বাউল-ফকির নির্বিশেষে বাংলার প্রভাতী সংগীতের আরেক নাম ‘টহল’

বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গ থেকে পুরোপুরি উবে যায়নি এই সংগীতের ধারা

“জাগো গো শ্যামের কমলিনী রাই/ পূবদিকে চেয়ে দেখ আর নিশি নাই/ শ্যামের অঙ্গে অঙ্গ দিয়া,/ কত সুখে রও ঘুমাইয়া।”

এই প্রভাতী সংগীতে এক সময় ঘুম ভাঙতো বাঙালির, এখন সে সব প্রায় অতীত। রাঢ় বঙ্গের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে এই প্রভাতী সংগীত। রাধাগোবিন্দের মন্দিরে গিয়ে এই গান গেয়ে দেবতার প্রভাতী নিদ্রাভঙ্গ করে নগর ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন ভক্তরা। কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণবদের কাছে কার্তিক মাস গুরুত্বের বিচারে প্রথম সারিতে। সারা বছর না হলেও কার্তিক মাস জুড়ে চলত প্রভাতী এই ঈশ্বর কীর্তন। যুগ পরিবর্তন হলেও বঙ্গ সংস্কৃতির অঙ্গ থেকে পুরোপুরি উবে যায়নি এই সংগীতের ধারা। কোথাও কোথাও স্থানীয় ভাষায় একে ‘টহল’ বলে।

রাঢ় বঙ্গের সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে এই প্রভাতী সংগীত। রাধাগোবিন্দের মন্দিরে গিয়ে এই গান গেয়ে দেবতার প্রভাতী নিদ্রাভঙ্গ করে নগর ভ্রমণে বেরিয়ে পড়তেন ভক্তরা। কৃষ্ণভক্ত বৈষ্ণবদের কাছে কার্তিক মাস গুরুত্বের বিচারে প্রথম সারিতে।

টহল গান নিয়ে দীর্ঘ গবেষণামূলক কাজ করেছেন রাধামাধব মণ্ডল। তাঁর লেখা বই-ই তার প্রমাণ। তিনি জানান, “বাংলার বিভিন্ন গ্রামে টহল গানের চর্চা ও শিল্পীদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে জানা যায়, কার্তিক মাস হল তপস্যার মাস। বৈষ্ণবরা এই মাসটিকে সাধন ভজনার মাস বলেই জানেন। তাই কোনও কোনও বৈষ্ণব সাধক, সাধন ভজনার এই মাসে রাত্রিযাপন করে এবং প্রতি প্রহরে আরাধ্য কৃষ্ণের নাম ছড়িয়ে দেন গ্রামের পথে পথে। কালো দীর্ঘ রাতের অন্ধকারে নির্জন সাধনায় মেতে থাকতেন বৈষ্ণবীয় সাধক কূল। এভাবেই টহল গানের চর্চা বাংলার আকাশ বাতাস জয় করেছিল।”

এক একটা গ্রামে বিভিন্ন জাতির বাস। তাঁদের মধ্যে যাঁরা বৈষ্ণব ধর্মাবলম্বী বা চলতি কথায় বৈরাগী তাঁরাই সাধারণভাবে এই টহল গান গেয়ে থাকেন। তবে বৈরাগীর অভাবে বা ইচ্ছা থাকলে অন্য জাতির লোকও এ গান গাইতে পারেন। এতে কোনও সামাজিক বাধা নেই। গায়ে ধুতি পরে, নগ্ন পায়ে, মাথায় পাগড়ি পরে, কপাল থেকে নাক অবধি তিলক কেটে, ভালো করে চাদরখানা জড়িয়ে হাতে খঞ্জনি নিয়ে ভৈরব রাগে গাইতে থাকেন, “নিশি হলো ভোর ওরে মাখন চোর!/ বলাই দাদা তোরে ডাকিছে।/ ওরে নীলমণি, উঠে খাওসে ননী-/ দিনমনির উদয় হতেছে।”

লাইনের শেষাংশটা লম্বা করে টেনে গেয়ে যান। এক আশ্চর্য মাদকতা থাকে। তবে শুধু ভগবান শ্রীকৃষ্ণ বা চৈতন্য মহাপ্রভুর ঘুম ভাঙানোর জন্যই গান রচনা করা হয়নি; শ্রীরাধিকার ঘুম ভাঙাতেও গান বাঁধা হয়েছে। কৃষ্ণপ্রাণা রাধিকা তাঁর কৃষ্ণের কোলে মহাসুখে নিদ্রারত। তাঁদের পোষ্য আদরের পাখিদ্বয় শুক-সারি রাধাকে ডেকে তুলছে সেটাই গান আকারে ব্যক্ত হচ্ছে, যেমন- “রাই জাগো রাই জাগো বলে/ শুক-সারি ডাকে/ কত নিদ্রা যাও হে তুমি/ কালো মানিকের কোলে।”

