
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্বের জ্ঞানার্জনের একটি আশ্রয় তৈরি করতে, প্রথম উপাচার্য হলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর
গল্পটা শুরু হয় বোলপুরের ছাতিমতলায়, ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর রায়পুরের জমিদারবাড়িতে আসছিলেন নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। পথে বোলপুরের ছাতিমগাছের তলায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম করেন এবং খুঁজে পান, প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি। স্থান মাহাত্ম্য হয়তো কিছু থাকে। ভবিষ্যৎ মহীরূহ হবার জন্য বীজ বপন করে যায় সংবেদনশীল মানুষের মনের গভীরে। দেবেন্দ্রনাথ কি মহাকালের ইঙ্গিত পেয়েছিলেন মনে মনে? হয়তো তাই রায়পুরের জমিদারের কাছ থেকে কুড়ি বিঘা জমি কিনে নিয়েছিলেন। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির মতো করেই তৈরি করালেন একটি দোতলা বাড়ি, ব্রহ্ম উপাসনার জন্য। উপনয়নের পরে রবীন্দ্রনাথও এই বাড়িতেই এসেছিলেন। তারপর চল্লিশ বছর বয়সে প্রথম যখন শান্তিনিকেতনে পাকাপাকিভাবে থাকতে আসবেন রবীন্দ্রনাথ, এই বাড়িটিতেই থাকতে শুরু করবেন। এখন এই বাড়িটিই ‘হেরিটেজ বিল্ডিং’! সামনে রামকিঙ্কর বেইজের তৈরি একটি মূর্তি— ‘অনির্বাণ শিখা’। এক জননী শান্তিনিকেতনকে শিশুর মতো কোলে তুলে নিয়ে তার মঙ্গলকামনা করছেন। সকাল ও বিকেলে যখন রোদের ছায়া লম্বভাবে পড়ে মূর্তিটির উপর, তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে তার ভাবটি। রবিঠাকুরের বড়ো যত্নে গড়া শান্তিনিকেতনের গল্প বলি আজ।
বিশ্বভারতীর প্রধান গেট
১৯০১ সালের ২২ ডিসেম্বর, (৭ পৌষ) শান্তিনিকেতন আশ্রম সৃজনের প্রথম পদক্ষেপ নিলেন রবীন্দ্রনাথ। উপলব্ধি করলেন তাঁর অন্তরের দেবতা তাঁকে শুধু দেউরিতে বাঁশি বাজানোর ভার দেননি, শান্তিনিকেতনের অবারিত আকাশ তাঁর কর্মভূমি হয়ে তাঁকে ডাক পাঠালো। একসময়ের স্কুল পালানো ছেলেটি বিপ্লব ঘটিয়ে দিলেন শিক্ষার ভুবনে। প্রাচীন তপোবনের আদর্শে তিনি সম্পূর্ণ নিখাদ একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে সেই মহর্ষির ছাতিমতলাকে কেন্দ্র করেই। অনেক সংগ্রাম, একাগ্রতা নিয়ে মগ্ন রবীন্দ্রনাথ গেঁথে চললেন একটি একটি করে ভাবনার ইমারত। সোনার কাঠি ছুঁইয়ে জাগিয়ে তুলতে চাইছিলেন প্রাচীন অতীত ভারতকে। রবীন্দ্রজীবনে এ এক নতুন অধ্যায়।
বলেন্দ্রনাথ ঠাকুর সামিল হয়েছিলেন এই কর্মযজ্ঞে।পরিকল্পনা করেছিলেন এক ব্রহ্মবিদ্যালয়ের। কিন্তু বলেন্দ্রনাথের অকাল মৃত্যু কিছুসময়ের জন্য থমকে দিয়েছিল রবীন্দ্রনাথের কর্মোদ্যমকে। কিন্তু একলা চলার মন্ত্র কবচ কুণ্ডলের মতো ছুঁয়েছিল রবিঠাকুরের মন। তাই আবার শুরু হল আশ্রম প্রতিষ্ঠার কাজ। পরিচয় হল এক ‘বিস্ময়কর গতিময় বিচিত্রমনা পুরুষ’ ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের সঙ্গে। রবীন্দ্রনাথ ‘আশ্রমের রূপ ও বিকাশ’ বক্তৃতায় নিজেই বলেছিলেন, ‘এই শান্ত জনবিরল শালবাগানে অল্প কয়টি ছেলে নিয়ে ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের সহায়তায় বিদ্যালয়ের কাজ আরম্ভ করেছিলুম।’ খুব অল্প সংখ্যক ছাত্র নিয়ে শুরু হয়েছিল বিদ্যালয়ের কাজ। নিজের সন্তানদেরও এই আশ্রমেই বিদ্যালাভের জন্য যুক্ত করিয়েছিলেন তিনি। জহুরির চোখ দিয়ে শিক্ষক খুঁজে তাঁদের নিযুক্ত করেন আশ্রমের কাজে। অর্থ নয়, প্রতিপত্তি নয়! নিষ্ঠা আর স্বপ্ন — এই ছিল রবিঠাকুরের পুঁজি। একে একে ঘটে যাবে অলৌকিক যোগাযোগ। আশ্রমের কাজে মগ্ন হবেন জগদানন্দ রায়, সতীশচন্দ্র রায়, হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিত চক্রবর্তী, বিধুশেখর শাস্ত্রী, ক্ষিতিমোহন সেন, নেপালচন্দ্র রায়, সন্তোষচন্দ্র মজুমদার, নন্দলাল বসু, সরেন্দ্রনাথ কর, রামকিঙ্কর বেইজ, প্রভাত মুখোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্ব! বিদেশ থেকে এসে আশ্রমের কাজে নিজেদের নিয়োজিত করেন অ্যান্ড্রুজ আর পিয়ার্সন।
ছাতিম তলা
রবীন্দ্রনাথ শিক্ষাকে করে তুলতে চেয়েছিলেন জীবনের অঙ্গ। সে শিক্ষায় ক্লাস নামধারী কোনো খাঁচার জিনিস হবে না। পৌষ উৎসবের দিন ব্রহ্মবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দিনে চারিদিকে মেলা বসেছে। তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনটি ছিল অত্যন্ত প্রাণবন্ত।— ‘–চারিদিকে যেন আনন্দের বাজার। আমরা এই জনতা ভেদ করিয়া ব্রহ্মবিদ্যালয়ে [বলেন্দ্রর বিদ্যালয়ের জন্য নির্মিত বাড়িতে] প্রবেশ করিলাম। তথায় অপূর্ব দৃশ্য। কতগুলি বালক ক্ষৌম বস্ত্র পরিধান করিয়া বিনীত ভাবে উপবিষ্ট হইয়াছে। — দীক্ষাদান কালে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ওঁ নমো ব্রহ্মণে। ঋতং বদিষ্যামি। সত্যম্ বদিষ্যামি। তন্মামবতু। তদ্বক্তারম্ বতু। অবতুমাম্। অবতুবক্তারম্। ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ। ব্রহ্মকে নমস্কার। ঋত বলিব। সত্য বলিব। তিনি আমাকে রক্ষা করুন। তিনি বক্তাকে রক্ষা করুন।’ ছাত্রদের ধনবানের থেকে শ্রেষ্ঠ করার লক্ষ্যে এগিয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায় বেশ বলেছিলেন, ‘সেদিন থেকে শান্তিনিকেতনের শান্ত জনবিরল শালবাগানে অল্প কয়েকটি ছাত্র নিয়ে কবি আর এক নতুন কবিতা রচনায় মগ্ন হলেন।
১৯২১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রতিষ্ঠিত হল বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯১৯ সালের বৈশাখ মাসে ‘শান্তিনিকেতন’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথ ‘বিশ্বভারতী’ নামটির উল্লেখ করেন। ‘যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্’— এই ছিল বিশ্বভারতীর প্রাণভোমরা। রবীন্দ্রনাথ এই নামের ব্যাখ্যায় বলেছিলেন, সকলের জন্য ভারতের যে বাণী তাকে আমরা বলি বিশ্বভারতী। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের ভারত ভাবনা আর বিশ্বভাবনার মেলবন্ধন এই বিশ্বভারতী। রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন বিশ্বের জ্ঞানার্জনের একটি নীড় তথা আশ্রয় তৈরি করতে। বিশ্বভারতীর প্রথম অধ্যক্ষ ছিলেন বিধুশেখর শাস্ত্রী। প্রথম উপাচার্য রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বিদেশ থেকে প্রথম এসেছিলেন মার্ক কার্লঙ্ক সাহেব। ছাত্রদের জার্মান ভাষাতত্ত্ব পড়াতেন তিনি। রতনকুঠিতে থাকতেন মিস্টার বেনোয়া সাহেব, ফরাসী পড়াতেন। সস্ত্রীক ফরাসী অধ্যাপক সিলভ্যাঁ লেভি থাকতেন সুরপুরী বাড়িতে। উইন্টারনিৎস, লেসনি, তুচ্চি ফার্মিকি, কাসানোভা, তান ইয়ুন সুন, এলমহার্স্ট, হ্যারি টিম্বার্স, মিস গ্রিন, মিস সান্টাক্লাস, আর্থার গেডিসের মতো বিখ্যাত অধ্যাপক এসেছিলেন রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতী কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। তখন বিশ্বভারতীর আচার্য হয়েছিলেন জওহরলাল নেহেরু।
