
সংগীত উদযাপনের ক্ষেত্রে সম্ভবত বাঙালিরাই সবথেকে বেশি উদ্যোগী
গুগল ঘাঁটলে যে কেউ জেনে নিতে পারবেন ‘ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে’ (World Music Day) কী এবং কেন। ইদানীং এই নিয়ে প্রচুর লেখালিখি হয়েছে এবং হচ্ছে। এই বিষয়টি যাঁর মস্তিষ্কপ্রসূত, তাঁর নাম জ্যাক ল্যাং (Jack Lang)। আশির দশকে ইনি তদানিন্তন ফ্রান্সের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী ছিলেন। বিশেষভাবেই সংগীতরসিক। জ্যাক ল্যাং ১৯৮২ সালে প্যারিসের সলস্টিতে ‘ফ্যাতে দে লা মিউজিক’ (Fate de la Music) বা ফেস্টিভ্যাল অফ মিউজিক শুরু করেন। প্রত্যেক বছরের ২১ জুন পালিত হয় বিশ্ব সংগীত দিবস। পালন করে ১২০টি দেশ। কিন্তু এই আয়োজন কখনোই সম্ভব হতো না, যদি না মরিস ফ্লেয়োরাঁ এবং চলচ্চিত্র পরিচালক মার্ক জনসন এবং সংগঠক হুইটান ক্রোয়েঙ্কে সহায়তা করতেন। মরিস ছিলেন অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক লেখক এবং প্রযোজক, আর ছিলেন জ্যাক ল্যাং-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মরিস ফ্লেয়োরাঁ ‘লিজিঅন অফ অনার’-এ ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি ফরাসি সংগীতের (French Music) একজন অন্যতম সংগঠক হিসেবে বিবেচিত হন। ১৯৯২ সালে দেহত্যাগ করেন এই বরেণ্য ‘রিদম অ্যান্ড ব্লুজ’ সংগীত শিল্পী। যার সুরারোপিত ‘বন কম্প’ বিশেষভাবে জনপ্রিয়। সেই কারণে তাঁর গ্র্যামি পুরস্কার প্রাপ্তি হয়। মরিস ফ্লেয়োরাঁ সম্বন্ধে একটু বেশি জানালাম। কারণ এঁর বিষয়ে কেন জানি না খুব একটা আলোচনা হয় না। এই ব্যক্তিত্ব ব্যতিরেকে শুধু জ্যাক ল্যাং-এর পক্ষে একাকী ফ্যাতে দেলা মিউজিক করা একেবারেই অসম্ভব ছিল।

এর পরিণতিটা ভারতবর্ষে থেকে বোঝা যাবে না। ইউটিউব খুলে ২০০৮ সালের ২১ জুন এনরিক ইগলেসিয়াস আর নাদিয়ার ‘Tried to Being Sorry’ যদি না শোনেন বা দেখেন। প্যারিস ১৬-এ পঞ্চাশ হাজার সংগীতপ্রেমী হাজির ছিলেন তাদের উন্মাদনা আর উচ্ছ্বাস নিয়ে। আমি লেখাটা লিখতে বসেছি ২১ জুন, ২০২২-এর সকালে। একজন উদারমনস্ক সংগীতপ্রেমী হিসেবে সংযুক্ত হওয়ার চেষ্টা করছি বিশ্ব সংগীত দিবসের সঙ্গে। আসুন এবার সরাসরি বাঙালিদের কথা বলি। বিশ্ব সংগীত দিবসের সঙ্গে আমাদের আত্মিক যোগ কতটুকু? আসলে সংস্কৃতি এবং সংগীত উদযাপনের ক্ষেত্রে বাঙালিরাই ভারতবর্ষে এবং সম্ভবত সারা পৃথিবীতে সবথেকে বেশি উদ্যোগী। তারাই বিশ্ব দরবারে প্রথম ভারতীয় সংগীতের আসন পাতলেন। পশ্চিমারা জানলেন, চিনলেন ইন্ডিয়ান মিউজিক (Indian Music)। ওয়েস্ট মিট ইস্ট হল। ইন্দো জ্যাজ সুইট হল। রবি শংকরের মেয়ে অনুষ্কাশংকর (Anoushka Shankar) ভীষণরকম চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ভারতীয় রাগ সংগীতের সঙ্গে ওয়েস্টার্ন মিউজিকের সংযুক্তিকরণে। কিন্তু তেলে-জলে মিশ খাচ্ছে কি? জানি না, আমি নেতিবাচক নই। ফিউশন মিউজিক বরাবরই আমার কাছে কালোয়াতির লড়াই বলে মনে হয়। সংগীতের মূর্চ্ছনায় মন জুড়ায় না। হাঁ করে বসে দেখতে হয় বা শুনতে হয় তালেবর সংগীতজ্ঞদের রেওয়াজি আস্ফালন।

