আরতি মুখোপাধ্যায় : বাংলা গানের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়

গানের জগতের রাজনীতি মেনে নিতে পারেননি তিনি

আরতি মুখোপাধ্যায় স্বর্ণযুগের এমন একজন কিংবদন্তি গায়িকা, যাঁর গানের ধারা সবসময় বাঙালি শ্রোতাদের হৃদয়ে গাঁথা থাকবে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, আরতি মুখোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, নির্মলা মিশ্রের মতো কণ্ঠশিল্পীদের গাওয়া চিরসবুজ গানের সুবিশাল ভান্ডার বাঙালি শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করেছে এবং ১৯৫০-এর শেষ দিক থেকে প্রায় পাঁচ দশক ধরে স্বর্ণযুগের গানের সম্মোহন থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি। আমরা যখন খুব আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি, সংগীতই আমাদের হৃদয়ের শুশ্রূষা করে। আরতি মুখোপাধ্যায়ের সুমধুর পরিবেশনা সেই কাজটাই করেছে সবসময়। কোথায় হারিয়ে গেলেন তিনি?

১৯৪৩ সালের ১৮ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন আরতি মুখোপাধ্যায়। তাঁর পরিবার ছিল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যপূর্ণ। কলকাতায় চলে আসার পর, যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। অল্প বয়সেই বাবাকে হারান। তাঁর মা খুব ছোটোবেলাতেই তাঁকে গানবাজনার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। সুশীল ব্যানার্জি, ওস্তাদ মহম্মদ সগিরুদ্দিন খান, পণ্ডিত চিন্ময় লাহিড়ী, পণ্ডিত লক্ষ্মণ প্রসাদ জয়পুরওয়াল এবং পণ্ডিত রমেশ নাদকার্নি সহ বিখ্যাত গুরুদের সান্নিধ্যে শাস্ত্রীয় সংগীত শেখেন আরতি। ১৯৫৫ সালে, যখন তাঁর ১৪/১৫ বছর বয়স, সুশীল ব্যানার্জী তাঁকে অল ইন্ডিয়া মিউজিক ট্যালেন্ট-এ অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। সেই প্রতিযোগিতায় প্রধান বিচারক ছিলেন প্রখ্যাত গায়ক ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য এবং আরতি মুখোপাধ্যায়ের পরিবেশনায় তিনি এতটাই মুগ্ধ হন যে, সুশীল ব্যানার্জিকে জিজ্ঞেস করেন, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি ‘মামলার ফল’ ছবিতে আরতি তাঁর সঙ্গে গান গাইতে আগ্রহী কিনা।ঐতিহ্যবাহী 'মেট্রো মারফি' সংগীত প্রতিযোগিতায়ও অংশগ্রহণ করেছিলেন আরতি। সারা ভারত থেকে প্রতিযোগিরা অংশ নিয়েছিল সেখানে। বিচারকের আসনে ছিলেন অনিল বিশ্বাস, নৌশাদ, বসন্ত দেশাই এবং সি রামচন্দ্র সহ হিন্দি ছবির গানের জগতের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। সেই প্রতিযোগিতায় সেরার ট্রফি জিতে নেন আরতি মুখোপাধ্যায় এবং ১৯৫৮ সালের সিনেমা ‘সাহারা’-য় প্লেব্যাক শিল্পী হিসাবে প্রথম 'ব্রেক' পান। এরপর বাংলা সিনেমায় নিজের ভাগ্য পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেন তিনি এবং ১৯৬২ সালে, 'কন্যা' নামে একটি বাংলা সিনেমায় প্রথমবার গান করেন। তাঁর আকর্ষনীয় সুরেলা কণ্ঠের জাদু ছড়িয়ে পড়েছিল শ্রোতাদের হৃদয়ে। গানটি ছিল একটি ল্যাটিন প্রবাদের অংশের মতো, ‘ভেনি, ভেদি, ভিসি’ (আমি এসেছি, আমি দেখেছি, আমি জয় করেছি)।৬০-৭০-এর দশকে বাংলা ছবির মুখ্য অভিনেত্রীদের কণ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন তিনি। সুচিত্রা সেন, সুপ্রিয়া চৌধুরী, মাধবী মুখার্জি, অপর্ণা সেন, তনুজা, শর্মিলা ঠাকুর, দেবশ্রী রায় এবং আরও অনেকেই সেই তালিকায় ছিলেন। ৭০-এর দশকে আশা ভোঁসলে এবং আরতি মুখোপাধ্যায় বাংলা গানের জগতে সবচেয়ে জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী হয়ে উঠেছিলেন।

