
“সন্দেশের এই মুহূর্তে অনলাইন সংস্করণের কথা আমরা কোথাও ঘোষণা করিনি”
আজ থেকে বছর চারেক আগে আমরা ‘সন্দেশ ১০০’ নামে একটি ডকুমেন্টারি ফিল্ম তোলার কাজ শুরু করি। আর এই সময় থেকেই ‘সন্দেশ’-এর একটা আর্কাইভ হওয়া প্রয়োজন— সেই তাগিদ অনুভব করি। কিন্তু, তখন আমাদের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার নিতান্তই দুর্বল ছিল। কীভাবে একটা আর্কাইভ গড়ে তুলতে হয়, কীভাবে বিভিন্ন কাগজ, নথিপত্র, দুষ্প্রাপ্য ছবি, চিঠি ইত্যাদিকে ক্যাটালগিং করতে হয়— তা মোটেই জানা ছিল না। কিন্তু, আমাদের দেশে আর্কাইভের ব্যাপারটাকে যে বেশ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের চোখে দেখা হয়— সে ব্যাপারটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ডকুমেন্টারি ফিল্ম তোলার কাজ করতে গিয়ে পদে পদে হোঁচট, বাধা-বিপত্তি জানান দিচ্ছিল আমাদের কাজের গতি মোটেই সাবলীল নয়। অগত্যা এঁর কাছে, ওঁর কাছে ঘুরে-ঘুরে বেড়াতে হয়েছিল। কিন্তু, নাহ্— আদৌ এ-ব্যাপারে কারোর কোনও সহযোগিতামূলক মনোভাব খেয়াল করিনি। কিন্তু আমরা তো দমবার পাত্র নই মোটে। আমরা যে সন্দেশী। রক্তে না হলেও সন্দেশীদের একে অপরের মধ্যে আত্মিক টান রক্তের সম্পর্কের চাইতে কোনও অংশে কম নয়। কাজেই একটা তেজের সঙ্গে সবাই সিদ্ধান্ত নিলাম কাজটা আমাদের করতেই হবে। তবে, সে কিন্তু কেবল ডকুমেন্টারি ফিল্ম তোলার কাজ নয়। সে তো মহাসাগর থেকে এক ঘটি জল তোলার মতো ব্যাপার। কাজটা সার্বিকভাবে করার।
আগেই বললাম, আমাদের এ-দেশে আর্কাইভ করার মনোভাবটাই নেই। অথচ আমি অন্যান্য রাজ্য, তাঁদের ভাষা-বৈচিত্র্যের কথা যদি ছেড়েইদি, তবুও আমাদের পশ্চিমবাংলা তথা বাংলা ভাষার বিষয়-বৈচিত্র্যও কম নাকি! এত সব সম্পদ— অথচ কালের নিয়মে, আমাদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের মানসিকতায় আজ বেশিরভাগই হারাতে বসেছে। কিন্তু তার মধ্যেও তো কিছু আছে। যেটুকু আছে, তা নিয়েই যদি কাজটা শুরু করা যায়— তাই-বা মন্দ কী? দুঃখের বিষয়, আমাদের ‘সন্দেশ’ পত্রিকারও কোনও নিজস্ব আর্কাইভের তো বালাই-ই নেই, এমনকি অধিকাংশ পুরোনো নথিপত্রই একেবারে হাওয়া! অনেকটা সেই ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে মুকুলের কাছে মন্দার বোসের বলা দুষ্টু লোকটা ‘ভ্যানিশ’ হবার মতো বিষয়। তবে হ্যাঁ, সব যে ভ্যানিশ হয়েছে— তা বলতে পারিনা। সন্দেশী কাকু-জেঠু, দাদা-দিদিদের কাছে গপ্পো শুনেছি, অজস্র সম্পদের মধ্যে বেশ কিছু মূল্যবান জিনিসই তথাকথিত