আসলে সংস্কৃতি এবং সংগীত উদযাপনের ক্ষেত্রে বাঙালিরাই ভারতবর্ষে এবং সম্ভবত সারা পৃথিবীতে সবথেকে বেশি উদ্যোগী। তারাই বিশ্ব দরবারে প্রথম ভারতীয় সংগীতের আসন পাতলেন। পশ্চিমারা জানলেন, চিনলেন ইন্ডিয়ান মিউজিক। ওয়েস্ট মিট ইস্ট হল। ইন্দো জ্যাজ সুইট হল।
বরঞ্চ একজন বাঙালি প্রথমবারের মতো আমাদের ভারতে তাঁর রচনার মধ্যে শোনালেন সফল সব মিলেমিশের সংগীত রসায়ন। তাঁর নাম সলিল চৌধুরী (Salil Chowdhury)। মোজার্ট-এর (Mozart) ‘সিম্ফোনি নং ৪০’ – ‘ইতনা না মুঝে তু প্যায়ার বাড়া’, অথবা শোপ্যাঁর পিয়ানো কনসার্ট থেকে বেরিয়ে এল “রাতো কি সায়ে ঘনে”…। পাশ্চাত্য-প্রাচ্য একাকার করে দিলেন, নির্বোধ অথবা বোদ্ধারা সুরের ঘোরে আজও বেহুঁশ হয়ে যান। এটাই ওয়ার্ল্ড মিউজিক। যেমনটি সলিল চৌধুরীর গুণমুগ্ধ শিষ্য ইল্লিয়ারাজা, তামিল সংগীত পরিচালক-রচয়িতা। যাঁকে রয়্যাল ফিলহারমোনিক অর্কেস্ট্রা মায়েস্ত্র আখ্যাতে ভূষিত করে, যাঁকে বলা হয় ‘মোজার্ট অফ দ্য ইস্ট’। এঁর কম্পোজিশন শুনলে বুঝতে পারবেন দক্ষতা। ওঁর বাড়িতে স্থাপিত আছে সলিল চৌধুরীর আবক্ষ মূর্তি। প্রত্যেক সপ্তাহে সলিল চৌধুরীর জন্মবারে তাঁকে ফুলমালা দিয়ে শোভিত করা হয়। এই মান্যতা আমরা করি কি?

আমরা যারা কলকাতায় সমকালীন বাংলা গানের সঙ্গে যুক্ত (আধুনিক কথাটা বলব না) আমরা বারবার পশ্চিমের দরবারে ছুটে গিয়েছি সংগীত আহরণের জন্য। পশ্চিমের সংগীতজ্ঞ বা মিউজিশিয়ানরা কতটা আমাদের দেশে এসেছে আমার জানা নেই। বরঞ্চ ভারতীয় ধর্মচর্চার প্রতি তাদের আবেগ এবং আগ্রহ আছে নিশ্চিত। রবীন্দ্রনাথ (Rabindranath Tagore) ভানুসিংহ ছদ্মনামে বহু ইউরোপীয় সংগীত এবং কাঠামো তাঁর গানে ব্যবহার করেছেন। যেমনটি করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (D.L. Roy)। আবার ষাটের দশকের শেষে রাহুল দেব বর্মন (RD Burman) মাথায় আর কাঁধে করে নিয়ে এসেছেন ল্যাটিন আমেরিকান সংগীত (Latin American Music), সুর এবং ব্যবহার। যেমনটি পরবর্তীতে করেছেন বাপ্পি লাহিড়ী (Bappi Lahiri)। সরাসরি।
একজন বাঙালি প্রথমবারের মতো আমাদের ভারতে তাঁর রচনার মধ্যে শোনালেন সফল সব মিলেমিশের সংগীত রসায়ন। তাঁর নাম সলিল চৌধুরী। মোজার্ট-এর ‘সিম্ফোনি নং ৪০’ – ‘ইতনা না মুঝে তু প্যায়ার বাড়া’, অথবা শোপ্যাঁর পিয়ানো কনসার্ট থেকে বেরিয়ে এল “রাতো কি সায়ে ঘনে”…। পাশ্চাত্য-প্রাচ্য একাকার করে দিলেন।