আরতি মুখোপাধ্যায় যেকোনও ঘরানার গান গাইতে পারতেন – ঠুমরি থেকে শুরু করে ভজন, টপ্পা, তারানা এবং গজল। ভারত এবং সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় হয় তাঁর গান। কিন্তু তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে প্রায়ই তাঁকে সমসাময়িক শিল্পীদের কাছে হেনস্থার শিকার হতে হত। তাঁর গানের বিপুল সম্ভার এবং জনপ্রিয়তা অনেক শিল্পীকেই অস্বস্তি বোধ করাতো। তিনি কখনই গানের জগতের রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চাননি, কিন্তু বিভিন্ন ঘটানা তাঁকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছিল। তিনি একবার বলেছিলেন: “আমি তখন মুম্বাইয়ে স্ট্রাগল করছিলাম। আমি এখনও ঠিক জানি না কে আমার খাবারে কী মিশিয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ একদিন আমি খুব অস্বস্তি বোধ করতে থাকি। আমার পা দুটো ফুলে যায় এবং আমি ব্যথায় নড়তে পারছিলাম না। সেই অবস্থায় ডাক্তারের কাছে যাই। ডাক্তার তৎক্ষণাৎ আমার পাকস্থলী ওয়াশ করেন এবং বলেন যে, কেউ আমার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল। আমার পায়ে যে ব্যথা শুরু হয়েছিল তখন, আজও তা আমাকে কষ্ট দেয়। আমি একটানা বসে রেওয়াজও করতে পারি না।"কেরিয়ারের প্রথম দিকে গীতিকার সুবীর হাজরার সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর এবং এই জুটি ‘তখন তোমার একুশ বছর বোধ হয়’, ‘আয়নাতে মুখ দেখবো না…', 'বহু পথ ভেঙে…', 'এসো না গল্প করি…'র মতো চমৎকার দীর্ঘজীবী 'চার্টবাস্টার' তৈরি করেছিল। প্রেমে পড়ে দুজনে বিয়েও করেছিলেন। সুবীর হাজরা ছিলেন বহুমুখী প্রতিভা, যিনি বহু চিত্রনাট্যও লিখেছিলেন এবং সেই সময়ে সত্যজিৎ রায়কে অ্যাসিস্টও করেছিলেন। শুরুতে সবকিছু ঠিকঠাক ছিল কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই আরতি বুঝতে পারেন সুবীরবাবু খুব 'পজেসিভ' এবং তাঁকে কোনও জায়গা দিতে রাজি নন। সম্পর্ক তাকে দমিয়ে রাখছিল। এই সময়ে তাঁর পরামর্শদাতা এবং সংগীত পরিচালক, সুধীন দাশগুপ্ত তাঁকে বোম্বেতে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন। বাংলায় তখন তার পেশাগত জীবন তুঙ্গে। কিন্তু তাঁকে ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। সুবীর হাজরার সঙ্গে তাঁর বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাওয়ার পর আরতি মুখোপাধ্যায় অবশেষে বম্বে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

‘গীত গাতা চল’ ছবির মাধ্যমে হিন্দি সিনেমার জগতে তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়ে যায়। মাসুম ছবিতে আরডি বর্মনের সুরে গান করে তিনি ফিল্মফেয়ার পুরস্কার পান। তপন সিনহা 'সগিনা মাহাতো'-এর জন্য "ছোটি সি পাঞ্ছি" নামে যে গানটি  তৈরি করেছিলেন, সেটিও গেয়েছিলেন আরতি মুখোপাধ্যায়। পাঁচ বছর পর, তিনি গুজরাটি মুনিম পরিবারের একজনের সঙ্গে দ্বিতীয়বার গাঁটছড়া বাঁধেন। তাঁর ছেলে সোহমকে পন্ডিচেরির অরবিন্দ আশ্রমে পাঠিয়ে দেন। তাঁর প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও, ক্রমবর্ধমান প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রায়শই তাঁর পেশাগত জীবন নিয়ে খুব বিরক্ত বোধ করতেন। এমনকি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল যে লতা মঙ্গেশকর এবং আশা ভোঁসলের মতো ব্যক্তিত্বরাও বিভিন্ন সময়ে তাঁর কেরিয়ার নষ্ট করতে তৎপর হয়েছিলেন। উদাহরণস্বরূপ, আরতি 'আনন্দ আশ্রম' ছবির জন্য শ্যামল মিত্রের সঙ্গে একটি ডুয়েট গান গেয়েছিলেন, কিন্তু পরে যখন অ্যালবামটি প্রকাশিত হয়েছিল, তখন তিনি আবিষ্কার করেছিলেন যে তাঁর বদলে গানটি গাওয়ানো হয়েছে প্রীতি সাগরকে দিয়ে এবং কেউ তাঁকে একথা জানানোর প্রয়োজন মনে করেননি। একবার আশা ভোঁসলে আরতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আরডি বর্মনের চুক্তি আটকাতে চেয়েছিলেন। আবার, তাঁর সঙ্গে গান গাইলে বাপি লাহিড়ি-কে ভয়ানক পরিণতির হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।

এই সমস্ত ছোটখাটো ঘটনা ও সমস্যাগুলো তাঁর জীবনে গভীর দাগ রেখে যায় এবং ভালো থাকার জন্য পেশাদার সংগীতের জগত ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। এখন ছেলে সোহমের সঙ্গে মুম্বাইয়ের একটি ফ্ল্যাটে থাকেন এবং ছেলের সঙ্গেই গানবাজনার যাবতীয় আবেগ ভাগ করে নেন। সোহম ইতিমধ্যেই একজন প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী হিসাবে নিজের সুনাম তৈরি করেছেন। সেতার, বাঁশি এবং পিয়ানো সহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্রে তাঁর দক্ষতা রয়েছে। সবকিছু থেকে সরে এসে এখন নিভৃতে তাঁর 'সাধনা' চালিয়ে যাচ্ছেন কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী আরতি মুখোপাধ্যায়।

(লেখাটি অনুবাদ করা হয়েছে। মূল ইংরেজি প্রতিবেদনটি পড়তে  )

Developed by DXDasia