মানসিক স্বাস্থ্য ও প্রত্যয়-এর উদ্যোগ নিয়ে কথা বলছেন রত্নাবলী রায়
মনোরোগ থেকে সেরে ওঠা মানুষদের ঘর : প্রত্যয় (Pratyay)। লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতালের ঠিক উল্টোদিকের এই ‘মনের মতো ঘর’ তাঁদের ঠিকানা হয়ে উঠেছে রাজ্য সরকার ও ‘অঞ্জলি’-র প্রচেষ্টায়। সেখানকার আবাসিকেরা হয়ে উঠেছেন একে অপরের বন্ধু। ‘প্রত্যয়’-এর দ্বিতীয় জন্মদিনে সে ঘরের মানুষরা শিল্পচর্চার উদযাপনে মেতে উঠেছিলেন।

মনের মতো ঘরে আবাসিকদের কাজ
সুস্থ মনোরোগীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত আবাস ‘প্রত্যয়’। এহেন উদ্যোগ রাজ্যে এই প্রথম। প্রত্যয়ের আবাসিকরা তাঁদের তৈরি ব্লক প্রিন্টের শাড়ি, বেডকভার, পুতুল, সেরামিকের বাসন, সাবান এবং তাঁদের আঁকা ছবিতে সাজিয়ে তুলেছিলেন প্রদর্শনী।
এদেশ আমাদের। যেখানে সমস্ত সুখ-দুঃখ আশা-আকাঙ্ক্ষা চেতনা-বোধ সব এক হয়ে যায়। এ দেশের কথাই আসলে রচিত হবার কথা ছিল। অথচ এ মহাবিশ্বে আমরা ‘তাদের’ করে রাখলাম, বলতে পারলাম না ‘আমাদের’। আমরা-ওরা নয়, বরং সকলেই এক ও অভিন্ন। এ মস্ত বড়ো দুনিয়ায় এই-ই মজা। মানসিক অসুস্থতা থেকে সেরে ওঠা মানুষদের ঘর প্রত্যয়। সে ঘরের দ্বিতীয় বছরের জন্মদিনে সকলে মিলে হইহই করে দুটো দিন উদযাপন করলেন শিল্পচর্চার মধ্যে দিয়ে। এ উদযাপন আসলে নিজেদের ফিরে পাওয়ার। কেউ নিজেদের তৈরি করা স্থাপনা শিল্প চমৎকার ভাবে বোঝাচ্ছেন দর্শককে, কেউ অতিথিদের চা-জল আপ্যায়নে ব্যস্ত, কেউ আগত অতিথিদের দিয়ে সই করিয়ে নিচ্ছেন। সকলেই সকলের বন্ধু।
ছক ভাঙার এ কাজটি করেছেন অঞ্জলি ও প্রত্যয়-এর কর্ণধার ও একাধারে মনোসমাজকর্মী রত্নাবলী রায় (Ratnaboli Ray)। এই গোটা প্রদর্শনীটি নিবেদন করেছে অঞ্জলি – মেন্টাল হেলথ রাইটস অর্গানাইজেশন (Anjali Mental Health Rights Organization)। সহযোগিতায় রাজ্য সরকারের নারী ও শিশু বিকাশ এবং সমাজ কল্যাণ দপ্তর, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তর।

মনের মতো ঘরে আবাসিকদের হাতে নির্মিত শাড়ি ও শিল্প স্থাপনা
গত ৮ জুলাই প্রত্যয়ের মনের মতো ঘরে হয়ে গেল দ্বিতীয় বছরের এই অনুষ্ঠান। পশ্চিমবঙ্গের নারী ও শিশু বিকাশ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ড. শশী পাঁজা এদিন বক্তব্যের শুরুতেই মনে করিয়ে দেন মানবাধিকারের সার বিষয় : সমানাধিকার ও যোগ্য মর্যাদা।
প্রত্যয় পরিচালনার ভারপ্রাপ্ত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কর্ণধার রত্নাবলী রায় বঙ্গদর্শন.কম-কে জানান, “সক্ষম সমাজ যদি এগিয়ে এসে প্রশ্ন করার গুরুত্বটুকুও দেয়, বেশিরভাগ সময়েই উত্তর থাকে না, কারণ প্রশ্নকর্তাকে এটা বোঝানো মুশকিল হয়, যে স্বাভাবিকতার বোধ থেকে প্রশ্নগুলো তিনি করছেন, আর এই মানুষগুলোর দৈনন্দিনতা দুটো অনেকটাই আলাদা। প্রশ্নগুলোর মধ্যে একটা প্রচ্ছন্ন দাবি থাকে, অনেক সময়ই সেটা যথেষ্ট প্রকটও বটে – আগে স্বাভাবিকতার তূল্যমূল্যতায় এসো, তারপরে কথা হবে।”
প্রত্যয়ের আবাসিকরা তাঁদের এই প্রদর্শনীতে সেই সমস্ত অভিজ্ঞতাগুলিকেই সংহত করে কিছু জবাব দিয়েছেন তাঁদের মতো করে। প্রত্যয়ের আবাসিকদের এই কাজে সাহায্য করেছেন অনিন্দ্য হাজরা, অনিতেশ চক্রবর্তী এবং নবেন্দু সেনগুপ্ত। রত্নাবলী রায় বলেন, “ক্রমাগত অপরায়ন থেকে একটা প্রান্তিক পরিচিতির মানুষ কীভাবে মূলধারার সমাজের মুখোমুখি হন, সেটাই মূল বিষয়। কেউ প্রামাণ্যতার দায় চাপিয়েছেন, সক্ষম সমাজে অন্তর্ভুক্তির শর্ত চাপিয়েছেন। এই মানুষগুলো কী চান, তাঁদের মতামতের তোয়াক্কা করতে চাননি। সেটাই অবশ্য সব নয়, কেউ কেউ সহৃদয়ভাবে কাঁধে হাত রেখেছেন, সাহস যুগিয়েছেন। কিন্তু এখনও অবধি সেগুলো বিচ্ছিন্ন ব্যক্তি অভিজ্ঞতা বলাটাই ঠিক হবে।”

