‘বখেই’ যেতে বসা রবিশঙ্করকে সুরের প্রেমে স্থায়িত্ব দিয়েছিলেন আলাউদ্দিন খাঁ

একাধিক প্রেম, শিল্পী রবিশঙ্করের প্রেমিক জীবনও বিস্ময়ের

“মনে আছে, আমার এক প্রিয় বান্ধবী আমাকে বলেছিল, আমি তোমার পঞ্চম=সে= গারা হতে চাই। ওই তুমি যে গারার মুখটা বাজাও, তারপর কোথায় চলে যাও– কত অন্য রাগে ধুনে তানে গিয়ে মিশে যাও; তারপর কীরকম মাঝেমাঝে ফিরে আসো সেই পঞ্চম সে গারার মুখটাতে…”

পণ্ডিত রবিশঙ্করের স্মৃতিচারণা। প্রেমের সে এক জটিল সমীকরণ। ছেড়ে যাওয়া আর ফিরে-ফিরে আসা– এভাবেই হয়তো নিজের সুরসাধনা ও প্রেমকে মিলিয়ে ছিলেন তিনি। আমাদের ছাপোষা জীবন দিয়ে সেসবের অনেক অঙ্কই মেলানো সম্ভব নয়। তবু, একথা স্বীকার করতেই হয়, রবিশঙ্করের প্রেম-জীবন আমাদের বেশ বিস্মিত করে। ধাঁধায় ফেলে বারবার। 

তাঁর প্রেমে পড়া শুরু বেশ ছোটো বয়স থেকেই। দাদা উদয়শঙ্করের ট্রুপে নাচের সময় নাকি ‘বখে’ই যেতে বসেছিলেন প্রায়। প্রেমের তখন এমনি জোয়ার। কিন্তু শেষপর্যন্ত তাতে হাবুডুবু খেলেন না। সামলে নিলেন। সামলে নিলেন অবশ্য প্রেমকে সম্বল করেই। বাবা আলাউদ্দিন খাঁ শেখালেন সঙ্গীতের প্রেম। নিষ্ঠা আর গভীর সাধনা ছাড়া যাকে পাওয়া অসম্ভব। এখান থেকেই রবিশঙ্করের নবজীবনের সূত্রপাত। নতুন প্রেমেরও। 

রবিশঙ্করের সঙ্গীতজীবনের পাশাপাশি বারবার আলোচিত হয়েছে তাঁর ব্যক্তিজীবন। যদিও ব্যক্তিজীবন আর সঙ্গীতজীবন আদতে খুব পৃথক নয়। এই দু’য়ের ভিতর তেমন দূরত্ব কিছু নেই। আর এও সত্য, যে রবিশঙ্করকে সাধারণের চেনা তাঁর বাদ্যের ভিতর দিয়েই। তবু, আমাদের এদেশীয় চিন্তাকাঠামোতে কপালে খানিক ভাঁজ ফেলে বৈকি। হতে পারে তা খানিক আরোপিতই। কিন্তু চারিত্রিক ‘শুদ্ধতা’-কে কঠোরভাবে আজও মেপে দেখা হয়। আর সেখানে আশ্চর্য বেমানান রবিশঙ্করজি। 

 ১৯২০ সালের ৭ই এপ্রিল বেনারসে জন্মেছিলেন। কলকাতায় বা বাংলাদেশে রবিশঙ্কর খুব বেশিদিন যে ছিলেন, তা নয়। খুব সত্যি করে বলতে গেলে, কোনোখানেই তাঁর বসবাস খুব বেশিদিনের নয়। ভ্রাম্যমান একজন শিল্পী, একজন সুরকার, সঙ্গীতজ্ঞ। অনেক ছোটোবেলা থেকেই বাইরে-বাইরে কাটানো জীবন তাঁর। তবে হ্যাঁ, বাবা আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের সঙ্গে আজীবনের এক সংলগ্নতাই তিনি চেয়েছিলেন। বারানসি থেকে ১৬০ কিলোমিটার দূরে মাইহার। আলাউদ্দিন খাঁ সাহেবের আস্তানা। সেখানে থেকেই সঙ্গীতকে চেনা-জানা-সম্ভোগ রবিশঙ্করের। ‘সম্ভোগ’-এর কথা নিজেই বলে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গীতকে যাপন করতে গিয়ে সম্ভোগকে বিশেষ গুরুত্বই দিয়েছিলেন পণ্ডিতজি।  

