
১৩৮, মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের ‘ক্ষেত্রকুঠি’ বা এম জি রোডের ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস’
‘চিরস্থির কবে নীর, হায় রে, জীবন-নদে?’ জীবনের বহমানতায় কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়, মাঝে মধ্যেই মধুকবির এই অমোঘ বাণীটি মনে করার সুযোগ ঘটে যায়। এমনকি একটা নির্দিষ্ট নস্টালজিয়াও একসময় মরে যায়। তাই কি?
সম্প্রতি উত্তর কলকাতার বিখ্যাত দুই মেসবাড়ি ‘Visit’ করতে বেরিয়েছিলাম। ১৩৮, মুক্তারামবাবু স্টিট্রের ‘ক্ষেত্র কুঠি’ ও হ্যারিসন রোডের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধি রোড) ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস’। ৪০ থেকে ৯০ দশকের কলকাতা, সেই কলকাতার অন্য জীবন ছিল, দুঃখ ছিল, একান্নবর্তী ছাপোষা আনন্দ ছিল, ভুখা পেট ছিল, অভাব ছিল, রাগ ছিল, ভাগাভাগি – রক্তক্ষরণ ছিল। এখন আমরা সেই কলকাতার জরাজীর্ণ হাড়গোড়ের ভিতর হাঁটাহাঁটি করছি। সেই হাঁটাহাঁটির সূত্র ধরেই একদিন খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম। এম জি রোড মেট্রো স্টেশন থেকে বেরিয়ে মুক্তরামবাবু স্ট্রিট ধরে এগোচ্ছি ১৩৮ নম্বরের খোঁজে। খুঁজছি, খুঁজেই চলেছি কিন্তু পাচ্ছি না। একে ওকে জিজ্ঞেস করলাম। ‘মেসবাড়ি’ বিষয়টা মাথা চুলকে দু-এক জন ধরতে পারলেও ‘শিবরাম’ বা ‘ক্ষেত্রকুঠি’র নাম কখনও শুনেছেন বলে মনে হল না। আমি ভাবলাম ব্যাপারটা আবার প্রেমেন মিত্তিরের ৭২ নম্বর বনমালী নস্কর লেনের ‘ঘনাদা’র মেসবাড়ির মতো না হয়ে যায়! ঠিকানাটা বেহালার হলেও সেখানে আদৌ কোনও বাড়ি-ঘর নেই, কোনও কালেই ছিল না। শুধুই আগাছা-জঙ্গল। পুরোটাই মিত্তির মশাইয়ের মনগড়া।
সে যাই হোক, দমে না গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ অব্যাহত রেখেছিলাম ভাগ্যিস! না হলে কখনই হয়তো ওরকম একটা গলি আবিষ্কার করতে পারতাম না। একটি মাত্র ব্যক্তি আমায় সেদিন ১৩৮ নম্বর ক্ষেত্রকুঠি যাওয়ার পথ চিনিয়ে দিতে পেরেছিলেন এবং ‘১৩৮ নম্বর’ শুনে মুড়ি চিবোতে চিবোতে নিজেই চট করে বলে দিলেন ‘ও বুঝেছি… শিবরামের মেস’। তিনি চেনেন এবং এর আগেও যে তাঁর কাছে এই ঠিকানার খোঁজ এসছে, তা বোঝা গেল। যে রাস্তা দিয়ে তিনি আমাকে যেতে বললেন, তা ছিল দু’জন মানুষ পাশাপাশি হাঁটতে না পারার মতো বেশ লম্বা একটা গলি।

সেই গলি
গলিটার একদম শেষ প্রান্তে পৌঁছে ডানদিকে ফিরলেই সেই বাড়ি – ‘ক্ষেত্র কুঠি’। বাড়িটা নিশ্চিত করতে এক অবাঙালি ভুজিয়া ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম ‘দাদা এটাই কি…’ মুখের কথা শেষ হওয়ার আগেই তিনি- ‘হাঁ হাঁ শিব…’। হা হা হা…পুরো শিব্রামীয় কেস! নিশ্চিন্ত হলাম এবং চিন্তিতও। কী থেকে কী হয়েছে, সেটা বোঝার চেষ্টা করছিলাম।

