সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা : সময়ের তাঁতে বোনা মহাকাব্যিক এক এভিডেন্স

সদ্য আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে পরিমল ভট্টাচার্যের এই উপন্যাস

সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা – ইতিহাসের এমন মহাকাব্যিক উন্মোচন বাংলা সাহিত্যে শেষ কবে দেখেছি আমরা? জাদুময়তার এমন নীরব ব্যাপ্ত ক্যানভাসের সাক্ষী শেষ কবে হয়েছি আমরা? পৃথিবীর সাহিত্য ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত একেবারেই বিরল নয় যে লেখক যখনই উপন্যাসকে আখ্যানের সুগভীর পরিসরে মেলে ধরতে চেয়েছেন সেখানে ঘটনার ঘনঘটা ও চরিত্র সৃষ্টির অনিবার্যতা সমান্তরাল ভাবে লেখকের প্রত্নচেতনাকে মানুষী মুখোশের আড়ালে মূর্ত করেছে। এই ক্ষেত্রে পরিমল ভট্টাচার্যকে গ্যাব্রিয়েল মার্কেজের উত্তরসূরী বলা যায় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা উপন্যাসের যে বিন্যাস তা প্রত্নচেতনা, ইতিহাস প্রজ্ঞা বা পরাবাস্তবতাকে ছাড়িয়ে চলে গেছে এক হাওয়াতাঁতে বোনা স্বচ্ছ মসলিনের মতো প্রাগৈতিহাসিক বিহানের গল্পে। মস্ত একটা ফিকশন ছাড়া আর তো কিছু নয়। শিকড়চ্যুত সংস্কৃতির কারখানায় লেখক নিয়ে এলেন একটি জাতির কালান্তরের চিহ্ন। হাজির করলেন সাতশো বছরের ইতিহাস, জাতিস্মরিক দ্যোতনায়।

পরিমল ভট্টাচার্যকে গ্যাব্রিয়েল মার্কেজের উত্তরসূরী বলা যায় কিনা তা তর্কসাপেক্ষ। কিন্তু সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা উপন্যাসের যে বিন্যাস তা প্রত্নচেতনা, ইতিহাস প্রজ্ঞা বা পরাবাস্তবতাকে ছাড়িয়ে চলে গেছে এক হাওয়াতাঁতে বোনা স্বচ্ছ মসলিনের মতো প্রাগৈতিহাসিক বিহানের গল্পে।

যে বাপ্পাদিত্যর সামনে রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে সেই বাপ্পাদিত্যই আমাদের নিয়ে যায় ক্যানভাসের কেন্দ্রে। আমরা পিছিয়ে যেতে থাকি ক্রমশ। আশপাশটা পাল্টে পাল্টে যেতে থাকে। গলা জড়িয়ে ধরে মিথ, ফ্যান্টাসি, পুরাণ। আমরা সাতশো বছর পিছিয়ে যাই। একটি কনৌজি ব্রাহ্মণ পরিবারের নয়টি প্রজন্ম এবং উনপঞ্চাশটি চরিত্র আমাদের ঘিরে জীবন্ত হয়ে ওঠে। লেখক আমাদের নিয়ে যান হুগলি আর সরস্বতী নদীর সংযোগস্থলে থাকা সেই অদ্ভুতুরে মায়াভূখণ্ডে, যার নাম সাতগাঁ। কত ঘটনাই সেখানে ঘটে! আমরা জানতে পারি আজকের বাপ্পাদিত্য  ছেলেবেলা থেকে মায়ের সঙ্গে মার্টিন্স কোম্পানির ছোটো রেলগাড়ি চেপে এসেছে এই জাদুভূমিতে, যেখানে রেলের চাকায় বাজে কেরেস্তান-গোরস্তান ধ্বনি, হাওয়া দিলে গির্জার চালে বেড়ালের কান্নার মতো শব্দ হয়, যেখানে নারীরা নদীতে ডুব দিয়ে দূরবাসিনী আত্মীয়ার সঙ্গে জলে-জলে বার্তা বিনিময় করে, নৈয়ায়িকেরা কুয়োর পেতনির শাপে ব্যাঙ হয়ে যায়, প্যারিস থেকে তরুণ কবি এসে খুঁজে পায় তার ক্লেদজ কুসুম, সার্জেন-পাদরি নদীর খাত ঘুরিয়ে দেয়, দুর্দম তুর্কী যোদ্ধা এসে মায়াবী ভূমিতে বাঁধা পড়ে, সংস্কৃত শিখে গঙ্গাস্তোত্র লেখে, পুরুষেরা পুনর্জন্ম নিয়ে বংশে ফিরে আসে, এমনকি এক ফিরিঙ্গিও ফিরে আসে কাকাতুয়ারূপে… কী অসম্ভব নিপুণ এক নির্মিতি! এতটুকু বিচ্যুতি নেই বয়ানে।