সেই দশ বছর বয়স থেকে দাদা উদয়শঙ্করের সঙ্গে দেশের বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ানো। অনেক ছোটো বয়স থেকেই জীবনকে অনেকটা বড়ো স্কেলে দেখে ফেলেছিলেন। ইউরোপকে নিজের মধ্যে ধারণ করার সুযোগ মিলেছিল তাঁর। নাচের ট্রুপে বিদেশিনীদের ভিড়। তাদের অনেকের সঙ্গেই সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। সদ্য কৈশোর যখন প্যারিসের লাস্যময় রাত্রির সঙ্গী হচ্ছেন একাধিকবার।

এক প্রেম থেকে অন্য প্রেমে সহজে বয়ে গিয়েছেন। কখনো বা একই সঙ্গে একাধিক প্রেমসম্পর্কে জড়িয়েছেন। আত্মজীবনীতে তিনি বলেইছেন, একসঙ্গে একাধিক নারীকে উজাড় করে ভালোবাসার ক্ষমতা আছে তাঁর। সেসব সম্পর্ককে আড়াল করে নিজের মিথ্যে কোনো চরিত্র সাজাননি কখনো। অস্থিরও ছিলেন খানিক। নাচ চালিয়ে গেলেও যন্ত্রসঙ্গীত তাঁকে তখন প্রবলভাবে টানছে তখন। সবরকম যন্ত্র বাজানোর চেষ্টাও করছেন। এই সময়ই আলাউদ্দিন খাঁ উদয়শঙ্করের ট্রুপে যোগ দিচ্ছেন। এবার সত্যিই যেন মাটি পাচ্ছেন রবিশঙ্কর। এমনিতে দীর্ঘ দীর্ঘ প্রবাস। ভিতরে ভিতরে কোথাও স্থিতির সন্ধান করেছিলেন তিনি। সেই স্থিতিই এল আলাউদ্দিন খাঁর সান্নিধ্যে ও স্নেহে।

কৈশোর পেরিয়ে যৌবনে যখন সদ্য পা রাখছেন। নাচের ট্রুপে উজরার সঙ্গে প্রেমালাপ শুরু। ভারী সিরিয়াস সে প্রেম। তবে সেখান থেকেই অন্য-এক সম্পর্ক গড়াচ্ছে বিবাহে। অন্নপূর্ণা দেবীর সঙ্গে আলমোড়ায় বিয়ে হচ্ছে রবিশঙ্করের। কিছুকাল দাম্পত্য। ফের কমলার সঙ্গে ভাব। সেখানে থাকতে থাকতেই রানি, স্যু জোন্স, সেখান থেকে সুকন্যা… অসংখ্য সম্পর্কের খতিয়ান।  কাউকে প্রথা মেনে বিবাহ করছেন, আবার কাউকে করছেন না। কেউ আহত হচ্ছেন আবার কেউ মেনে নিচ্ছেন পুরোটাই। কিন্তু কোথাও কোনো রাখঢাক নেই পণ্ডিতজির। অভিমানও ধারণ করছেন। আবার অনুরাগও। ঠিক সঙ্গীতজ্ঞা নারীকে প্রেয়সী হিসেবে চাননি তিনি। চেয়েছিলেন, সুরের রসিকা কাউকে। খুব মনে হয়, নিজেকে প্রেমিকার চোখে সমানস্তরের করে রাখাটা তাঁর কাঙ্ক্ষিত ছিল না।

যাইহোক, বারবার নতুন তারে জীবনকে সাজাচ্ছেন তিনি। কোথাও বাইরের কোনো আগল রাখছেন না।  প্রবল মুক্ত, স্বাধীন জীবন। বহু মানুষের সঙ্গলাভ। অথচ নিঃসঙ্গতাই নাকি ছিল তাঁর স্থায়ী ভাব। রবিশঙ্কর বলছেন, বহু শিল্পীই নাকি নিঃসঙ্গতা,  অবসাদে জারিত হয়ে মদ্যপ হয়েছেন। নানান নেশায় নিজেদের শেষ করেছেন। তাঁর এমন কোনো নেশা লাগেনি। অবসাদ হলে প্রেমে বুঁদ হয়েছেন। সুপুরুষ তিনি আজীবন। বোজা চোখে সেতারের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাঁর আঙুলের জলের মতো  বয়ে যাওয়া বহু নারীকে আকৃষ্ট তো করেইছে। তাই বান্ধবীর অভাব হত না কোনোদিন। তাদের আশ্রয় করে ইমন কল্যাণে ঢেউ জাগাতেন রবিশঙ্কর। জীবনের শেষমুহূর্ত অবধি।

প্রছদের ছবি-ঋণ: http://whatsthescene.com

Developed by DXDasia