পাঠভবন
তিলে তিলে তিলোত্তমার মতো গড়ে উঠেছে আজকের বিশ্বভারতী। ছাতিমতলা, বকুল বীথি, উপাসনা ঘর, তালধ্বজ, তিনপাহাড়, আম্রকুঞ্জ, গৌর প্রাঙ্গণ, সিংহসদন, ব্ল্যাক হাউস, ভবন, মালঞ্চবাড়ি, নাট্যঘর, নন্দন, নাট্যঘর, রবীন্দ্র মিউজিয়ম — সবটাই স্বপ্ন! বিশ্বভারতী শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নের আনন্দ নিকেতনও! সেই অতীতসময়ের ছাতিম গাছের কথা মনে রেখে বিশ্বভারতীর শিক্ষার্থীদের মানপত্রের সঙ্গে দেওয়া হয় ছাতিম পাতা। অতীতের ভালো লাগার গন্ধ মিশে থাকে।
বিশ্বভারতীর বিদ্যাচর্চার কেন্দ্রগুলি বেশ কিছু বিভাগ রয়েছে। আনন্দ পাঠশালা আর সন্তোষ পাঠশালা একেবারে শিশু বিদ্যার্থীদের জন্য। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠক্রমের জন্য শান্তিনিকেতনে রয়েছে পাঠভবন। শ্রীনিকেতনে রয়েছে শিক্ষাসত্র। উচ্চশিক্ষাচর্চাকেন্দ্র ভাষাভবন, বিদ্যাভবন (আর্টস বিভাগ), কলাভবন, সংগীতভবন, শিক্ষাভবন (সায়েন্স বিভাগ), বিনয়ভবন, এগ্রিকালচারাল কলেজ, শিল্প সদন, সোশ্যাল ওয়ার্ক ইত্যাদি বিচিত্র বিভাগ এগিয়ে চলেছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে। বিশ্বভারতীর সেরা সম্মান ‘দেশিকোত্তম’।
প্রার্থনাগৃহ
শান্তিনিকেতনের আচার্য ক্ষিতিমোহন সেনের মন্ত্রোচ্চারণ ছিল অসাধারণ। তিনি ছিলেন পর্যটক। অনেক তথ্যের অন্বেষণে বহু তীর্থক্ষেত্রেও গিয়েছেন। সারাজীবনের অর্জিত অনুভূতি দিয়ে তিনি বলেছিলেন, শান্তিনিকেতন সর্বতীর্থসার। একটি ছোট্ট ব্রহ্মবিদ্যালয় থেকে বিশ্বভারতীর প্রতিষ্ঠার পথ সহজ ছিল না। গুজরাট থেকে কিছু অর্থসাহায্য পেলেও রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বভারতীর নির্মাণ ও সৃষ্টির জন্য সত্তর বছর বয়সেও ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে অর্থ সংগ্রহে বেরোতে হয়েছে। নিজের সঞ্চিত অর্থ, স্ত্রীর গয়না, সন্তানদের নিশ্চিত ভবিষ্যত সবকিছুই হব্য হিসেবে দান করেছিলেন বিশ্বভারতীর মহাযজ্ঞে।
বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার পর গড়িয়ে গেলো প্রায় একশোটি বছর। এখনো এই প্রতিষ্ঠানের প্রাণকেন্দ্রে রয়েছে রবিঠাকুরের স্বপ্ন। বিশ্বভারতী সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের উচ্চারণ আবার সত্য হোক— ‘ভারতবর্ষে যদি সত্য বিদ্যালয় স্থাপিত হয় তবে গোড়া থেকে সে বিদ্যালয় তার অর্থশাস্ত্র , তার কৃষিতত্ত্ব, তার স্বাস্থ্যবিদ্যা, তার সমস্ত ব্যবহারিক বিজ্ঞানকে আপন প্রতিষ্ঠানের চতুর্দিকবর্তী পল্লীর মধ্যে প্রয়োগ করে দেশের জীবনযাত্রার কেন্দ্রস্থান অধিকার করবে।’
বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন দেবেন্দ্রনাথের মতো রবীন্দ্রনাথেরও প্রাণের আরাম, মনের আনন্দ ও আত্মার শান্তি ছিল। এখনো ওই ছাতিমতলা, চৈত্রের শালবন, ভুবনডাঙা রূপকথার মতো এক স্কুলপালানো ছেলের নতুন শিক্ষাপদ্ধতির স্বপ্নকে ঘিরে রয়েছে। উতল হাওয়ায় কান পাতলে বুঝি শোনা যায় কবির কণ্ঠ—
‘যখন রব না আমি মর্ত্য কায়ায়
তখন স্মরিতে যদি হয় মন
তবে তুমি এসো হেথা নিভৃত ছায়ায়
যেথা এই চৈত্রের শালবন।’
সহায়ক গ্রন্থঃ
শান্তিনিকেতন বিদ্যালয় সূচনা, পূর্ণানন্দ চট্টোপাধ্যায়
রবীন্দ্র জীবনপ্রবাহ কালানুক্রমিক বর্ষপঞ্জি, গৌর চন্দ্র সাহা