ক্ষেত্র কুঠি

ক্ষেত্র কুঠির প্রবেশদ্বার

চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে প্রধানত আমহার্স্ট স্ট্রিট, মুক্তারামবাবু স্ট্রিট, কলুটোলা স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, মানিকতলা ও শিয়ালদহ এলাকাতেই ছিল মেসের রমরমা। তার কারণ, পা বাড়ালেই ছিল স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত। বোর্ডাররা হতেন মূলত সদাগরী অফিসের কনিষ্ঠ কেরানী, খুচরো ব্যাবসায়ী, উকিল, মুহুরি, ফেরিওয়ালা, ইন্সুরেন্সের দালাল, ছাত্র, শিক্ষক, অধ্যাপক এবং চাকরীসন্ধানরত বেকার, অভিনেতা, গায়ক, শিল্পী, কবি বা লেখক। অনিশ্চিত জীবন। মেসবাড়ির সামান্য ভাড়াও মাঝে মাঝে বাকি পড়ে যায়। দিনের পর দিনে চেষ্টা চালিয়ে যেতে যেতে কেউ অবশেষে খুঁজে পেতেন কাঙ্খিত ঠিকানা, কেউ বা রণে ভঙ্গ দিয়ে ফিরে যেতেন যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন সেখানে। প্রতিটি মেসবাড়ির নিজস্ব চরিত্র ছিল। মেজাজ, খাওয়া-দাওয়া, শখ-আহ্লাদের বিচারে যতই ব্যক্তিবিশেষের তফাৎ থাকুক না কেন, মাসের পর মাস, বা হয়ত বছরের পর বছর, একই ছাদের নিচে মিলেমিশে থাকার অভ্যাসে অজান্তেই একসুরে বাঁধা পড়তেন বাসিন্দারা। শুধুমাত্র সাহিত্য, সিনেমা বা খেলাধুলো নয়, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও সেকালের শহরে মেসবাড়ির অবদান ছিল যথেষ্ট। স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু খসড়া বহু বিপ্লবীর আস্তানা ছিল কলকাতার মেসবাড়ি। চল্লিশের দশকের দিনগুলোর উত্তেজনা কিংবা স্বাধীনতা-পরবর্তী কলকাতায় সত্তরের দশকের দিন বদলের স্বপ্ন দেখা তরুণদের দল, মেসবাড়ি সাক্ষী ছিল সব কিছুরই। সেসব এখন অতীত – ইতিহাস।

ক্ষেত্র কুঠির অন্দরমহল

হ্যাঁ, যেটা বলছিলাম। ক্ষেত্র কুঠি আর মেসবাড়ি নেই, একটা আস্ত ‘পোড়ো বাড়ি’ হয়ে ধুঁকছে। মূল ফটক থেকে অন্দরে ঢুকে কিছুক্ষণ ‘মানুষ’ খোঁজার চেষ্টা করলাম। সবে ভাবতে শুরু করেছিলাম শিবরামের ভূত ছাড়া কিছুই দেখতে পাব না, হঠাৎ নীচের একটা ঝুরঝরে ‘ডার্ক রুম’ থেকে বেরিয়ে এল এক অল্পবয়সী ছেলে। আঙুলের নির্দেশে উপর তলার সিঁড়ি দেখিয়ে বললো ‘দোতালায় বাবুরা আছে, ওরা জানে।’ দোতলায় উঠেই দেখি পলেস্তারা খসে পড়া একটা ঘর। ঘর না বলে গুদাম ঘর বলাই ভালো। যত্রতত্র বই-খাতা, কাগজ, জামা-কাপড়, বাসনপত্র। তার মাঝে দু’তিনটে বেড। দু'জন ‘বাবু’ শুয়ে শুয়ে মনের সুখে গপ্পো করছিলেন। আমাকে দেখে ভূত দেখার মতো তড়াক করে লাফিয়ে উঠে পড়লেন। ঢোঁক গিলে আশ্বত্ব হয়ে বললেন, ‘শিবরাম এই ঘরেই থাকতেন, এখন আর কিছুই নেই’। আমি তো মনে মনে হাসছি আর ভাবছি, এখানে যা আছে তা চোখে দেখা যায় না, অশরীরী, কিন্তু আছে। ঘরের ছবি তুলতে চাই, এ কথা জানানোর আগেই এমনভাবে হন্তদন্ত হয়ে তাঁরা ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন যেন আগে থেকেই বলা কওয়া ছিল। যেন এই ঘটনায় তাঁরা মোটামুটি অভ্যস্ত। কথা না বাড়িয়ে আমিও নিজের কাজটি সেরে নিই।

