
পরভা নাচের জন্য ১৬টি জাতীয় মুখোশ তৈরি হয়েছিল
ছৌ নাচের হারিয়ে যাওয়া একটি ধরণ নিয়ে কাজ করেছেন গবেষক তথা পরিচালক অবন্তী সিনহা (Abanti Sinha)। কী সেই ধরণ? নামটা অবশ্য একালে একেবারেই অপরিচিত। পরভা। নৃত্যশিল্পী অলকানন্দা রায়ের (Alokananda Roy) কথোপকথন দিয়েই শুরু হয় ২৭’তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (Kiff’2022) তথ্যচিত্র ‘পরভা ছৌ-এর সন্ধানে’। তিনিও অকপটে স্বীকার করেন, এত বছরের নৃত্যজীবনে তাঁর কাছেও সম্পূর্ণ অজানা ছিল পরভা নাচের কথা। তবে এখন আর অজানা বলা চলেনা। কারণ, পরভা আসলে কী? তার উত্তর দিতে একটুও খামতি রাখেননি পরিচালক। যখন যেভাবে যতটুকু খুঁজে পেয়েছেন সবটাই ক্যামেরাবন্দী করেছেন তিনি।
তথ্যচিত্রের দৃশ্যের সঙ্গে যেন ওতপ্রোতভাবে মিলেমিশে গেছে পরিচালক অবন্তী সিনহার জার্নি। ৪৮ মিনিটের ছবি জুড়ে কোথাও একটুও একঘেঁয়ে লাগার অবকাশ নেই। রয়েছে গল্প বলা, নতুন কিছু খুঁজে পাওয়ার আনন্দ, অথবা আগামী নিয়ে দুশ্চিন্তা। সবটুকুই খুব সাবলীল কথা বলার ভঙ্গিতে চোখের সামনে তুলে ধরেছেন পরিচালক।

হাওড়া স্টেশন থেকে থেকে শুরু হয়েছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া পরভা ছৌ সংস্কৃতি সন্ধানের সফর। যেন এক চলমান সময়ের কথা বলে তথ্যচিত্রটি। সময়ের স্রোতে ধাক্কা খেয়ে তলিয়ে যাওয়া এক ঐতিহ্যকে টেনে নতুন আলোয় আনার কথাও বলে।
সিনেমা প্রদর্শনীর শুরুতে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং পরিচালক অবন্তী সিনহা। তিনি নিজেই জানান তাঁর অভিজ্ঞতার কথা। “বাংলার লোকঐতিহ্যের এই অজানা দিকটি নিয়ে বাংলায় প্রথম কাজ হচ্ছে। দেশের বাইরেও যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছে কাজটি। তবে আজ নিজের শহরে প্রথম দেখানো হচ্ছে বলে আনন্দ অনেকটা বেশি”, বলেন অবন্তী সিনহা।

