
রবীন্দ্রনাথ, বব ডিলান গান লিখে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছিলেন
কোনো শিল্পেরই নির্দিষ্ট সংজ্ঞা হয় না। তবে সব শিল্পের ক্ষেত্রকে আলাদা করা যায়। এবং তা করার জন্য নির্দিষ্ট শিল্পের সর্বজনবোধ্য ধারণা আলগোছে ছেড়ে গেছেন শিল্পীরা। এখন যদি প্রশ্ন করা হয় সাহিত্য কী, আপনি দেখবেন প্রাচীন ভারতীয় আলংকারিকেরা বিভিন্ন জন বিভিন্ন কথা বলে গেছেন— দণ্ডী বলবেন গুণ, বামন বলবেন রীতি, অভিনবগুপ্ত বলবেন ধ্বনি আবার বিশ্বনাথ বলবেন রস-ই কাব্য বা ব্যাপক অর্থে সাহিত্য। আবার আধুনিককালে এ ধারণার বিপুল পরিবর্তন করে সাহিত্যিকরা বলবেন— মানুষ ছাড়া সাহিত্য হয় না, যা কিছু মানুষের ‘সহিত’ যুক্ত তাই সাহিত্য; তলস্তয়রা তো এককাঠি বাড়িয়ে বলবেন— সহমর্মী করে তুলতে না পারলে সাহিত্য সাহিত্যই নয়। তবে এ সব বাদ দিয়ে সহজ বুদ্ধিতে আমরা জানি সাহিত্য ‘ভাষাশিল্প’। যেমন গান সুরশিল্প, আবৃত্তি স্বরশিল্প।
ভণিতা না করে এবার আসল প্রশ্নে আসি, প্রশ্নটা বহু পুরোনো এবং জটিল— গানকে কি সাহিত্য বলা যায়? আপনারা বলবেন আমার অ্যালজাইমার আছে, এইমাত্র বললাম গান সুরশিল্প, তারপরেও এই প্রশ্ন কেন? প্রশ্নের অনেক প্রেক্ষিত আছে, যার মধ্যে প্রথম এবং প্রধানতম হল— গানের মধ্যে ভাষাও থাকে। যেমন-তেমন সুর বসিয়ে দিলেই যেমন গান হয় না, তেমনই যেমন-তেমন ভাষা বসিয়ে দিলেই তা সাহিত্য হয় না। এখানেই শিল্পবোধের গভীরতা এবং জটিলতাও। ‘অপূর্ব-বস্তু-নির্মাণক্ষম-প্রজ্ঞা’ না থাকলে শিল্পের জন্ম দেওয়া যায় না। সে যাই হোক, আসল কথা হল গান ভাষা-নিরপেক্ষ শিল্প। কিন্তু বহুকাল থেকেই ভাষাযোগে গান শুনতেই আমরা অভ্যস্থ, ফলে গানের ভাষাও কখনও কখনও সাহিত্যের দরজা দিয়ে ঢুকে পড়ে এবং সাহিত্যিক আবেদন তৈরি করে। সেখানে কবিতার রূপের সঙ্গে গানের রূপের অনেক মিল রয়েছে, অর্থাৎ কল্পনা, ছবি, শব্দ-ঝংকার, অন্ত্যমিল, ভাবে বা আবেগে কবিতা ও গান একই নিক্তিতে মাপা যেতে পারে। এমনকি গানকে তো আলাদা করে আবৃত্তিও করা হয়, যেমন কবিতায় সুর দিয়ে গান গাওয়ার চলও আছে।
প্রশ্নের অনেক প্রেক্ষিত আছে, যার মধ্যে প্রথম এবং প্রধানতম হল— গানের মধ্যে ভাষাও থাকে। যেমন-তেমন সুর বসিয়ে দিলেই যেমন গান হয় না, তেমনই যেমন-তেমন ভাষা বসিয়ে দিলেই তা সাহিত্য হয় না।

রবীন্দ্রনাথের GITANJALI (SONG OFFERINGS)
প্রশ্নটার আর একটা প্রেক্ষিত হলো— এ পর্যন্ত দুজন গান লিখে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার নিয়েছেন— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) এবং বব ডিলান (Bob Dylan)। কিন্তু এ কথা ভুলে গেলে চলবে না রবীন্দ্রনাথের ‘GITANJALI (SONG OFFERINGS)’ আসলেই গদ্যে লেখা। এমনকি এ বইয়ে শুধু বাংলা ‘গীতাঞ্জলি’-র গানের অনুবাদ নয়, সে সঙ্গে ‘নৈবেদ্য’ এবং ‘খেয়া’-র কবিতাও অনূদিত হয়েছে। এমনকি অনূদিত গদ্যের বইটিতে রবীন্দ্রনাথকে ‘AUTHOR’ এবং বইটিকে ‘A COLLETION OF PROSE TRANSLATIONS’-ই বলা হয়েছে। নোবেল কমিটি রবীন্দ্রনাথকে পুরস্কৃত করেছেন “because of his profoundly sensitive, fresh and