শীতলপাটি : অবসর-আড্ডা-উৎসবে বাঙালির সুখ-দুঃখের পুরোনো সঙ্গী

এক সময় নিত্য প্রয়োজনে বাঙালি-ঘরে এর বিকল্প ছিল না

বাঙালি তিন অস্ত্রে গরমের সঙ্গে লড়াই করে এসেছে, তালপাতার পাখা, মাটির কুঁজো আর শীতলপাটি। কালের নিয়মে সে অস্ত্রগুলো আজ ম্লান। আধুনিকতা তাদের ‘মায়ার জঞ্জাল’-এ পরিণত করেছে; কিন্তু মুকুলের দুষ্টু লোকের মতো সত্যি সত্যিই কি শীতলপাটি ভ্যানিস হয়ে গেছে? না, একেবারেই না। ব্যবহার কমেছে। বঙ্গদর্শন.কম-এর জন্যে ক্ষেত্র-সমীক্ষা করতে গিয়ে বুঝলাম, যতদিন বাঙালির লোকাচার, রীতি-রেওয়াজ, শিল্পবোধ ও শৌখিনতা থাকবে ততদিন বেঁচে থাকবে শীতলপাটি।  

আবহমান বঙ্গ-সংস্কৃতির অঙ্গ এই শীতলপাটি নিয়ে ছোটোবেলার বহুশ্রুত ঘুমপাড়ানি ছড়ার কথা মনে পড়ে? 

ঘুমপাড়ানি মাসি পিসি ঘুমের বাড়ি যেয়ো।
বাটা ভরে পান দেব, গাল ভরে খেয়ো।।
শান-বাঁধানো ঘাট দেব, বেসম মেখে নেয়ো।
শীতলপাটি পেড়ে দেব, পড়ে ঘুম যেয়ো।।

এই ছেলে ভোলানো ছড়ায় আঁকা হয়েছে পল্লি-বাংলার ছবি। তার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবেই উঠে এসেছে শীতলপাটি।  সন্তানের চোখে ঘুম এনে দিলে, মা-ঠাকুমারা ঘুমপাড়ানি মাসি পিসিকে শীতলপাটি দেবেন বসার জন্য।

অতিথি আপ্যায়নে এসেছে শীতলপাটির প্রসঙ্গ-

‘কুটুম এলো, কুটুম এলো, ঝেড়ে ধুলো-মাটি। 
দাও বিছিয়ে চিকন বেতে তৈরি শীতলপাটি।’ 

আবার, পাত্রপক্ষের কাছে ঘরকন্যায় পটু মেয়ের প্রশংসা করে বলা হত-
‘আর মাছ বানাইতো কন্যা, লয় ছালি-মাটি। 
ইলিশ বানাতো কন্যা, বিছায় শীতলপাটি।’

সত্যেন্দ্রনাথ দত্তর ছন্দেও বাঁধা পড়েছে শীতলপাটির কথা-
‘চন্দনেরই গন্ধ ভরা,
শীতল করা ক্লান্তি হরা
যেখানে তার অঙ্গ রাখি
সেখানটিতেই শীতলপাটি।’

নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, তাঁর ঘোড়া কবিতায় শীতলপাটির কথা উল্লেখ করেছেন এইভাবে- 
‘এই নে, তোকে দিলুম বাড়ি, নতুন খড়ে ছাওয়া,
দিলুম আগরতলার শীতলপাটি।’
কেবল ছড়া বা কবিতায় নয়, শীতলপাটি জড়িয়ে গিয়েছে ইতিহাসের সঙ্গেও। সুবে বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁ যাবেন ঔরঙ্গজেবের সঙ্গে দেখা করতে। কিন্তু চিন্তায় পড়লেন সম্রাটের জন্য কী সওগাত নিয়ে যাবেন। অগত্যা অনেক ভেবেচিন্তে দিল্লির বাদশাহের জন্যে বাংলার নবাব নিয়ে গেলেন শীতলপাটি। উপহার পেয়ে বেজায় খুশ আলমগীর! শোনা যায়, ওই শীতলপাটি পেতে সম্রাট নামাজ পড়তেন। রানী ভিক্টোরিয়াও শীতলপাটিতে মজে ছিলেন। নবদ্বীপের বৈষ্ণবরা আবার গরমকালে রাতে আরাধ্য দেবতাকে শয়ন দেওয়ার সময় শীতলপাটি পেতে দেন। এহেন জনপ্রিয় জিনিস আস্তে আস্তে হারিয়ে যেতে বসেছে।

