্দীজয়ন্তী নির্বাচিত সঙ্কলন

রামকৃষ্ণ পরমহংস, সৈয়দ মুজতবা আলি

রামকৃষ্ণ পরমহংস, নগেন্দ্রনাথ গুপ্ত

 

Developed by DXDasia