 আলোচ্য রচনায় এই আখ্যানে বর্ণিত এলোমেলো ঘটনাপ্রবাহ বা চরিত্র বিশ্লেষণ আমার উদ্দেশ্য নয়।  তন্নিষ্ঠ পাঠক মাত্রই জানেন একটি বিপুল প্রেক্ষাপট নির্মাণ এবং তার সঙ্গে সঙ্গে অসংখ্য চরিত্রের প্রাণ প্রতিষ্ঠা একটি দুরূহ কাজ। লেখক পরিমল ভট্টাচার্য ঠিক এখানেই মুনসিয়ানা দেখিয়েছেন। তাঁর গদ্যের গঠন প্রক্রিয়া অত্যন্ত বিলম্বিত। কোনো তাড়াহুড়ো নেই। লেখক যেন নিজেই হাওয়ায় তাঁত বুনতে বুনতে ইতিহাসের একেকটা মিনারের সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন। পা টিপে টিপে নিয়ে যাচ্ছেন দিনেমারডাঙা ফিরিঙ্গিডাঙা, কাটুনিডাঙা, আর্মানিডাঙা, পোর্তোহাটা ইত্যাদি জায়গাগুলোয়। মিথ নির্মাণ বা ইতিহাস প্রাজ্ঞতা দেখানোর মোটিভ নয়, বরং দর্শককে দ্রষ্টব্যের আরও কাছে নিয়ে গিয়ে অস্তিত্বের একেকটা চিহ্ন পুনরুদ্ধারই যেন তাঁর একমাত্র পরিকল্পনা। এ তো কেবল বাপ্পাদিত্যর ইতিহাস নয়, বরং গোটা একটি জাতির উৎসমুখে দাঁড়িয়ে লেখকের এই পরিবেশনা। লাতিন আমেরিকার ইতিহাস যেমন নিমজ্জিত থাকে মার্কেজের তৈরি বুয়েন্দিয়া পরিবারে, ঠিক তেমনি স্মার্ত ব্রাহ্মণ পরিবারটির সাতশো বছরের প্রাককথনে ডুবে আছে বাংলার বহুস্তরীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাস।

এই পাঠযাত্রায় ধীরে ধীরে একটি স্থিরতা জন্ম নেয়—এক ধরনের স্থবিরতা, যা আসলে জড়তা নয়, বরং দীর্ঘ ধ্যানের মতো। লেখকের মতো পাঠকও যেন থেমে যেতে বাধ্য হন; সময়ের স্রোত থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় নিজের ভেতরের দিকে।

সাত শতাব্দীর দীর্ঘশ্বাসে ভেজা এই আখ্যান বিস্ময়ের এক গভীর, নীল অন্ধকার খুলে দেয়—যেখানে প্রতিটি ঘটনা যেন ইতিহাসের পাথরে খোদাই করা শিলালিপি, প্রতিটি নির্মাণ উপাদান যেন সময়ের শরীরে জমে থাকা ধুলোর স্তর, আর স্মৃতির সামগ্রিক ধূসরতা এক অদৃশ্য হাত বাড়িয়ে পাঠকের মনোযোগকে নিজের দিকে টেনে নেয়।

যেমন করে গ্যাব্রিয়েল মার্কেজের ‘একশো বছরের নিঃসঙ্গতা’ বুয়েন্দিয়া পরিবারের চারপাশে সময়কে বৃত্তাকারে ঘুরিয়ে এক অনন্ত মিথ নির্মাণ করে, তেমনি এই আখ্যানের হৃদস্পন্দনও নিরন্তর ঘুরে ফিরে আসে ‘আদিরামবাটি’-র দিকে—একটি ভূগোল, যা আসলে মানচিত্রের নয়; একটি স্মৃতি, যা আসলে কোনো একক মানুষের নয়; একটি সময়, যা একক শতাব্দীরও নয়। লেখক যেন এই কেন্দ্রবিন্দুকে ঘিরে সভ্যতার ধ্রুপদী শিকড়ের দিকে ধীরে ধীরে নেমে গেছেন ক্রমাগত।

এই পাঠযাত্রায় ধীরে ধীরে একটি স্থিরতা জন্ম নেয়—এক ধরনের স্থবিরতা, যা আসলে জড়তা নয়, বরং দীর্ঘ ধ্যানের মতো। লেখকের মতো পাঠকও যেন থেমে যেতে বাধ্য হন; সময়ের স্রোত থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকতে হয় নিজের ভেতরের দিকে। কারণ এই লেখা পড়তে পড়তে বোঝা যায়—লেখার যেমন বিবর্তন ঘটে, তেমনি পাঠেরও ঘটে।

