
সুষ্ঠপ্রচার করলে এলজিবিটিকিউআইএ+ আন্দোলনের পথ মসৃণ হয়
“দোল দোল দুলুনি, রাঙ্গা মাথায় চিরুনি, বর আসবে এক্ষুনি, নিয়ে যাবে তক্ষুনি…”
চোখ ফুটতে না ফুটতে একটি শিশুকে যেনতেনপ্রকারে শিখিয়ে দেওয়া হয় বড়ো হলে তার বিয়ে হবে, তার একখানি বর/ বউ থাকবে, থাকবে শ্বশুরবাড়ি। শারীরিক গঠনে যে শিশুটি কন্যা, তার হাতে তুলে দেওয়া হয় খেলনা বাটি, পুতুল। শারীরিকভাবে পুত্র যে শিশু, সে পায় গাড়ি, বন্দুক ইত্যাদি। খেলনা, জুতো মোজা, ইস্কুলের ব্যাগ, ছাতা, পেন, জলের বোতল, টিফিনবাক্স এমনকি জামাকাপড়েও স্থূল বিভাজন ব্যবহার করা হয় সচেতন ভাবে, “পুরুষ” শিশু পায় নীল রঙা সবকিছু আর “কন্যা”টিকে ধরিয়ে দেওয়া হয় একটা গোলাপি রঙের বোবা পৃথিবী।
কেবল নীল আর গোলাপি রঙের পৃথিবীতে জন্মানোর পর, একটি শিশু উপায়ন্তর না পেয়ে বেছে নিতে বাধ্য হয় যে কোনো একটি রং। অথচ যাদের মনের রং হলদে বা সবুজ বা কমলা বা লাল? সেসব শিশুরা হয় নীল গোলাপি ময়ূর পালক ল্যাজে গোঁজে, না হয় দূরে ছুড়ে ফেলে দেয় এই বায়নারি রাজ্যপাট।
ছোটোচুল, খাটো প্যান্ট, “পুরুষালি” খেলাধুলা করা “মেয়ে”টিকে তখন খাঁচায় বন্দি করে সহবৎ শেখানোর ব্যবস্থা করা হয়। কোমলতনু, ভীরু, মিষ্টভাষ “ছেলে”টিকেও একই খাঁচায় ফেলে সামাজিক গিনিপিগে পরিণত করা হয়। এইসব ডানাছাটার ইস্কুল পার করে মানুষটি আস্ত থাকলে একদিন বেরিয়ে আসেন গায়ে হলুদ বা সবুজ বা কমলা বা লাল ইচ্ছেটা নিয়ে। অন্যথায় ইচ্ছের কফিন বুকে করে এমন এক জীবন যাপন করেন, যে জীবন কোনোদিন তাঁর ছিলই না।
ডানাছাটার ইস্কুলে কারো ডানা থাকা মানা। এই ইস্কুলের সকলে একই পথে হাঁটে, একই গান গায়। সুর একচুল বেসুর হলে টনক নড়ে নীল-গোলাপি ছাইচাপা মানুষদের। তারা উড়তে না জানায়, উড়ন্ত যেকোনো কিছুই তাদের কাছে ভীতিপ্রদক। তাদের নীল ও গোলাপি পৃথিবী উড়তে না পারা ও উড়তে জানা মানুষে আধাআধি ভাগ হয়ে থাকে।
তবু সুচেতন ভট্টাচার্য (Schetan Bhattacharya)-এর সাক্ষাৎকার স্পষ্ট করে যে, আর পাঁচটা প্রতিবেদন পরিবেশনের সময় যেমন কিঞ্চিৎ পড়াশোনার প্রয়োজন পড়ে, ঠিক তেমনই প্রান্তিক যৌনতা সংক্রান্ত খবর পরিবেশনের সময় এলজিবিটিকিউআইএ+ (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ক্যুইয়ার/কোয়েশ্চেনিং, ইন্টারসেক্স, অ্যাসেক্সুয়াল প্লাস) আন্দোলনের পরিভাষা জানার দায়িত্বটুকু পালন করতেই হবে একজন সাংবাদিককে। বাংলার বুকে আজ বহু ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয় প্রান্তিক যৌনতা সম্পর্কিত। এখনও অবধি অনালোচিত এই বিষয় সম্বন্ধে বৃহত্তর সমাজকে ওয়াকিফহাল করা হলে আলো ক্রমে আসিবেই আসিবে। প্রান্তিক যৌনতা সম্পর্কিত অত্যন্ত সাধারণ এবং বহুল ব্যবহৃত শব্দ, যেমন লিঙ্গ, যৌন অভিমুখ, ব্যক্তিগত পছন্দের সর্বনাম, ইত্যাদি বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরু ভার সংবাদ মাধ্যম পালন করলে প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের লড়াই অনেকখানি সহজ হয়।