রঞ্জন প্রসাদ (Ranjan Prasad), অরুনেন্দু দাস (Arunendu Das), অঞ্জন দত্ত (Anjan Dutt), কবীর সুমন (Kabir Suman) বহু ইংরেজি এবং ল্যাটিন গানের বাংলা অনুবাদ করেছেন। মন্দ কী! রঞ্জন প্রসাদ আমাদের বলেছিলেন গানগুলো শুধু অনুবাদ তিনি করেননি। করেছেন কাব্যিক রূপান্তর। অনুবাদের অর্থ ‘Yes’ মানে ‘হ্যাঁ’, ‘No’ মানে ‘না’ নয়। গানের কথা হবে গীতিকারের কাব্যিক অনুভূতির অভিপ্রকাশ। আর কয়েকজনের কথা বলবো। একজন আমার প্রয়াত বন্ধু গৌতম চট্টোপাধ্যায় (Goutam Chattopadhyay), অন্যজন আমার শিক্ষক ডক্টর হর্ষ দাশগুপ্ত। গৌতম অসম্ভব রকমভাবে ইউরোপীয় সংগীতের (European Music) গুণগ্রাহী ছিলেন। ২০ জুন তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। কী আশ্চর্য! ২১ জুন বিশ্ব সংগীত দিবস। স্প্যানিশ কিউবান সুরের জাদু ছিল তাঁর সুরে। “কতো কী করার আছে বাকি!” গানটি শুনলেই সেটা বোঝা যায়। আবার ফরাসি সুরকার এরিক সাঁতে গৌতমকে প্রভাবিত করেছিল। গৌতম কখনও কপি করেননি। আত্মস্থ করেছিলেন। মহীনের ঘোড়াগুলির বা তাঁর মৌলিক বহু গানে এর প্রভাব লক্ষণীয়। তেমনি আমাদের দল ‘নগর ফিলোমেল’-এ (Nagar Philomel) ডক্টর হর্ষ দাশগুপ্ত-এর সুরারোপিত দুটি গান বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়। ১৯৮৩-এর অ্যালবামে ‘করতালি’ আর ‘নীল নির্বাসন’। ‘করতালি’ গানে শুবার্ট-এর আভেঁ মারিয়া-র প্রভাব, ‘নীল নির্বাসনে’ কিংস্টন ট্রায়োর এল মাটাডোর-এর (প্রচলিত) মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। বলা বাহুল্য সংগীতে অপার দক্ষতা না থাকলে এটা সম্ভব হত না। হর্ষদার রক্তে পাশ্চাত্য সংগীত বইছে। ওঁর বাবা যদুনাথ দাশগুপ্ত ছিলেন ক্যালকাটা সিম্ফোনি অর্কেস্ট্রা-র (৪০ দশক) প্রধান ভিয়োলা বাদক। সে অন্য গল্প বরং যাকে দিয়ে লেখার শেষ প্রান্তে পৌঁছাব ১৯৮৩–র ‘নগর ফিলোমেল’-এর অ্যালবামের গান, ‘বিজনের চায়ের কেবিন’ দিয়ে, সুর দিলেন এবং গাইলেন আমার ভ্রাতৃপ্রতিম বন্ধু ইন্দ্রজিৎ সেন (Indrajit Sen)। হয়তো শুনেছেন অনেকেই। আমারই চেনাশোনা অনেকেই বহু সময় ধরে চেষ্টা চালিয়েছেন কোন বিদেশি গান থেকে এটা চুরি, তা খোঁজার। ১৯৮১ সালে লেখা, সুর হওয়া এই গান ৪১ বছর পার করছে।

বোধহয় একমাত্র ‘প্লেয়িং ফর চেঞ্জ ফাউন্ডেশন’ : “সং অ্যারাউন্ড দি ওয়ার্ল্ড” ভিডিও প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নানা দেশের গায়ক এবং বাদকদের এক তালে, এক গানে, এক সুরে সমন্বয় সাধন করে চলেছে সফলভাবে। হয়তো ‘ফতে দে লা মিউজিক’–এর এভাবেই হচ্ছে উদ্দেশ্য সাধন! এবারের বিশ্ব সংগীত দিবসের থিম ‘মিউজিক ফর পিস্’! আমার কাছে ওয়ার্ল্ড মিউজিক ডে অনেকটাই ইউটোপিয়া, এক অধরা স্বপ্নের সন্ধান।
________________
'শনিবারের কড়চা' পত্রিকা থেকে লেখাটি পুনঃপ্রকাশিত হল