রাধামাধব মণ্ডল জানাচ্ছেন, দীর্ঘ রাতের অবসানে সাধক শিল্পীরা নগরের দ্বারে দ্বারে এই গান গেয়ে ফেরেন হেমন্তের ভোরবেলা। “প্রভাতও সময়ে শচির আঙ্গিনা মাঝে, আমার গৌরচাঁদ নাচিয়া বেড়ায় গো…”। তাই টহলকে ‘প্রভাতী সংগীত’ বলে। আর ‘ভোরাই’ বলে পদ্মাপারের বাংলায়। রাঢ় বাংলার গ্রামে গ্রামে গ্রামীণ ধর্মপ্রাণ মানুষের হৃদয়ে আজও টিকে রয়েছে কার্তিক মাসের প্রভাতী টহল গান। ২৩ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ধীর পায়ে সূর্য চলে যায় দক্ষিণায়নে। তখন দিন ছোটো, আর রাত হয় দীর্ঘ। শীতের রাতের অন্ধকারে, বাংলার কৃষককূলকে দস্যু দলের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতেই সে সময়ে গ্রামের দখলে থাকা বৈষ্ণব সমাজের মোড়লরা শুরু করেছিলেন প্রতি প্রহরে টহল গান। কালো দীর্ঘ রাতের নির্জনতা ভেঙে, তন্দ্রা আচ্ছন্নতা কাটিয়ে জাগিয়ে তোলাই ছিল লক্ষ্য।

শীতের রাতের অন্ধকারে, বাংলার কৃষককূলকে দস্যু দলের আক্রমণের হাত থেকে বাঁচিয়ে রাখতেই সে সময়ে গ্রামের দখলে থাকা বৈষ্ণব সমাজের মোড়লরা শুরু করেছিলেন প্রতি প্রহরে টহল গান।

টহল গান মুসলিম সমাজেও দেখা যায়। তবে তার স্থান কাল পাত্র আলাদা। টহুলে ফকির নামে একদল ফকির আছেন, যাঁরা বছরের বিশেষ সময়ে রাত্রি বেলায় বাড়ি বাড়ি গান গেয়ে ভিক্ষা করে বেড়ান। যেমন পূর্ব বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত রাইখ্যা ও বিরুরি গ্রামে এই টহুলে ফকিরের দল আছে। বিরুরির একজন ফকির ইদুল ফিতর ও বখরি ঈদের আগের দিন মুরগ্রামে এসে রাত এগারোটা থেকে ভোর পর্যন্ত গ্রামের রাস্তায় রাস্তায় আল্লা নবির কিস্যা গেয়ে বেড়ান। লোকবিশ্বাস, এই গান যে যে বাড়িতে পৌঁছাবে সেই সেই বাড়ি সৌভাগ্যশালী হয়ে উঠবে। গান শেষে ভোরবেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে সিধে তোলেন।

এ প্রসঙ্গে রাধামাধব মণ্ডল জানিয়েছেন, টহল সাধকরা বলেন, নামে কী এসে যায়! শুরুতে টহল গাইতেন সাধক বৈষ্ণবরাই। পরবর্তীকালে এই পথে হেঁটেছেন ফকিরের দল, বাউলের দল, জাত হারিয়েছেন গানের সুরের গণ্ডিতে এসেই। কীর্তনের প্রভাতী সুরের মাদকতায় খোয়া গেছে ধর্মের বেড়া।

এবার প্রশ্ন জাগতেই পারে যে এত মাস থাকতে কার্তিক মাসের ভোরগুলোতেই কেন টহল গান গাওয়া হয়? কিছু গবেষক মনে করেন, আগে বছরের শুরু হত অগ্রহায়ণ মাস দিয়ে। পরবর্তীকালে মুঘল সম্রাট আকবর খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে বৈশাখ মাস থেকে নতুন বছর শুরু করেছিলেন। কিন্তু তার আগে অগ্রহায়ণ মাসই বছরের প্রথম মাস ছিল। তাহলে কার্তিক মাস হচ্ছে বছরের শেষ মাস। নতুন বছর ধান কাটার মধ্য দিয়ে শুরু হবে। তাছাড়া কার্তিক ঠাকুর প্রজননের দেবতা। নতুন বছরকে আবাহনের জন্যই বোধহয় বছরের শেষ মাসের ভোরগুলোতে ভগবানের নাম স্মরণ করা শুরু হয়েছিল। যাতে গ্রামের সকল অশুভ শক্তি দূর হয়ে শুভ শক্তির জাগরণ ঘটে। কার্তিক মাসের ভোরবেলা জুড়ে ভগবান কৃষ্ণের নাম গান করা হয়, যাতে শ্রীহরি তাঁর নিজের নামগান শুনেই ঘুম থেকে উঠতে পারেন। এরপর নতুন দিনের সূর্যের আবাহন। তাই আজও বুকের মধ্যে অনুরণন তৈরি করে দেহাতি মাটির ভিতর টহলের অনুভবী চলন।

____

রাধামাধব মণ্ডলের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে অনুলিখিত

Developed by DXDasia