রাজ্যের মন্ত্রী ড. শশী পাঁজা, প্রত্যয়ের পরিচালক রত্নাবলী রায়-সহ অন্যান্য নেতা ও আধিকারিকেরা, উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে
গত ৮ জুলাই প্রত্যয়ের মনের মতো ঘরে হয়ে গেল দ্বিতীয় বছরের এই অনুষ্ঠান। পশ্চিমবঙ্গের নারী ও শিশু বিকাশ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ড. শশী পাঁজা এদিন বক্তব্যের শুরুতেই মনে করিয়ে দেন মানবাধিকারের সার বিষয় : সমানাধিকার ও যোগ্য মর্যাদা। অথচ মানবাধিকারের এই বিষয়টিই মনে রাখেন না সমাজের তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মানুষরা। মানসিক ব্যাধি আর পাঁচটা ব্যাধির থেকে আলাদা কিছু নয়, সেখানেও আরোগ্যের পথ থাকে, সামাজিক ‘ট্যাবু’ তা মেনে নিতে শেখেনি। আজীবনের জন্য তাঁদের পরিচয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয় প্রচলিত কিছু অবমাননামূলক শব্দ, যা এদিন উচ্চারণ করতে অস্বীকার করেন মন্ত্রী শশী পাঁজা। তিনি বলেন, “আমি উচ্চারণ করতে চাই না ওই শব্দগুলো। আজ সুস্থ হয়েও মূল স্রোতে ফেরা হয় না অনেকের, ফেরা হয় না ঘরবাড়ি, আত্মীয়স্বজনের কাছে। পেয়েও হারানোর দলে তাঁরা। যে মস্তিষ্কের ক্রুটি খুঁজে একজন সুস্থজীবনকামী মানুষকে অবজ্ঞা করছে সমাজ, সেই মস্তিষ্ক কী কী পারে, তা এই প্রদর্শনী তথা অনুষ্ঠানে এসে দেখে যাওয়া উচিত। তাই এই মানুষগুলোর জন্য পুনর্বাসন-সহ আরও যা যা করনীয় রাজ্য সরকারের তরফে আমরা করছি, করে যাবো। ‘প্রত্যয়’ নামটি রেখেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এই নামটির তাৎপর্য বহনের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে আমার দফতরের প্রত্যেক আধিকারিক এবং টিম অঞ্জলি।”
আরও পড়ুন: কবিতা দিয়ে মনের চিকিৎসা কলকাতায়
আবাসিকদের মধ্যে অন্যতম একজন ভাস্কর মিত্র। সুগায়ক। কলকাতার বাসিন্দা। প্রত্যয়ের পুরোনো আবাসিক। গত ৮ জুলাই ঘরের এক মঞ্চে হারমোনিয়াম সহযোগে গান ধরলেন, “সুরে ও বাণীর মালা দিয়ে তুমি আমারে ছুঁইয়াছিলে…”।
লুম্বিনী পার্ক মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র-র ঠিক বিপরীতে রয়েছে রাজ্য সরকারের নারী ও শিশু বিকাশ এবং সমাজ কল্যাণ দপ্তর এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ দপ্তরের অধীনে সুস্থ মনোরোগীদের পুনর্বাসনের উদ্দেশ্যে নির্মিত আবাস প্রত্যয়। এহেন উদ্যোগ রাজ্যে এই প্রথম। প্রত্যয়ের আবাসিকরা তাঁদের তৈরি ব্লক প্রিন্টের শাড়ি, বেডকভার, পুতুল, সেরামিকের বাসন, সাবান এবং তাঁদের আঁকা ছবিতে সাজিয়ে তুলেছিলেন প্রদর্শনী। রত্নাবলী রায় অনুষ্ঠানের সূচনা পর্বে বলেন, “মনোসামাজিক প্রতিবন্ধী বা যেকোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতাযুক্ত মানুষেরা সাধারণের কাছে যেন একটা দর্শনীয় বস্তু হয়ে ওঠেন। এটা যেন ধরেই নেওয়া হয় যে, তাঁরা কর্মক্ষেত্রে কোনো ধরনেরই অবদান রাখতে পারবেন না। ‘স্বাভাবিকতা’র সামাজিক লব্জ তাঁদের সৃষ্টিশীলতাকে নাকচ করতেই বদ্ধপরিকর। যেমন, ‘কর্মী’ শব্দটি বললে প্রতিবন্ধকতাযুক্ত কোনো মানুষের ছবি আমাদের চোখে ভেসে ওঠে না। আমরা ঠিক এই জায়গাটাকেই চ্যালেঞ্জ করতে চাই।”

প্রত্যয়ের আবাসিকদের সঙ্গে মনোবিদ অনুত্তমা বন্দ্যোপাধ্যায়
আর পাঁচজন মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে প্রত্যয়ের আবাসিকদের দৈনন্দিনতার পার্থক্য কিছু নেই। ‘অপর’ করে রাখা নয়, বরং এক হয়ে একসঙ্গে সবটা দেখব, ভাবব, বুঝব। বঙ্গদর্শন.কম-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রত্নাবলী রায় জানালেন মনোরোগী তকমা মুছে ‘সক্রিয় কর্মী’ হয়ে ওঠার লড়াইয়ে কীভাবে সঙ্ঘবদ্ধ তাঁরা।
