এনআরএস-এর ঘটনা অনেকগুলি প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল

আক্রমণকারীরা শাস্তি পাক, দ্রুত চিকিৎসায় ফিরুন ডাক্তাররাও

“রোগী ভালো হয় ভগবান বা আল্লার কৃপায়। কিন্তু রোগী মারা গেলে মন্দির মসজিদে ভাঙচুর না হয়ে ভাঙচুর হয় হাসপাতালে।”

সকালেই হোয়াটসঅ্যাপে ঢুকল জনৈক এক চিকিৎসকের মেসেজ। বলাই বাহুল্য, মেসেজের লক্ষ্য এনআরএস হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর আক্রমণের ঘটনা। খুলিতে গুরুতর চোট পেয়ে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায়। গুরুতর আহত হয়েছেন যশ টেকওয়ানি নামের ইন্টার্নও। আর এই ঘটনার পরেই জুনিয়র চিকিৎসকদের বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা রাজ্য। এনআরএস হাসপাতালে জুনিয়র ডাক্তাররা গেটে পোস্টার লাগিয়েছেন ‘শাট ডাউন এনআরএস’। প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়েছে রাজ্যের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই। সর্বত্রই আউটডোর পরিষেবা স্থগিত রাখার দিদ্ধান্ত নিয়েছেন জুনিয়র ডাক্তাররা। প্রকারান্তরে তাদের সমর্থন জানিয়েছেন সিনিয়র ডাক্তাররাও। যৌথ মঞ্চের তরফে আবেদন রাখা হয়েছে আজ সরকারি-বেসরকারি সব হাসপাতালেরই আউটডোর পরিষেবা বন্ধ রাখার। যতক্ষণ না দোষীরা সবাই শাস্তি পাচ্ছে, যতক্ষণ না চিকিৎসকদের ওপর বারবার নেমে আসা আক্রমণের সুরাহা হচ্ছে, ততক্ষণ এই প্রতিবাদ চলবে—জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

স্বাভাবিকভাবেই চিকিৎসকদের এই প্রতিবাদে বেশ সমস্যার মুখে পড়েছেন অসুস্থ মানুষ এবং তাদের পরিজনরা। চিকিৎসা ব্যাহত হওয়ায় আরো ক্ষোভ বাড়ছে। সমস্যা জটিলতর হচ্ছে। এবং, এরই মধ্যে আক্রমণকারীদের ধর্ম-পরিচয় নিয়ে নানা উস্কানিমূলক বক্তব্যও ছড়িয়ে পড়েছে। সবমিলিয়ে জল বেশ ভালোমতোই ঘোলা হয়ে উঠেছে।

মুশকিল হল, আপনি কোন অবস্থানে দাঁড়াবেন? ঘটনার সূত্রপাত একজন বয়স্ক রোগীর চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ ঘিরে। সেই মানুষটি ঘটনাচক্রে মারাও যান। তারপরই নাকি মৃত মানুষটির আত্মীয়রা চড়াও হন কর্তব্যরত জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর। প্রতিবাদ করেন ডাক্তাররাও। অবস্থা গুরুতর হয়ে ওঠে ক্রমশ। তারপর রাতে এনআরএস চত্বরে ট্রাকভর্তি লোক এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর। সেই আক্রমণেই গুরুতর আহত হন যশ, পরিবহ-রা।

সাদা চোখে দেখলে, এই ঘটনার তীব্র নিন্দে করতেই হয়। যে-কোনো যুক্তিতেই হাসপাতাল চত্বরে গুন্ডাগিরি বরদাস্ত করা যায় না। রাত্রিবেলা ট্রাকে করে লোহার রড নিয়ে এসে আক্রমণ তো ভয়ঙ্কর ব্যাপার। দুষ্কৃতীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারি চাওয়া ন্যায্য যুক্তি। ইতিমধ্যে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করাও হয়েছে। বাকিদেরও করা উচিত। 

কিন্তু তারপরেও কতগুলো কথা থেকেই যায়। এক, এই ঘটনা তো বিক্ষিপ্ত ঘটনা নয়। চিকিৎসকদের ওপর ক্ষোভ ও আক্রমণের চরিত্রটিও ক্রমে সামাজিক হয়ে উঠছে। আজই যেমন বর্ধমান মেডিকেল কলেজেও আক্রান্ত হয়েছেন জুনিয়র ডাক্তাররা। এটিকে যদি সামাজিক বিকার বা অসুখ হিসেবে ধরি, তাহলে কীভাবে প্রশাসনের পক্ষে গ্রেপ্তারি বা শাস্তি দিয়ে তার প্রতিকার সম্ভব? উত্তর পাচ্ছি না।