ফলতঃ প্রতিটি পথ এখানে লড়াইয়ের পথ হয়ে পড়ে। প্রতি পদক্ষেপ এখানে অধিকার অর্জনের জন্য নিতে হয়। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর পুত্র ক্যামেরার সামনে এসে বসলে সে লড়াইয়ের কিছুটা অংশ সামগ্রিক সমাজের চোখে পড়ে যায়, চোখ ঝলসে ওঠে, যেন তারা এক উড়ন্ত মানব দেখে ফেলেছে। সাংবাদিক নিজে “আমরা- ওরা”য় দ্বিধান্বিত হন। অথচ চামড়ার ভিতর আমাদের প্রত্যেকের রং লাল।
ছোটো শিশুকে ভোলানোর ভাষায় যখন তিনি ক্যামেরায় কথা বলে ওঠেন, “তোমাদের সমস্যা,”, “মুখ্যমন্ত্রীর কন্যা”, “নর্মাল”, তখন স্পষ্ট হয় লড়াই কতটা বাকি। সংবাদপত্রে যখন নির্দ্বিধায় লেখা হয় “এলজিবিটিকিউদের”, তখন হাতে পায়ে চিমটি কেটে দেখার ইচ্ছে জাগে, মানুষ তো? না কিম্ভূত কিমাকার এক প্রাণী কোত্থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসেছে পায়ে হাঁটা মানুষদের দুনিয়ায়।
তবু আশা জাগায় সামাজিক মাধ্যমে ভেসে আসা অগণিত শুভেচ্ছা বার্তা। আশা জাগায় বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রুপগুলিতে জেন্ডার এফার্মেটিভ পদ্ধতি সংক্রান্ত প্রশ্নের আড়ভাঙা।
কিছুদিন আগেও যত্রতত্র “হিজড়ে”, “ছক্কা” ইত্যাদি শব্দকে হাতিয়ার হয়ে উঠতে দেখা যেত, রূপান্তরকামী মানুষদের আন্দোলন এসব অস্ত্রকে ভোঁতা করেছে। শব্দগুলি নিজেই ধারালো এবং স্বমহিমায় অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠায় তাদের ভ্রান্ত ব্যবহার হ্রাস পেতে পেতে এখন প্রায় নির্মূল হতে চলল।
তবু সুচেতন ভট্টাচার্য (Schetan Bhattacharya)-এর সাক্ষাৎকার স্পষ্ট করে যে, আর পাঁচটা প্রতিবেদন পরিবেশনের সময় যেমন কিঞ্চিৎ পড়াশোনার প্রয়োজন পড়ে, ঠিক তেমনই প্রান্তিক যৌনতা সংক্রান্ত খবর পরিবেশনের সময় এলজিবিটিকিউআইএ+ (লেসবিয়ান, গে, বাইসেক্সুয়াল, ট্রান্সজেন্ডার, ক্যুইয়ার/কোয়েশ্চেনিং, ইন্টারসেক্স, অ্যাসেক্সুয়াল প্লাস) আন্দোলনের পরিভাষা জানার দায়িত্বটুকু পালন করতেই হবে একজন সাংবাদিককে। বাংলার বুকে আজ বহু ওয়ার্কশপ অনুষ্ঠিত হয় প্রান্তিক যৌনতা সম্পর্কিত। এখনও অবধি অনালোচিত এই বিষয় সম্বন্ধে বৃহত্তর সমাজকে ওয়াকিফহাল করা হলে আলো ক্রমে আসিবেই আসিবে। প্রান্তিক যৌনতা সম্পর্কিত অত্যন্ত সাধারণ এবং বহুল ব্যবহৃত শব্দ, যেমন লিঙ্গ, যৌন অভিমুখ, ব্যক্তিগত পছন্দের সর্বনাম, ইত্যাদি বৃহত্তর সমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়ার গুরু ভার সংবাদ মাধ্যম পালন করলে প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের লড়াই অনেকখানি সহজ হয়। এছাড়াও রয়েছে জেন্ডার এফার্মেটিভ প্রসিডিওর, তৎসংক্রান্ত আইন, অন্যান্য প্রান্তিক যৌনতার মানুষদের জন্য প্রদত্ত সরকারি সুযোগসুবিধা সংক্রান্ত তথ্য সাধারণের নাগালে এনে দেওয়ার মতো আরও নানা দায়িত্ব।
খুচরো মুচমুচে ক্লিকবেইট খবর করার পরিবর্তে রাজ্যের সুদক্ষ সাংবাদিকরা যদি সদিচ্ছায় সুচেতন এবং অন্যান্য প্রান্তিক মানুষের খবরের সুষ্ঠপ্রচার করতে পারেন, এলজিবিটিকিউআইএ+ (LGBTQIA+) আন্দোলনের পথ মসৃণ হয়। এবং গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের থেকে এইটুকু তো প্রত্যাশা করা যেতেই পারে ২০২৩ সালে এসে।
________
মতামত লেখকের নিজস্ব