বিশিষ্ট কিছু সত্যজিৎ-গবেষক, সংগ্রাহক থেকে শুরু করে রাজস্থানের দিন-রাতের আবহাওয়া পরিবর্তনের মতো কিছু দুষ্টু-মিষ্টি সন্দেশীরা থুড়ি মূর্তিমানেরা কেউ কেউ একটু-আধটু করে আবার কেউ-বা চোখের নিমেষে সে-সব জিনিস কার্যত চক্ষুদান করেছেন। তা বেশ, কিন্তু গোলমালটা অন্যখানে। পরবর্তীকালে সে-সব মূর্তিমানেরা ‘সন্দেশ’-এর সে-সমস্ত সম্পত্তিকে প্রায় নিজের পারিবারিক সম্পত্তি ভেবে যা-নয়-তাই করে গিয়েছেন।
অথচ, সন্দেশ গোষ্ঠী অসহায়। তাঁদের পেছনে না-আছে কোনও বড়ো শক্তি, না-আছে তেমন-তেমন অর্থের জোগান। কাজেই ক্রমশই ‘সন্দেশ’ তাঁর আপন সম্পদ হারাতে বসল। ঠিক এই সময়েই আমরা ক’জন আঠারো-উনিশের ছোকরা ফোকর-দালালি করে, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়িয়ে উঠে-পড়ে লাগলাম ‘কিছু একটা’ করতে হবে— এমন ভাবভঙ্গী নিয়ে। এ-লেখার গোড়াতেই যেমনটা লিখলাম, আমাদের কাজের গোড়াতেও ঠিক তেমনটাই ঘটল। টাকা-পয়সা হাতে নেই, উপযুক্ত সোর্স জানা নেই— কিন্তু যেটা আছে, সেটা হচ্ছে ‘সন্দেশ’-এর প্রতি নাড়ির টান। কাজেই পালাই কোথায়?
সেই দু’হাজার সতেরো সালের জুলাই মাসে যে কাজের সূত্রপাত— আজও সেই কাজেই আমরা ব্রতী। এখন কথা হচ্ছে, আজ সময়ের নিয়মে, আমাদের বয়েসের অভিজ্ঞতা আর কাজের অভিজ্ঞতার ভাঁড়ার এখন আগের চাইতে সামান্য কিছু ভরাট হয়েছে বটে। কাজেই সে-সবটাকে কাজে লাগিয়ে এখন ‘সন্দেশ’-এর পাশাপাশি, ‘সন্দেশ’-এর আদর্শ মাথায় রেখে আমাদের ক্যাপ্টেন শ্রী সন্দীপ রায়ের নেতৃত্বে আমরা বন্ধুরা আরেকটা কাগজ প্রকাশ করছি ‘বিচিত্রপত্র’ নামে। যদিও ‘বিচিত্রপত্র’ ঠিক ছোটোদের কাগজ নয়। তার জন্য ‘সন্দেশ’ আছে। ‘বিচিত্রপত্র’ পত্রিকা প্রকাশের প্রধান তাগিদ অনুভব করছিলাম যখন আমরা দেখছি, বর্তমানে সিরিয়াস বাংলা পত্রিকার বড়োই অভাব। তাছাড়া, ‘সন্দেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার দরুন কোথাও একটা টের পাচ্ছিলাম ছোটোদের সাহিত্য এবং গল্প-কবিতা-উপন্যাসের বাইরে একটা বিরাট জায়গা জুড়ে রয়েছে প্রবন্ধ-সাহিত্য। গোড়ার দিকে যদিও এখানে গল্প-উপন্যাস কিছু প্রকাশিত হচ্ছিল, কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছিলাম পাঠক ‘বিচিত্রপত্র’-র থেকে মূলত প্রবন্ধই আশা করছেন। কাজেই, ‘বিচিত্রপত্র’ এখন মূলত প্রবন্ধের কাগজ। সেখানে যেমন সাহিত্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে চর্চা হয়, তেমনি চলচ্চিত্রের হালহকিকত, চিত্রনাট্যও প্রকাশ পায়। আবার এসবের পাশাপাশি ‘বিচিত্রপত্র’-র অন্যতম আকর্ষণ দুষ্প্রাপ্য লেখা-আঁকা-ছবির কখনও প্রথম প্রকাশ, আবার কখনও-বা পুনঃপ্রকাশ। কিন্তু হ্যাঁ, একটা ব্যাপারে আমরা সবাই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ— এমন কোনও লেখা-আঁকা ‘বিচিত্রপত্র’-তে প্রকাশিত হবে না, যেটা সব বয়েসের মানুষ, সব ধরনের মানুষ পড়তে-বুঝতে না পারেন।