যেমন উত্তর পাচ্ছি না, এই ক্ষোভের কারণ খুঁজতে গিয়েও। চিকিৎসায় গাফিলতি, চিকিৎসকদের অবহেলা, সরকারি হাসপাতালগুলির বেহাল পরিকাঠামো—এই অভিযোগগুলো সাম্প্রতিক অতীতে বারবার উঠে এসেছে। পাশাপাশি উঠে এসেছে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার মাত্রাতিরিক্ত খরচের কথাও। অর্থের মোহে ডাক্তারি যে একটি মহৎ পেশা, সেটা নাকি ভুলে যাচ্ছেন অনেক ডাক্তার। তার ওপর অনেক ডাক্তারের ব্যবহারও অমানবিক। এনআরএস কাণ্ডেও নাকি জুনিয়র ডাক্তাররা বেশ খারাপ ব্যবহারই করেছিলেন রোগীর পরিবারের সঙ্গে। সব মিলিয়ে ডাক্তার ও চিকিৎসা-ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাস নষ্ট হয়েছে, ক্ষোভ জন্মেছে। তারই ফলাফল এই সামাজিক ঘৃণা, আক্রমণ। 

উল্টোদিকে ডাক্তারদেরও বহু কিছু বলার আছে। বিশেষ করে জুনিয়র ডাক্তারদের। টানা ৪৮ ঘণ্টা, ৩৬ ঘণ্টা ডিউটি, টানা রোগীর চাপ সামলাতে সামলাতে আবেগ, মানবিকতাগুলো কেমন যান্ত্রিক হয়ে যায়। তার ওপর সরকারি হাসপাতালের পরিকাঠামো নিয়ে অভিযোগ তো আছেই। সেখানে এত খাটনি, রাত জেগে ডিউটির পরে যদি ভুলও হয় কোনো, তার ফলাফল এত মারাত্মক হবে! জুনিয়র ডাক্তাররাও তো মানুষ। তাছাড়া, অর্থলোভী, গাফিলতি করা ডাক্তারের সংখ্যাও শতাংশের বিচারে কম—বলছেন তাঁরা। সেক্ষেত্রে কয়েকজনের জন্য গোটা ডাক্তার-মহলকেই এমন আক্রমণ, সামাজিক ঘৃণার মুখোমুখি কেন দাঁড়াতে হবে? তাঁদেরও ক্ষোভ জমছে বহুদিন ধরেই। তারই ফলাফল এই প্রতিবাদ, বিক্ষোভ, চিকিৎসা বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত। অসুস্থ মানুষদের অসুবিধে হলেও তাঁরা অনড়। মানবিকতা দেখিয়েও যখন ঘৃণা ও আক্রমণই জোটে, তখন এই প্রতিবাদই নাকি একমাত্র পথ।

রোগী এবং ডাক্তার দু’পক্ষেরই ক্ষোভের আড়ালের যুক্তি ন্যায্য। অবশ্যই জুনিয়র ডাক্তারদের ওপর নৃশংস আক্রমণ ঘৃণ্য। এবং, ডাক্তারদের এই প্রতিবাদে যদি কোনো অসুস্থ মানুষের প্রাণহানি ঘটে, সেটাও অবশ্যই বিরোধিতা করার মতোই ঘটনা। পাশাপাশি এনআরএসে আক্রমণকারীদের সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে সামনে এনে যে মেরুকরণ ও বিদ্বেষের চেষ্টা চলছে, সেটাও ধিক্কারযোগ্য। সব মিলিয়ে, সহজে পক্ষ নিতে পারবেন না আপনি। গোটা ক্ষোভ-বিক্ষোভের চরিত্রটাই বড়ো জটিল এবং অবশ্যই সামাজিক। সমাজ যেখানে এতখানি জড়িয়ে থাকে, সেখানে প্রশাসন কতটুকু, কী করতে পারে জানা নেই। তবু আমরা তো প্রশাসনের কাছেই সুরাহা চাই, দাবি করি, আশা করি… 

আপাতত প্রধান দাবি হোক, ডাক্তারদের ওপর আক্রমণকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারি। দাবি হোক, সরকারি হাসপাতালগুলির পরিকাঠামোর উন্নয়ন। দাবি হোক, বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ কমানো। এবং পাশাপাশি ডাক্তারদেরও মানুষ হিসেবে দেখতে শিখি আমরা। বুঝতে শিখি, তাদেরও ভুল হয়, হতে পারে। আর আন্দোলনরত ডাক্তারদের কাছে আবেদন জানাই, তাঁরা যেন দ্রুত চিকিৎসায় ফেরেন। প্রতিবাদ জারি থাক প্রয়োজনে। কিন্তু চিকিৎসা থামিয়ে না।

এর বেশি আর কীই বা চাইতে পারি আমরা!

Developed by DXDasia