beautiful verse”-এর জন্যই। কোথাও একে গান বলা হয়নি, একমাত্র ইয়েটস্ লিখিত বইটির ভূমিকায় রবীন্দ্রগানের উল্লেখটুকু ছাড়া। বইটির ভাষা একটু দেখা যাক— “Mirth spreads from leaf to leaf, my darling, and gladness without measure. The heaven’s river has drowned its banks and the flood of joy is abroad.” এর আসল বাংলা গানটির কথা হলো— “পাতায় পাতায় হাসি, ও ভাই, পুলক রাশি রাশি/ সুরনদীর কূল ডুবেছে সুধা-নিঝর-ঝরা।” অর্থাৎ গদ্য অনুবাদের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ভাষাতেই বেশি জোর দিচ্ছেন, না হলে ‘সুরনদী’-কে ‘heaven’s river’ বলতেন না।

আমেরিকার সংগীত ঐতিহ্যে নতুন কাব্যিক মূর্ছনা সৃষ্টির কিংবদন্তি বব ডিলান, নোবেলের মঞ্চে
অন্যদিকে ডিলানকে নোবেল দেওয়া হয়েছে “for having created new poetic expressions within the great American song tradition” (সাহিত্যে নোবেল)। এ ক্ষেত্রে সরাসরি গানের কথায় কাব্যিক ব্যঞ্জনা যোগের কথা বলা হয়েছে এবং তা গানের জন্যই। এ কথাও ঠিক যে ডিলানকে অনুবাদ করতে হয়নি তার জন্য। কেননা রবীন্দ্রনাথের বহু গানই তো ইংরাজিতে পদ্য অনুবাদ করে নির্দিষ্ট সুরেই গাওয়া হয়— তার কাব্যিক ব্যঞ্জনা তো কম নয় (দেবব্রত বিশ্বাসের অনুবাদ করা গানগুলি শুনে দেখুন – নিচে দ্রষ্টব্য)। ডিলান কিন্তু তাঁর নোবেল ভাষণে স্পষ্ট করে বলেছেন— “…songs are unlike literature. They’re meant to be sung, not read.” এ নিশ্চয়ই ডিলানের নিজস্ব অভিমত। যদিও কোনো শিল্পীর বক্তব্য বা কোনো প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতিই শিল্পের সংরূপ সম্পর্কে শেষ কথা নয়।
কেননা সাহিত্য চিরকালই পাঠ্য মাধ্যম ছিল না। বেদ ছিল শ্রুত, আসরে পাঠ করা হত মঙ্গলকাব্যও— আপামর মানুষের কাছে তা পৌঁছাতো শ্রুতি মাধ্যমেই; অধুনা নাটক বা সিনেমাও সাহিত্য— কিন্তু তা কি অভিনয়ের মধ্যে দিয়েই পৌঁছোচ্ছে না? আবার কমিক্স বা গ্রাফিক্স নোভেলও তো ছবির মধ্যে দিয়েই সাহিত্য নির্মাণ করে। সাহিত্য যদি শুধু পাঠ্য-মাধ্যমই হতো তাহলে দৃষ্টিহীন মানুষেরা চিরকাল সাহিত্য আস্বাদন-বঞ্চিতই থেকে যেত। আসল বিষয়টি হল সাহিত্য নানা মাধ্যমেই নিজেকে প্রকাশ করে— কোনো বাধা-ধরা ছক তার নেই।
সাহিত্য চিরকালই পাঠ্য মাধ্যম ছিল না। বেদ ছিল শ্রুত, আসরে পাঠ করা হত মঙ্গলকাব্যও— আপামর মানুষের কাছে তা পৌঁছাতো শ্রুতি মাধ্যমেই; অধুনা নাটক বা সিনেমাও সাহিত্য— কিন্তু তা কি অভিনয়ের মধ্যে দিয়েই পৌঁছোচ্ছে না?
আপনারা ভাবছেন আমি মূল প্রশ্ন থেকে ক্রমশ সরে যাচ্ছি। কিন্তু না, সরছি না— গানের মধ্যে দিয়ে সাহিত্য নিজেকে প্রকাশ করতেই পারে— এইটিই ধরাতে চেয়ে কথাগুলো বললাম। আমাদের চণ্ডীদাস থেকে রামপ্রসাদ, রামমোহন থেকে সুমন তো গানের মধ্যে দিয়ে সাহিত্যকেই প্রকাশ করেছেন। এবং সে গান পরিমাপের একক কবিতা পরিমাপের এককের সঙ্গে এক। কবিতার ছন্দের মধ্যে লয় থাকে অর্থাৎ গতি থাকে, অন্তর্গত স্পন্দনও থাকে— যা আবার সাংগীতিক কারুকলার বিষয়। কাজেই গান আর কবিতা হাত ধরাধরি করে হাঁটে বলতে আবার আপত্তি কোথায়?