এপার বাংলা এবং ওপার বাংলা, দুই বাংলাতেই শীতলপাটি বোনা হয়। পশ্চিমবঙ্গে শীতলপাটি উৎপাদনের ভরকেন্দ্র হল গোটা কোচবিহার জেলা। কোচবিহার-এক ব্লকের ঘুঘুমারি পঞ্চায়েতের সীমানায় অবস্থিত পানিশালা গ্রামে প্রতি সোম ও বৃহস্পতিবারে শীতলপাটির হাট বসে। তবে নির্দিষ্ট করে বললে, কোচবিহারের ধলুয়াবাড়ি শীতলপাটির জন্য বিখ্যাত। বিপুল সংখ্যক শীতলপাটি-শিল্পী এখানে থাকেন। পাটি বুনেই তাঁদের দিন গুজরান হয়। পাটির প্রধান উপাদান বেত গাছ এখানে জন্মায়। স্বভাবতই এখানে পাটি শিল্প বিকশিত হয়েছে। 

বেত গাছ কেটে, খানিক শুকিয়ে তা থেকে ছাল ছাড়িয়ে নেওয়া হয়। সেই ছাল আরও ভালোভাবে শুকিয়ে পাটি বোনা হয়। আবার বেতের ছাল সিদ্ধ করে, তারপর তা শুকিয়ে পাটি বোনা হয়। রঙিন পাটিগুলোর ক্ষেত্রে বেতের ছাল ভাতের মাড় আর রঙ দিয়ে সিদ্ধ করা হয়। একেবারে ঘন করে বোনা হয়। ঘন বুনোট শীতলপাটিকে গরমকালে আরামদায়ক করে তোলে। মূলত মহিলারাই পাটি বোনেন বেশি। অনেকেই বংশানুক্রমে পাটি বোনার কাজ করেন। কোচবিহার ছাড়াও, দুই দিনাজপুর, মুর্শিদাবাদ, নদিয়া, দুই বর্ধমানের অনেকে জায়গাতেই শীতলপাটি বোনার পেশায় নিযুক্ত মানুষরা বসবাস করেন বা করতেন। লকডাউন পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকজন পেশা বদল করেছেন, এমন নজির রয়েছে। এক একটি শীতলপাটি বুনতে চার থেকে পাঁচ দিন করে সময় ব্যয় হয়। কারিগররা পাটি পিছু কমবেশি একশো থেকে দেড়শো টাকা পান। কাঁচামালের খরচ আর বিক্রিয় মূল্যের মাঝে, ওটুকুই তাঁদের লাভ।

এখন বেতের ছাল দিয়ে অর্থাৎ পাটি দিয়েই আসন, টুপি, জুতো, হ্যান্ড ব্যাগ, লেডিস ব্যাগ, ফুলদানি, ল্যাম্প শেড, কোস্টার ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে কিন্তু তা কি পাটি শিল্পকে পুরোদমে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে?

বাংলাদেশে পাটির অজস্র প্রকার ভেদ থাকলেও, এই বঙ্গে প্রধানত মোটা ও সরু দুই বুনোটের পাটি পাওয়া যায়। তবে নকশা করা পাটিও বোনা হয়, নানান ধরনের ও নানা রঙের নকশা পাটির শোভা আরও বাড়িয়ে তোলে। সেগুলোর দাম অবশ্য অনেকটাই বেশি হয়। কিন্তু সবই পাইকারি ও খুচরো বিক্রেতাদের জন্য, উৎপাদক অর্থাৎ শিল্পীর হাতে খুব সামান্য অর্থই পৌঁছয়।গ্রাম-শহর নির্বিশেষে গ্রীষ্মে শীতলপাটি বিছিয়ে ঘুমোনোর স্মৃতি আজও অনেকের মনে তাজা। আটের দশকের পর থেকে শীতলপাটির চাহিদা ক্রমশ কমতে থাকে। গ্রাম-গঞ্জে এখনও কিয়দাংশে এর চাহিদা থাকলেও  শহর ও শহর সংলগ্ন শহরতলিতে চাহিদা নেই বললেই চলে। কিন্তু কেন বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে শীতলপাটি? উত্তর একটাই, অসম-প্রতিযোগিতা। প্লাস্টিকের তৈরি মাদুর যেখানে দুশো-আড়াইশো বা খুব জোর তিনশো টাকায় মেলে সেখানে সাধারণ মানের শীতলপাটি কিনতে খরচ হয় কমপক্ষে আটশো থেকে সাড়ে আটশো টাকা। প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে তৈরি বলে যত্ন করে ব্যবহার করতে হয় না হলে তাড়াতাড়ি নষ্ট হয়ে যায়। আবার, ‘আধুনিক’ নয় মনে করে অনেকেই ত্যাগ করেছে শীতলপাটি ব্যবহার।

