
অপরের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন উচ্ছবেরা এভাবেই কেঁদে চলে
তখন ক্লাস সিক্স। হাতে পেয়েছি মহাশ্বেতা দেবীর ‘ভাত’। বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে ভাত খাই আর ‘ভাত’ পড়ি…
“…মাথার ভেতরটা ঝিমঝিম করে, কোনো কথা গুছিয়ে ভাবতে পারে না। খুব ভাবে সে, না না। এইবার গুচিয়ে ভাবতে হচ্ছে। কী যে হল তা এখনো দিশে হচ্ছে না তেমন। ভাবতে গেলেই তার প্রথমে মনে হয় ধানে গোছ আসার আগেই ধান গাছ থেকে সবুজ রঙ চলে যেতে থাকে। কার্তিক মাসেই ধান খড় হয়ে গেল। তা দেখে উচ্ছব মাথায় হাত দিয়েছিল। সতীশ মিস্তিরির হরকুল, পাটনাই, মোটা, তিন ধানে মড়ক। উচ্ছব তো সতীশবাবুর জমিতে কাজ করেই ক-মাস বেঁচে থাকে। অ উচ্ছব, মনিবের ধান যায় তো তুই কাঁদিস কেন? কাঁদব না, সাধানবাবু, কাঁদব না? লক্ষ্মী না আসতে সেধে ভাসান যাচ্ছে তা কাঁদব না এতটুকু? আমরা খাব কী?”(ভাত, মহাশ্বেতা দেবী)

অপরের মুখে ভাত তুলে দেওয়ার জন্য দিনের পর দিন উচ্ছবেরা এভাবেই কেঁদে চলে। আগেও-এখনও। সেই ছোটোবেলায় ‘ভাত’ পড়তে পড়তে আর ভাত খেতে খেতে ভাতের মধ্যে মিশে গিয়েছিল চোখের কয়েক ফোঁটা নুন-জল আর স্নায়বিক ধড়পড়ানি। আমি তো এমন দেখিনি-শুনিনি-বুঝিনি আগে। এ শুধু ইতিহাস নয়, হুবহু সত্যি। বহু জন্মের স্রোত শিরায় বয়ে বেড়ানোর পরম উপলব্ধি! এখন টের পাই সেই প্রথমবার বড়োদের মতো হতাশা, আর অনেকটা রেগে যাওয়া। প্রান্তিকের কন্ঠস্বরে শ্বাসরোধ হয়ে উঠেছিল।
“তা গুছিয়ে চিন্তা করতে বসলে আগে মনে হয় ধানক্ষেতে আগুন লাগার কথা। তারপরই মনে পড়ে যে রাতে ঝড় হয়। সেই সন্ধ্যেয় অনেকদিন বাদে সে পেট ভরে খেয়েছিল। এই এত হিঞ্চে সেদ্ধ আর এত গুগলি সেদ্ধ নুন আর লঙ্কা পোড়া দিয়ে। দিনটা এমন ছিল যে সেদিনে গ্রামের সকল উচ্ছবেরা ভরা পেট খেয়েছিল। খেতে খেতে চন্নুনির মা বলেছিল, দেবতার গতিক ভালো নয়কো। লৌকো নে ঝারা বেইরেচে বুঝি-বা বোট মারা পড়ে। এ কথাটাও বেশ মনে পড়ে। তারপরেই মনে পড়ে মাঝখুঁটিটা সে মাটির দিকে ঠেলে ধরে আছে। মা বসুমতী ঝেমন সে খুঁটি রাকতে চায়নে, উগরে ফেলে দেবে। ভগমান! ভগমান! ভগমান! তারপর বিদ্যুচ্চমকে ক্ষণিক আলোয় দেখা মাতলার সফেন জল ছুটে আসছে।”(ভাত, মহাশ্বেতা দেবী)

সময় সাধারণ নিয়মেই চলছে, কতদূর চলবে, তা সময়েই উচ্চারিত হবে। আধিপত্য বিস্তারকারী হেজিমনি(hegemony) সম্প্রদায় নয়, তাঁরই চেতনার লাল শালুকে গর্ভ হয়েছিল ঝাঁসির রানি’র, তিতুমীর-এর, হাজার চুরাশির মা-এর, চোট্টি মুন্ডা’র, ধানী মুন্ডা’র, হরমু, পাহানসহ’র, অরণ্যের অধিকার-এর, উলগুলান-এর, হুলকে’র। আজ সেইসব ব্রাত্যজনের মায়ের জন্মদিন…মহাশ্বেতা দেবীর জন্মদিন।
মহাশ্বেতা নিজেই বলেছিলেন, তিনি সবসময়েই বিশ্বাস করতেন যে, সত্যিকারের ইতিহাস সাধারণ মানুষের দ্বারা রচিত হয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সাধারণ মানুষ যে লোককথা, লোকগীতি, উপকথা ও কিংবদন্তিগুলি বিভিন্ন আকারে বহন করে চলেছে, তার পুনরাবির্ভাবের সঙ্গে তিনি ক্রমাগত পরিচিত হয়েছিলেন। তাঁর লেখার কারণ ও অনুপ্রেরণা হল সেই মানুষগুলো, যাঁদের পদদলিত করা হয় ও ব্যবহার করা হয়, অথচ যারা হার মানে না। তাঁর কাছে লেখার উপাদানের অফুরন্ত উৎসটি হল এই অত্যাচারিত মানুষগুলো।

“অন্য কোথাও আমি কাঁচামালের সন্ধান করতে যাব কেন, যখন আমি তাদের জানতে শুরু করেছি? মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার লেখাগুলি আসলে তাদেরই হাতে লেখা।”(মহাশ্বেতা দেবী)
মহাশ্বেতার উচ্ছবেরা এই বদ্ধভূমিতে আজও ফসল ফলানোর স্বপ্ন দেখে চলেছে। আজও তারা লড়ছে নিজেদের প্রাপ্য অধিকারটুকু বুঝে নেওয়ার জন্য। তা-ই আজও ভাত খেতে খেতে মনে পড়ে তাদের কথা। মনে পড়ে, মাতলার সফেন জলের আগ্রাসী ভাব আর স্নায়ুর ভিতরে ভগমান! ভগমান! ভগমান!
