
পথের পাশে আজ তার স্মৃতিটুকু সম্বল হয়ে আছে
ঐতিহ্যবাহী হলটি উঠে যাওয়ার খবর পেয়ে অনেকেই এলেন দেখতে। আশেপাশে পাড়ার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা খবর নিলেন। একজন বললেন, “হলটি এখানে অক্ষত থাকবে তো?” একজন যুবক এগিয়ে এসে বললেন, “সেখানে এখন শপিং মল হচ্ছে। ভবনটির বাইরের অংশ কিছুটা থাকছে”। যাক, সেটা শুনে অনেকে যেন কিছুটা আশ্বস্ত হলেন।
হাতিবাগান ক্রসিং থেকে বিধান সরণির ওপর বাঁ হাতে আর একটু এগিয়ে গেলে পড়বে উত্তর কলকাতার একটি নামকরা সিনেমা হল ‘রূপবাণী’। রবীন্দ্রনাথের নামের সাথে জুড়ে স্থানটি গৌরবান্বিত হয়ে আছে। রবি ঠাকুর বলেছিলেন “চারিদিকে এবং চিরকাল, যেরূপ দেখিয়া আসিতেছি, এ একেবারে হঠাৎ তাহা হইতে স্বতন্ত্র”। তিনি এভাবেই ভেবেছিলেন চলচ্চিত্রকে একটি সরল ব্যাখ্যায়।
“প্রত্নযুগের মতো বোকাটে, ভবিষ্যতের মতো নিষ্ঠুর তুমি ও তোমার সৌন্দর্য” – মেরিলিন মনরোর একা পরিত্যক্ত শরীরের দিকে তাকিয়ে এমনই মনে হয়েছিল চলচ্চিত্র স্রষ্টা পাসোলিনির। বছরটা ১৮৯৫, শীতের প্রবল তুষারপাত উপেক্ষা করে ফরাসি দর্শক প্রথম কিছু মুহূর্ত দেখলো রুপালি পর্দায়। সেটা ছিল নির্বাক সিনেমার যুগ। নির্বাক যুগ শেষ হয়ে সিনেমার পর্দায় এলো শব্দ। তিরিশ দশক থেকেই এই শব্দ সিনেমার পর্দায় এসেছিল। পরবর্তীতে ভারতে কিছু রাজ্যে এবং কলকাতাতেও তৈরি হলো বেশ কয়েকটি সিনেমা হল। উত্তর কলকাতার কয়েকশো মিটারের মধ্যে ছিল ‘শ্রী’, ‘রাধা’, ‘উত্তরা’, ‘দর্পণা’, ‘মিত্রা’ প্রভৃতি হলগুলি। বাড়ল আধুনিকতার ছোঁয়া। দেখা গেল, ছক-বাঁধা জীবন থেকে বেরিয়ে একটু মানুষ হাসি, গল্প, মধুর রসিকতায় মেতেছে। সেই সময়ের স্মৃতি আজও কিছুজনের চোখে জ্বলজ্বল করে ওঠে।
‘রূপবাণী’ নামকরণটি করেছিলেন রবি ঠাকুর। তিনি ‘রূপ’ ও ‘বাণী’ এই দুটি শব্দের ব্যবহার করেন। সিনেমায় রূপ হলো ছবি আর তার মধ্যে নানা চরিত্র যে কথাগুলি বলছে, সেগুলি যেন বাণী। ১৯৩২ সালে এই হলের উদ্বোধন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।
আগেকার দিনের ‘বিদ্যাপতি’, ‘মুক্তি’, ‘রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত’, ‘কাবুলিয়ালা’ এবং সত্যজিৎ রায় থেকে ঋত্বিক ঘটকের সব ছবিই এখানে দলে দলে মানুষ ভিড় করে দেখেছেন। ম্যাটিনি শোয়ে পরিবারের সাথে গৃহস্থ বাড়ির মহিলারা আসতেন নতুন ছবি দেখতে। সেকালে বিত্তশালীরাও গাড়ি করে বিনোদনের জন্য চলে আসতেন সিনেমা দেখতে। তখনকার বাঙালি ও বাঙালিয়ানার সেরা আইকন ও কলাকুশলীরা তাকিয়ে থাকতেন সপ্তাহের শুক্রবার হলগুলিতে কেমন ভিড় হয় আর তার ওপর নির্ভর করত সিনেমার মুক্তি। যুগের হাওয়ায় রূপবাণী উঠে গিয়ে সেখানে আজ একটা মল হয়েছে। একের পর এক সিনেমা হলগুলি চালানো প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে হল মালিকদের পক্ষে, মাল্টিপ্লেক্স মলগুলোর সাথে পাল্লা দিয়ে। অবহেলা অযত্নে ভেঙে পড়ছে কত এমন সিনেমা হল। যার সবটা জুড়ে বেয়ে উঠছে আগাছা-শিকড়। এখন শুধু শেষ দিনের অপেক্ষায় বসে থাকা। পথের পাশে আজ তার স্মৃতিটুকু সম্বল হয়ে আছে।
তথ্যঋণ – ড. সঞ্চারী ভট্টাচার্য, সুব্রত ঘোষ।