বাংলা, ইংরেজি ও রাশিয়ান ভাষায় দেবব্রত বিশ্বাসের গাওয়া ক্লান্তি আমার ক্ষমা করো প্রভু
তবু, প্রশ্নের ভিতরেও প্রশ্ন থাকে— এড়িয়ে যাব সে উপায় আছে? ভিতরের প্রশ্নটা হলো— সব গানের কথাই কি সাহিত্য হতে উঠতে পারে? আরো একটা জটিলতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিলাম কিনা! এমন অনেক গান আছে যার কথা সুরসঙ্গেই মুর্ছনা তৈরি করে, সুর বিবিক্ত করে তাকে দেখতে গেলেই তার অসম্পূর্ণতা ধরা পড়ে— কখনও তা নিছক তত্ত্বকথা ছাড়া আর কিছুই হয়ে উঠতে পারে না (রামমোহনকালের বহু ব্রহ্মসংগীত এর দৃষ্টান্ত বা রামপ্রসাদের বামাচারতন্ত্র নির্ভর সাধনতত্ত্বের গানগুলিও তাই), আবার তা খাপছাড়া আগুপিছুহীন কথা ছাড়া কিছু মনে হয় না। একটু বাড়তি সাহস নিয়ে রবীন্দ্রনাথের একটা গানের কথা দেখা যাক, যেখানে সু্র-নিরপেক্ষ কথা বা সুর-সাপেক্ষ কথার মাত্রাগত ফারাকটিও হয়তো স্পষ্ট করা যাবে—
“বিমল আনন্দে জাগো রে।/ মগন হও সুধাসাগরে।।/ হৃদয়-উদায়াচলে দেখো রে চাহি/ প্রথম পরম জ্যোতিরাগ রে।”
আমাদের চণ্ডীদাস থেকে রামপ্রসাদ, রামমোহন থেকে সুমন তো গানের মধ্যে দিয়ে সাহিত্যকেই প্রকাশ করেছেন। এবং সে গান পরিমাপের একক কবিতা পরিমাপের এককের সঙ্গে এক।
ব্যাস গানের কথা শেষ। এর মধ্যে ছন্দ, রূপক, ছবি, ভাব, দর্শন সব কিছুই আছে। কিন্তু কথাটি স্বরের উচ্চারণে খাপছাড়া মনে হয় না? দার্শনিক বাণীর বাইরে কথার রসরূপ প্রথমে মনে ধাক্কাই দেয় না— তার জন্য সুর দিয়েই এই গানটি শুনতে হবে, তখন দেখবেন এ রকম গান পৃথিবীতে খুব কম তৈরি হয়েছে (বোঝার জন্য কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়ের গলায় শুনে নিন)। অর্থাৎ আমাদের কথা হল গানের কথা সব সময় স্বয়ং-সম্পূর্ণ সাহিত্য হয়ে উঠতে নাও পারে (রসই বাক্যকে কাব্য করে তোলে— এ কথার প্রেক্ষিতে তো বটেই)। এবার প্রশ্ন তুলতে পারেন— বহু কবিতায় স্পেসের ব্যবহার থাকে, সেই স্পেস বা শূন্যতাই কবিতার ভাবকে সম্পূর্ণ করে। যেমন—
“অসম্ভব। তাঁকে নিয়ে কোনোকিছু
লেখা, অসম্ভব।
তিনি
একাই একশো।
আমি জানি
আমি দশকের কবি। তিনি
শতকের।” (স্যার, ভাস্কর চক্রবর্তী)
এখানে ‘অসম্ভব’-এর পরে দাঁড়ি থেকে শুরু করে ‘তিনি’-র পরে কিছু না বলাতেও যে স্পেস আছে তাই কবিতার গতি আর ভাব— দুটিকেই স্পষ্ট করছে। এক-পংক্তির কবিতাও লেখা হয়, সেখানেও কবিতার নিজস্ব টেকনিক দ্বারাই ভাব বোঝানো হয়, তা সুর-সাপেক্ষ কখনও হয় না (যেমন—‘শিকরের ডানা হোক, ডানার শিকর’, এটা পড়লে কবিতাটিকে অসম্পূর্ণ বলা যায় না)।
অবশেষে আলগোছে একটা প্রশ্ন রেখে আমি মানে মানে বিদায় নেব, তার উত্তর দেওয়ার দায়-স্বীকার করছি না। আচ্ছা, সুর ছাড়া অনেক গানের কথা যদি সাহিত্য হিসেবে অসম্পূর্ণ থেকে যায় আর সুর যদি সাহিত্যকেই প্রকাশ করে, তাহলে সুরও কি সাহিত্যের সীমায় আলোচিত হতে পারে? কেননা, সাহিত্য ভাষাশিল্প ঠিকই, কিন্তু সে ভাষাও তো স্বরের তারতম্যে অর্থ বদল করে— যেমন ‘পটলবাবু ফিল্মস্টার’ নাটকে পটলবাবু ‘আঃ’ শব্দটা উচ্চারণ করেছেন বিভিন্ন অর্থে। তাহলে?
____
*মতামত লেখকের সম্পূর্ণ নিজস্ব