হাল আমলে শীতলপাটির পুরো ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে আছে বিয়ের মরশুমের উপর ভিত্তি করে। বিয়েতে মেয়ে-জামাইকে শয্যা দেওয়ার নিয়ম, সেই কারণে খাট, বালিশ, তোষকের সঙ্গে শীতলপাটি দেওয়ার রীতিটিও চলে আসছে। বলা হয়, শত অভাবী কন্যাদায়গ্রস্থ পিতা কিছু পারুক আর না পারুক মেয়েকে বিয়ে শীতলপাটি দেবেনই। ফলে বিয়েকে কেন্দ্র করেই যা বিক্রি হয়। অন্তত শহরে শীতলপাটি বিকিকিনির বর্তমান ছবিটা এমনই। বেডিং দোকানগুলো সাফ বলছে, বিক্রি হয় না, তাই রাখি না। এতো দাম দিয়ে কেনার লোক নেই। কিন্তু দশকর্মার দোকানগুলিতে আজও মিলছে শীতলপাটির দেখা।  সোদপুরের লোকনাথ দশকর্মা ভাণ্ডারের দেবনারায়ণ চন্দ্র বলছেন, “এখন কেবল বিয়ের সিজনেই শীতলপাটি বিক্রি হয়।” কোচবিহার থেকে তাঁরা মাল কেনেন। দেবনারায়ণবাবুদের দোকানে ৫/৭ এবং ৬/৭ খাটের মাপের শীতলপাটি পাওয়া যায়। (পাঁচ ফুট বাই সাত ফুট এবং ছয় ফুট বাই সাত ফুট) দু’টির দাম যথাক্রমে ৮৫০ টাকা ও ৯৫০ টাকা। শীতলপাটির চাহিদা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “চাহিদা নেই বললেই। আগে দাম ছিল ৩০০-৪০০ টাকা। মানুষের নাগালের মধ্যে থাকায়, তা বিক্রি হত। এখন দাম ডবল হয়েছে, সেই কারণে বিক্রিও কমেছে। তবে, হ্যাঁ এরপরও এখনও কিছু কিছু মানুষ ব্যবহারের জন্য শীতলপাটি কিনে নিয়ে যান। শৈল্পিক ও প্রাকৃতিক জিনিসের কদর যাঁরা জানেন, তাঁরা।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সোদপুর স্টেশন বাজারের এক দোকানি জানান, “আগে বছরে একাধিবার পাটি কিনতে হত, এখন বছরে একবার মাল তুললেই সারা বছর চলে যায়। অনেক সময় তাও শেষ হয় না। এই গরমের সময় প্রচুর বিক্রি ছিল। এত দাম দিয়ে এখন কে কিনবে?” জনৈক ওই দোকানি এক সমস্যার কথা তুলে ধরেন, এই পাটির ব্যবসায় সম্ভবত মধ্যসত্বভোগীদের বাড়বাড়ন্ত হয়েছে। তিনি বলেন, তিনি ও তাঁর পরিচিত একাধিক বিক্রেতা এমনকী কলকাতার বিক্রেতারাও নদিয়ার চাকদহের এক ভদ্রলোকের থেকে পাটি কেনেন। তাঁর কথায়, “কোচবিহারে বোনা পাটি নদিয়ায় স্টক হয়। তারপর খুব ভোরে গাড়ি নিয়ে এসে মাল পৌঁছে দেন কেউ।” বলাবাহুল্য এই বিক্রেতা নিছক পাইকারি বিক্রেতা নন। তবে কি এই জাতীয় দালাল শ্রেণীর কারণে শিল্পীরা প্রাপ্য দাম পাচ্ছেন না? রুগ্ন হচ্ছে শিল্প? প্রশ্ন থেকেই যায়।যদিও বিদেশে শীতলপাটির চাহিদা রয়েছে, ওই দেশের দুষ্প্রাপ্য খাঁটি জিনিসের আবেগ আর শৈশবের মন ভাল করা স্মৃতির জেরে যেটুকু চাহিদা তৈরি হয় আরকি। সেই সুবাদে পাটি রপ্তানি হচ্ছে। এতে ভালো দাম পান শিল্পীরা। পাশাপাশি ঘর সাজানোর সৌখিন দ্রব্য হিসেবে উঠে এসেছে শীতলপাটি। অনলাইনে, বিভিন্ন নামীদামী দোকানে, মির্জা গালিব স্ট্রিটের বেশ কয়েকটি সৌখিন সামগ্রীর দোকানে রঙিন, নকশা করা শীতলপাটি পাওয়া যায়। তবে দামে তা আম জনতার সাধ্যাতীত। এছাড়াও এখন বেতের ছাল দিয়ে অর্থাৎ পাটি দিয়েই আসন, টুপি, জুতো, হ্যান্ড ব্যাগ, লেডিস ব্যাগ, ফুলদানি, ল্যাম্প শেড, কোস্টার ইত্যাদি তৈরি হচ্ছে কিন্তু তা কি পাটি শিল্পকে পুরোদমে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবে? এর উত্তর আমাদের জানা নেই। 

___________________________________
ক্ষেত্র সমীক্ষা ছাড়া তথ্যঋণ: 
নবদ্বীপে গরমে বদলে যায় দেবতার ভোগ ও পোশাক, বর্তমান পত্রিকা
ঠান্ডা-যুদ্ধে হেরেই গেল শীতলপাটি, দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দবাজার পত্রিকা

 

Developed by DXDasia