
আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনোপন্যাস
রাড়ুলী-কাটিপাড়া তখন অবিভক্ত বাংলার যশোর জেলায়। ১৮৬১ সালে সারাবিশ্বের রসায়নশাস্ত্রে বিজ্ঞানী ক্রুক্স ‘থ্যালিয়াম’ আবিষ্কার করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। তখন কি কেউ জানতো যে একই সালে জন্ম নেওয়া রাড়ুলীর সেই ছোটো ছেলেটি একদিন মস্ত এক রসায়নবিদ হবে? আদ্যন্ত বইপোকা ছেলেটি রুগ্ন হলেও জীবনিশক্তি অফুরান। মাথায় কেবল একটাই যেন বীজমন্ত্র, আমি রসায়নের জন্য জন্মেছি, রসায়নের সঙ্গেই বাঁচতে চাই। কিন্তু কেবল গবেষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকে নয়, গবেষণাকে শিল্প তথা বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত করে একদিন সেই ছেলে হয়ে উঠলো বেঙ্গল কেমিক্যালের রূপকার। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের জীবনকথা অবলম্বন করেই লেখিকা ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘প্রফুল্ল-রসায়নী’।
২৪ এপ্রিল ১৯৪৩
অধুনা বাংলাদেশের খুলনা জেলার রাড়ুলি গ্রামের মঞ্চে ভাষণ দিতে উঠেছেন সেই বৃদ্ধ বিজ্ঞানী। সেটাই ছিল সেখানকার মানুষদের উদ্দেশ্যে তাঁর শেষ অভিভাষণ। তখন তাঁর বিরাশি বছর বয়স। রাড়ুলির মানুষ তাঁকে খুব ভালোবাসতো। সারা বিশ্বের মানুষ কদর করছে, তারা করবে না! এই গ্রামেই তো বারবার ফিরতে চাইতেন প্রফুল্লচন্দ্র। সেবার গ্রামের এক অনুষ্ঠানমঞ্চে ওঠার কিছু আগে সবাই ঘিরে ধরে বৃদ্ধ প্রফুল্লচন্দ্র’র কাছে মতামত জানতে চাইলো, ছেলেপুলের সাফল্যের জন্য কী কী করণীয়? পরীক্ষাই কি সব? যে ছাত্রের মেধা নেই, তার কী হবে? শিক্ষার দেশব্যাপী প্রসারে ছাত্রদের কেমন হতে হবে?

প্রফুল্লচন্দ্র বলেছিলেন, “আমি পরীক্ষাসর্বস্বতা মানি না। বিদ্যালয়ের পরীক্ষা দ্বারা ছাত্রর প্রকৃত মেধা বা প্রতিভা কোনওটারই পরিচয় পাওয়া যায় কিনা, এ বিষয়ে অনেক লেখাও বলা যেতে পারে। শিক্ষকতায় আমার সুদীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতায় আমি বহু ছাত্রর সংস্পর্শে এসেছি। যারা বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় খুব কৃতিত্ব দেখিয়ে বৃত্তি প্রভৃতি পেয়েছিল তাদের অনেকেরই পরবর্তী জীবন ব্যর্থতার মধ্যে পর্যবসিত হয়েছে। কোনও একটি বিষয়ে নিষ্ঠা ও সাধনাই গৌরবের মূল। যে ছাত্র সকল বিষয়েই ভালো, সেই সাধারণত পরীক্ষায় প্রথম হয়। বাংলার চাকরিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমি খুব অসন্তোষে ভুগছি। এই শিক্ষাপ্রণালীর কোথাও একটা মস্ত গলদ রয়ে গেছে। আজকাল কার্যক্ষেত্রে পাশ করা বুদ্ধি প্রায়ই দেখি অকেজো হয়ে দাঁড়ায়।”
“অংকশাস্ত্রে ব্যুৎপত্তিই কি শিক্ষার্থীদের সকল উন্নতির মূলে? আমার ছেলেটি অংকে বড়োই কাঁচা।” সেই সভাতে এই প্রশ্নেরও উত্তর দিয়েছিলেন প্রফুল্লচন্দ্র। বলেছিলেন, “লর্ড বায়রন, আমাদের রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অংকে অত্যন্ত কাঁচা ছিলেন। এবং তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁদের সাফল্যের পথ রুদ্ধ হয়েছিল বটে। স্যার ওয়াল্টার স্কটের শিক্ষক ভবিষ্যৎবাণী করেছিলেন যে, স্কট একজন গর্দভ এবং চিরজীবন একজন গর্দভই থাকবেন।” তিনি বলতে চেয়েছিলেন অংকশাস্ত্র সবার জন্য নয়, সবাইকে অংক জেনেই সাফল্য পেতে হবে, বড়ো মানুষ হয়ে উঠতে হবে এমন কোনও কথা নেই।
“বাংলার চাকরিমুখী শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমি খুব অসন্তোষে ভুগছি। এই শিক্ষাপ্রণালীর কোথাও একটা মস্ত গলদ রয়ে গেছে। আজকাল কার্যক্ষেত্রে পাশ করা বুদ্ধি প্রায়ই দেখি অকেজো হয়ে দাঁড়ায়।”