লেখক জানেন তিনি সর্বজ্ঞ নন। ছায়াচ্ছন্ন অন্ধকার হাতড়েই তাঁকে কুড়োতে হয়েছে যাবতীয় মনিমুক্তো। বাপ্পাদিত্যের একক ইতিহাস মনে করিয়ে দেয় ইতালো কালভিনোর দ্য রোড টু সান জিওভান্নি, যেখানে উনি লিখছেন, ‘from the depth of the opaque I write..’ আলোচ্য উপন্যাসের লেখকও বহুমাত্রিক একটি ছায়া-অতীতকেই নির্বাচন করেছেন। ফিকশনের বহুরৈখিক গতি কখনোই পাঠককে বিভ্রান্ত করে না, বরং এই বহুস্বরীয় ইতিহাস স্বীকৃতি পায় পাঠকের ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে। ফিকশনকে যদি একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ সমান্তরাল বাস্তব হিসেবে ধরে নেওয়া যায় তাহলে সেই বাস্তবের নির্মাণে প্রকরণগত ভাবে লেখক চূড়ান্ত সফল।

বিস্মিত লাগে এই গদ্যের নির্মাণ কালের দিকে নজর রাখলে। শিকড়চ্যুত শতচ্ছিন্ন সংস্কৃতির এই সময়ে লেখক হঠাৎ সময়ের এমন বিস্তীর্ণ জাল বুনলেন কেন? সময়ের অন্তর্মুখ এবং বহির্মুখ দুটোই পরম্পরার এমন খয়েরি বুনোটে পরিবেশিত হল কেন? কেবল একটি গল্প বলার তাগিদেই কি কনৌজি ব্রাহ্মণ একটি পরিবারের একেবারে আরম্ভের দিকে দূরবীন তাক করেছেন লেখক? সম্ভবত না। ভুলে গেলে চলবে না আজকের বাপ্পাদিত্য, প্রৌঢ় বাপ্পাদিত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রাষ্ট্র। নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইছে রাষ্ট্র। চাইছে এভিডেন্স। বাপ্পাদিত্যর সমস্ত মুখের কথা, স্মৃতির কথাকে উড়িয়ে দিয়ে রাষ্ট্র বলছে, ‘শো, ডোন্ট টেল’। বাপ্পাদিত্য বলছেন, ‘আমি ডিফেডেন্ট, আমিই ডিপোনেন্ট’। প্রত্যুত্তরে রাষ্ট্র বলছে এভিডেন্সে ইতিহাস থাকতে পারে, ভূগোল থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি! ঠিক এই বিপন্নতা থেকেই উপন্যাসের অবতারণা। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা। একটি জাতির ক্ষয় -জয়-দীনতা- গোঁড়ামো-বাণিজ্য, সর্বোপরি থেকে যাওয়ার বিস্তৃত ইতিহাসের প্রয়োজন এখানেই। এই বহুস্বরীয় আখ্যান এই প্রতিস্পর্ধীতার বক্তব্যেই প্রাসঙ্গিক।

এভিডেন্সে ইতিহাস থাকতে পারে, ভূগোল থাকতে পারে, কিন্তু সাহিত্য নয়। নো পোয়েট্রি! ঠিক এই বিপন্নতা থেকেই উপন্যাসের অবতারণা। রাষ্ট্রের সমস্ত অযৌক্তিক প্রশ্ন ও আগ্রাসী অবিশ্বাসের সামনে তাই এই আবহমানতার সচেতন প্রতিষ্ঠা।

লেখক পরিমল ভট্টাচার্যকে অভিনন্দন, কারণ তিনি  রাষ্ট্রশক্তির ছুড়ে দেওয়া বিপন্নতার সামনে এভিডেন্স হাজির করাতে পেরেছেন। কালাকালের দলিল, চিরকালের এই প্রবহমান থেকে যাওয়ার অনিবার্যতাকে প্রকাশ করতেই এই বিপুল নির্মিতির দায়ভার লেখককে নিতে হয়েছে। এই আখ্যান কেবল বাপ্পাদিত্যকে নয়, আমাদেরকেও উৎসমুখে ঠেলে দেয়। সময়ের তাঁত বুনেছেন পরিমল ভট্টাচার্য। তিনিই স্বয়ং হাওয়াতাঁতি, এ নিয়ে আর সন্দেহ থাকে না।

______
১৪৩২ বঙ্গাব্দে আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছে সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা | লেখক: পরিমল ভট্টাচার্য | প্রকাশক: অবভাস | মুদ্রিত মূল্য: ৮২৫ টাকা

Developed by DXDasia