এই ঘরেই থাকতেন শিবরাম
তাঁদের থেকেই জানতে পারলাম, শিব্রামীয় মেসবাড়ির সন্ধানে মাঝে মাঝেই আমার মতো মানুষজনের আবির্ভাব ঘটে। তাঁরা বিব্রত হন। কলেজস্ট্রিটে কাজের সূত্রে তাঁরা অল্প টাকায় ভাড়া থাকেন এই বাড়িতে। মানে, ক্ষেত্রকুঠি এখনও মানুষের আশ্রয়স্থল। ভালো লাগছিল ভাবতে, চক্কোত্তি মশাই এই মেসেই খুঁজে পেয়েছিলেন আরাম। যে মেসবাড়ি সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, মুক্তারামে থেকে, তক্তারামে শুয়ে, শুক্তারাম খেয়েই তিনি 'শিবরাম' হয়েছেন। ক্ষেত্রকুঠি থেকে বেরিয়ে পড়লাম কলেজস্ট্রিটের দিকে। সেখানে অপেক্ষা করে আছে শরদিন্দু-জীবনানন্দের ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডি হাউস’।

প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস
কোনও এক দুপুরে হ্যারিসন স্ট্রিটের (বর্তমানে মহাত্মা গান্ধি রোড) প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে শরদিন্দুর ব্যোমকেশের সঙ্গে অজিতের আলাপ। তদন্তের প্রয়োজনে মেসের হট্টরোলেই আত্মগোপনের সুবিধা খুঁজে নিয়েছিলেন ছদ্মবেশী দুঁদে গোয়েন্দা। উত্তর কলকাতার মেসবাড়িগুলোর তখন স্বর্ণযুগ। আবার এই প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ের জানলা দিয়ে ট্রাম দেখার নেশা ছিল জীবনানন্দ দাশের। কানাঘুষো শোনা যায়, এখানেই নাকি খুঁজে পেয়েছিলেন ‘বনলতা সেন’। এই মেসবাড়িটি খুঁজে পেতে কোনও সমস্যা হওয়ার কথা নয়।


ইতিহাস বলছে, আজ যেখানে ‘মহল’ রেস্তোরাঁ রয়েছে, সেখানেই ছিল বিখ্যাত ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং’। মহাত্মা গান্ধি রোড দিয়ে এলে চিত্তরঞ্জন কলেজের ঠিক বিপরীতে। বোডিং হাউস এখন সল্টলেকে স্থানান্তরিত হলেও এই বাড়ির মূল ফটক দিয়ে ঢুকলে আজও জ্বলজ্বল করে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং-এর বোর্ড। ‘স্পেশাল’ অনুমতি ছাড়া প্রাচীন বোর্ডিং হাউসটির ছবি তোলা মানা। ‘মহল’-এর বর্তমান কর্ণধার সন্দীপ দত্তের ঠাকুরদা ১৯১৭ সালে তৈরি করেছিলেন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং। ওপার বাংলা থেকে আসা প্রচুর মানুষ যখন এপারের কলকাতায় আসেন, একবার হলেও ঢুঁ মেরে যান ৬/৩ রমানাথ মজুমদার স্ট্রিট, কলকাতা ৭০০ ০০৯ -এই ঠিকানায়। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলের ঠিক পিছনের গলিতে। এখানেই ‘মহল’ রেস্তোরাঁর প্রবেশদ্বার। এই গলিতেই রয়েছে তপন দার চায়ের দোকান। আড্ডা দিতে আসা পড়ুয়া বা লোকাল মানুষজনদের কথায় ‘তপন দার বয়সের গাছ পাথর নেই।’ দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের বাসিন্দা তিনি, তাঁকে স্থানান্তরিত করা যায়নি।

অতএব, যা বোঝা গেল…সময় বদলে গেছে। মেসবাড়ির সংস্কৃতি বদলে হয়েছে পিজি। অনেক জায়গায় সাবেকি মেস ভেঙে তৈরি হয়েছে আবাসন। তক্তপোষ পরিণত হয়েছে সিঙ্গল বেড-এ। এখন যে ক’টা মেসবাড়ি টিকে আছে, সেগুলোর এই গেল, সেই গেল অবস্থা হলেও তারা এখনও মরে নাই। শীর্ণ শরীর নিয়ে স্মৃতিকাতর বাঙালির জন্য এখনও অপেক্ষা করে থাকে ‘ক্ষেত্রকুঠি’ বা ‘প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস’ । কিন্তু শুরুতেই যেমনটা বলেছিলাম, জীবনের বহমানতায় কোনও কিছুই চিরস্থায়ী নয়। নিয়মমতো মধুকবির সেই অমোঘ বাণী সত্যি করে কলকাতার মেসবাড়িগুলি হয়তো এক এক করে ধ্বসে পড়বে কিন্তু শিবরাম, শরদিন্দু, জীবনানন্দের অমর সাহিত্যে, আগামীর কোনও লেখক-গবেষকের অনুসন্ধানে, বাঙালির সহজাত নস্ট্যালজিয়ার ভিতর যতদিন সম্ভব বেঁচে থাকবে তা।
ছবিঃ মৌনী মণ্ডল