পরিবেশ ও সমাজ সঠিক বৈজ্ঞানিক চেতনায় গঠন হোক, এ কথাই বারবার বলতেন তিনি। আজীবন নিজেও সেই কথাকে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে নিজের কাজ করে গেছেন। এদেশে নেচার ক্লাব তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন তিনি। পৃথিবীর ইতিহাসে তাঁর মতো মানের কোনও বিজ্ঞানী নিজের পঠন-পাঠন-গবেষণাকে একপাশে সরিয়ে রেখে সংকটে পড়া মানুষের ত্রাণ ও সেবাকে সেভাবে গুরুত্ব দেয়নি। বঙ্গীয় সংকট ত্রাণ সমিতি স্থাপনই তার প্রমাণ। ইতিমধ্যে দুর্ভিক্ষ, বন্যা সহ বিভিন্ন আপদ-বিপদে হাজার হাজার জনগণ তাঁর সাহায্য পেয়ে ধন্য হয়েছিল। বেঙ্গল কেমিক্যালস অ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালস-এর প্রতিষ্ঠা তো আছেই। শ’য়ে শ’য়ে বাঙালির রুজি-রজগারের পথ প্রশস্ত করেছিল এই শিল্প প্রতিষ্ঠান। বাঙালি জাতি মাথা উঁচু করে বাঁচবে এই ছিল তাঁর আদর্শ। তিনি মনে করতেন পরের অধীনে চাকরি করে বাঙালি জাতির সাড়ে সব্বোনাশ হয়ে গেছে। বাঙালি জাতিকে বাণিজ্য করতে উদ্বুদ্ধ করতেন, বলতেন, পরিশ্রমী হতে হবে, উদ্যোগ আর মূলধন থাকলেই হবে না। একটি শ্রমবিমুখ জাতিকে শ্রমের মাহাত্ম্য বুঝিয়ে স্বাবলম্বী করতে চেয়েছিলেন। প্রফুল্লচন্দ্র একদিকে ফ্রিলানথ্রপিস্ট, অন্যদিকে এন্টারপ্রেনর।
১৮৮৮ সালের অগাস্ট থেকে ১৮৮৯ সালের জুনের শেষ পর্যন্ত প্রফুল্লচন্দ্রের কোনও কাজ ছিল না। তারপর অবশেষে একদিন প্রেসিডেন্সির একটি অধ্যাপকের পদ মঞ্জুর হয়। ১৮৮৯ সালে প্রেসিডেন্সির রসায়ন বিভাগে যোগদান করেন প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং ২৫০ টাকা বেতনে অস্থায়ী সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন। এই বিসাদৃশ্যতা সহজে মেনে নেননি প্রফুল্লচন্দ্র। প্রতিবাদও করেছিলেন, সে কথা অন্য কোনো সময় আলোচ্য। প্রফুল্লচন্দ্র এই বিভাগে ২৭ বছর পড়িয়েছেন এবং গবেষণা করেছেন। তিনি যখন প্রেসিডেন্সি কলেজের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক, ভগিনী নিবেদিতা বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত’র জন্য রসায়ন বিভাগের গবেষণাগারে বোমা প্রস্তুত করার একটি ব্যবস্থা করেছিলেন। সবটা বুঝলেও কাউকে তা নিয়ে অভিযোগ জানাননি, পরোক্ষ ভাবে বিপ্লবীদের বোমা বানানোয় সাহায্য করতেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। প্রফুল্লচন্দ্রের ওই নীরবতাই বুঝিয়ে দেয় ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা।
১৮৯৫ সালে প্রফুল্লচন্দ্র ‘মারকিউরাস নাইট্রাইট’আবিষ্কার করেন, যা তাঁর জীবনে নিয়ে আসে এক নতুন অধ্যায়। মারকিউরাস নাইট্রাইট আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গেই বিশ্বের অন্যতম সেরা বিজ্ঞানের জার্নাল ‘নেচার’ পত্রিকার তা নজরে পড়ে। এর পরে নেচার-সহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণামূলক জার্নালে ভারতীয়দের গবেষণাপত্র প্রকাশিত হতে শুরু করে। যা আগে কখনও হত না। বিজ্ঞানকে সম্পূর্ণ মুক্ত করে সর্বজনবোধ্য করেছিলেন বাঙালি বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়। আধুনিক বিজ্ঞান চর্চায় এই বাঙালির গবেষণা খুঁজে পেয়েছিল নতুন দিশা। জীবনের শেষদিকের এক প্রফুল্লচন্দ্র বক্তৃতায় বলেছেন, “বন্ধুগণ, যখন আমার দিন ফুরিয়ে যাবে, তখনও আমি যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকতে চাইবো তাদেরই মাঝে যারা অন্যায়, অত্যাচার, দারিদ্র্য ও অশিক্ষার বিরুদ্ধে চলবে সংগ্রাম করে—যতদিন না আমার নির্যাতিত দেশজননীর ললাট থেকে মুছে যায় এই কলঙ্ককালিমা।”
প্রফুল্লচন্দ্র বিয়ে করেননি, তবে প্রেম-বিবাহ-সংসারে বিরোধী ছিলেন না। নিজের ব্যক্তিগত সাধনার জগতকে এসবের মধ্যে এনে ফেলতে চাননি। এর নেপথ্যে তাঁর ভাবনা, সবটাই এই উপন্যাসে যথাযথ ভাবে উপস্থাপন করেছেন ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়। তাই এই উপন্যাস শুধু একজন রসায়নবিদের গুরুগম্ভীর জীবনরূপ নয়, ব্যক্তি প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের অন্তর্জগত ছুঁয়ে দেখার-ও অন্যতম একটি মাধ্যম হয়ে থাকবে।
প্রফুল্ল রসায়নী
প্রথম প্রকাশ : ডিসেম্বর, ২০২৩
প্রকাশনা : মান্দাস
মূল্য : ৩০০ টাকা