এখন এতগুলো কথা যে জন্যে বললাম— এবার সে কথায় আসি। আর্কাইভ করার যে ধ্যানধারণার কথা বলছিলাম, সে ব্যাপারটা চলছে। তবে, এই খবর নতুন কিছু নয়। বিগত তিন-চার বছর ধরেই এই কাজ আমরা চালিয়ে যাচ্ছি। কিন্তু, গতবছর যখন সারা দেশ জুড়ে কোভিড-১৯ ভাইরাসের দাপটে লকডাউন চলছে, তখন বাড়ির চার দেওয়ালের মাঝে বসে নির্ঝঞ্জাট কাজ করবার একটা বিরাট সুযোগ পেয়ে গেলাম। ‘সন্দেশ’-এর সঙ্গে যুক্ত থাকার দরুন, ডকুমেন্টারি ফিল্ম তোলার দরুন, ‘বিচিত্রপত্র’ প্রকাশ করার দরুন এবং আর্কাইভ করার দরুন লীলা মজুমদারের বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি, অপ্রকাশিত-অগ্রন্থিত লেখা, দুষ্প্রাপ্য চিঠি, ফোটোগ্রাফ ইত্যাদি আমাদের হাতে আসে তাঁর পারিবারিক সূত্রে। সেসব ভাঁড়ার থেকে কিছু এক নাগালে হাতের কাছে আসায় আমরা আমাদের সেই আনন্দের মুহূর্তটাকে নিজেদের মধ্যে ধরে না রেখে সংস্কৃতিমনস্ক সব লোকজনের মাঝে ছড়িয়ে দিলাম একটি প্রথম শ্রেণির বাংলা খবরের কাগজের সাহায্যে। তারপর একটি প্রথম শ্রেণির টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলে, রেডিওতেও খবরটি সম্প্রচারিত হল। আর তাতেই কাল হল। সবাই মিলে আনন্দ ভাগ করে নিতে গিয়ে যেটা হল— সেটা ভয়ংকর।
প্রতিদিন গড়পড়তা দু’-তিনটি করে বিভিন্ন প্রকাশকের ফোনের উৎপাতে ব্যতিব্যস্ত হয়েছি প্রায় এক মাস! বলা বাহুল্য, প্রত্যেকেরই এক বক্তব্য— ‘আমরা কি এই লেখাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশ করতে পারি?’ প্রত্যেককেই যে উত্তর দিয়েছি, সে উত্তরই আবারও দিচ্ছি, লীলা মজুমদার বা অন্য কারোরই কোনও লেখা প্রকাশের অনুমতি আমরা দিতে পারি না। আমরা তাঁদের পরিবারের অনুমতিতে পাণ্ডুলিপি ইত্যাদির আর্কাইভের কাজ করছি। এর বেশি কিছু নয়। এখানেই শেষ নয়। সরাসরি আমাদের থেকে খবর নেওয়া দু’-তিনটি সংস্থা বাদে প্রায় রোজ গজিয়ে ওঠা একগাদা সংবাদ সংস্থা একের-পর-এক খবর প্রকাশ করতে লাগলেন। আমি বা আমরা নাকি লীলা মজুমদারের জলরঙে আঁকা ছবি পেয়েছি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সুকুমার রায় ব্যবহৃত খাতা-কলম পেয়েছি, এমনকি আমার টালাপার্ক অঞ্চলে রাজা মনীন্দ্র রোডে আমার বাড়িটিতে নাকি এক সময় স্বয়ং লীলা মজুমদার বাসও করতেন। একজন পরিচিত সাংবাদিক তো ফোঁস করে আমায় বলেই বসলেন— ‘এ যা শুরু হয়েছে দেখছি, এবার না কোনদিন লেখে, তোমরা লীলা মজুমদারের বিয়ের বেনারসিটাও পেয়েছ!’ লিখলে সত্যিই আশ্চর্য হতাম না। ঠিক সেই ব্যাপারটা আবারও ঘটছে। কেবল বিষয়টা বদলেছে— এই যা। সম্প্রতি, একটি টেলিভিশন নিউজ চ্যানেলে ‘শতবর্ষে সত্যজিৎ’ শীর্ষক খবরে আমাদের টিম ক্যাপ্টেন সন্দীপ রায় এবং ছোকরাদের দলের পক্ষ থেকে আমি— এই দু’জন আমরা বলি— ‘সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য সবরকম মাধ্যমেই আমাদের যাওয়া প্রয়োজন। ইতিমধ্যে যেমন আমরা ‘সন্দেশ’ ও ‘বিচিত্রপত্র’ পত্রিকা প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে আর্কাইভের কাজ করছি, পাশাপাশি অনলাইনে কীভাবে পত্রিকা দু’টোকে আনা যায়, ই-বুক সংস্করণ হিসেবে প্রকাশ করা যায়— সে বিষয়েও বিস্তর চিন্তা-ভাবনা করছি। তবে সুখের কথা এই যে, খুব শিগগিরি ‘দ্য বিচিত্রপত্র ফাউন্ডেশন’-এর উদ্যোগে ‘বিচিত্রপত্র’-র নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি হচ্ছে। সেখানে ‘সন্দেশ’-এর যাতে একটা আর্কাইভের স্লট্ রাখা যায়— তাই নিয়ে সবাই আলোচনা চালাচ্ছি।’
পাঠক, আপনি নিশ্চয়ই পড়লেন, আমার আগের লেখা লাইনগুলো। কিন্তু, না! এই বক্তব্যের বাইরে বেরিয়ে আবারও সেই ভুল খবর প্রচার। ‘সন্দেশ’-এর অনলাইন সংস্করণ নিয়ে চিন্তা-ভাবনা চলছে ঠিকই, কিন্তু এই মুহূর্তে আসছে— এমনটা আমরা কোথাও ঘোষণা করিনি, করছিও না। ‘সন্দেশ’ ও ‘বিচিত্রপত্র’— এই দু’টি পত্রিকার মধ্যে কোনও অফিশিয়াল সম্পর্ক নেই। কিন্তু, একথা ঠিক— যে সকল ব্যক্তিরা ‘সন্দেশ’ চালান, তাঁদের মধ্যে থেকে প্রায় অধিকাংশ ব্যক্তিই ‘বিচিত্রপত্র’ প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত। কাজেই এখানেও সেই রক্তের সম্পর্ক আর আত্মিক টানের ব্যাপারটা চলে আসছে। সুতরাং, ‘বঙ্গদর্শন’-এর মাধ্যমে ‘সন্দেশ’ ও ‘বিচিত্রপত্র’— এই গোটা টিমের পক্ষ থেকে আমি পাঠকদের অনুরোধ করব, কোনও ভুল খবরে, ভুল রটনায় পা দেবেন না। আমাদের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজ এবং ‘বিচিত্রপত্র’-র আসন্ন ওয়েবসাইটে যা খবর দেওয়া হবে এর বাইরে পত্রিকা সম্পর্কিত কোনও খবরের দায় ‘সন্দেশ’ বা ‘বিচিত্রপত্র’ নেবে না। ব্যতিক্রম, আমরা নিজেরা কোনও খবরের কাগজ কিংবা টিভি চ্যানেলে এই বিষয়ে কোনও বার্তা দিলে সেটা বিশ্বাসযোগ্য হবে।