প্রকৃতপক্ষে ছৌ নাচের তিনটি ঘরানা। একটি ওড়িশার সরাইকেলা, দ্বিতীয়টি পুরুলিয়া এবং শেষটি চিল্কিগড়ের (Chilkigar) ছৌ নাচ, যা পরভা নৃত্য (Parva Chhau) নামে পরিচিত। সরাইকেলা, পুরুলিয়ার থেকে পরভা ছৌ ব্যতিক্রমী। বাংলার লোকনৃত্যের ভাণ্ডারে ছৌ নাচ একটি রত্ন। এর নান্দনিক বৈশিষ্ট্য, মুখোশ আঁটা শিল্পীদের ঘোরা, লাফানো, রণবাদ্য নাচটিকে জনপ্রিয় করেছে ক্রমশ। তবে সময়ের সঙ্গে টিকে থাকার লড়াইয়ে পুরুলিয়া এবং সরাইকেলার ছৌ নাচ থেকে গেলেও ক্রমশ হারিয়ে গিয়েছে লোকনৃত্য পরভা।
প্রকৃতপক্ষে ছৌ নাচের তিনটি ঘরানা। একটি ওড়িশার সরাইকেলা, দ্বিতীয়টি পুরুলিয়া এবং শেষটি চিল্কিগড়ের (Chilkigar) ছৌ নাচ, যা পরভা নৃত্য (Parva Chhau) নামে পরিচিত।
পুরুলিয়ার ছৌ নাচ বর্তমানে প্রায় বিশ্বজয়ের পথে। কিংবদন্তী ছৌ শিল্পী পুরুলিয়ার গম্ভীর সিং মুড়া পদ্মশ্রী পেয়েছেন। অন্যদিকে ভারতে বড়লাটের জন্ম উৎসবে সরাইকেলার ছৌ নাচ প্রদর্শিত হয়েছিল। কিন্তু চিল্কিগড়ের পরভা ছৌ প্রথম দিকে রাজপরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরভার মুখোশগুলো কাঠের তৈরি। মুখোশগুলো মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত বিস্তৃত। এই পরভা সংস্কৃতি মূলত ছিল রাজ পৃষ্ঠপোষকতায় পুষ্ট। চৈত্র সংক্রান্তি থেকে বৈশাখ পর্যন্ত চিল্কিগড়ের রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে সন্ধ্যায় শিল্পীদের মহড়া চলত।
বৈশাখের শেষে অথবা জ্যৈষ্ঠের শুরুতে শনি-মঙ্গলবার করে শিবের গাজন উপলক্ষে পক্ষকাল ধরে প্রতি সন্ধ্যায় পরভা ছৌ ছিল জামবনি থানার শত শত মানুষের প্রিয় বিনোদন। পালাগুলোর মধ্যে ছা–সোহাগী, বাবু ছৌ, ভূত ছৌ, বাঘ ছৌ, সিংহ ছৌ উল্লেখযোগ্য। শেষ দিনের আকর্ষণ ছিল সতীর পালা। পরভা পালার জন্য গণেশ চতুর্ভুজা, ষড়ানন, সরস্বতী, লক্ষ্মী, অরুণ, বরুণ, কাক, কুমির, গোরুর মাথা, দশভুজা, যমরাজ, রাবণ, শিব, কার্তিক প্রভৃতি। কাঠ কুঁদে মুখোশগুলো তৈরি করা হত। প্রায় ১৬টি এ জাতীয় মুখোশ তৈরি হয়েছিল। যার মধ্যে ১২টি চিল্কিগড়ের রাজ পরিবারের কাছ থেকে উদ্ধার করে ঝাড়গ্রামের লোকসংস্কৃতি সংগ্রহশালায় রাখা আছে। বাকি ৪টি পরভা আগুনে পুড়ে গিয়েছে। এই সমস্ত ইতিহাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দিয়েছেন সমগ্র তথ্যচিত্র জুড়ে।

কালক্রমে রাজ্যপাট গেলে পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে পরভা ক্ষয়িষ্ণু হতে হতে বিশ শতকের নয়ের দশকে স্তব্ধ হয়ে গেল। হারিয়ে গেল চিল্কিগড় ঘরানার ব্যতিক্রমী পরভা ছৌ। চিল্কিগড়ের রাজ পরিবারও ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। সুবিশাল রাজপ্রাসাদ আজ পরিত্যক্ত। শিল্পী ও বাদ্যকারদের অধিকাংশ এখন প্রয়াত।
আরও পড়ুন: বাংলার শিল্পীদের ভাবনায় কালী
রাজ্য সরকারের সহায়তায় এবং কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগে নতুন শিল্পী ও বাদ্যকারদের নিয়ে ২০১৭ সালে মাসাধিক কাল মহড়া চালিয়ে গত ২০১৭ সালের শেষদিনে কলকাতার রবীন্দ্র সদনে নবরূপে পরভা-ছৌ আবার আত্মপ্রকাশ করেছিল। কিন্তু সমাজের একটা বৃহৎ অংশ আজও না জানার দলেই রয়ে গেছেন। আর এই অজানা কিছুরই সন্ধানে মাইলফলক হয়ে থাকতে পারে অবন্তী সিনহার তথ্য চিত্র ‘পরভা ছৌ-এর সন্ধানে’।
পরভা ছৌ সম্পর্কে পরিচালকের অভিজ্ঞতা বিস্তারিত জানতে
